বছরের প্রথম ছয় মাসে ঘরে-বাইরে, লোকচক্ষুর অন্তরালে কিংবা প্রকাশ্য রাজপথে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ভঙ্গুর ছিল। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বিশ্লেষণ করলে এই ভয়ংকর চিত্র ফুটে ওঠে।
বছরের শুরু থেকে জুন মাস পর্যন্ত নির্যাতনের গ্রাফ ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ নির্দেশ করে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতির ভয়াবহ বাস্তবতা। জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসের পরিসংখ্যানটি মূলত সংখ্যার সূক্ষ্ম হিসাব নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছে একেকটি ক্ষতবিক্ষত জীবন আর পরিবারের আর্তনাদ।
এ বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ১৮৩ জন নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়। তবে মার্চ মাস থেকে এই গ্রাফ ওপরের দিকে উঠতে থাকে। মার্চে নির্যাতনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯০। ঠিক তার পরের মাস এপ্রিলে নির্যাতনের শিকার মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২০। মে মাসে এই সংখ্যা ২৬০ জনে গিয়ে ঠেকে। আর বছরের প্রথম অর্ধেকের শেষ মাস অর্থাৎ জুনে এসে আগের সব রেকর্ড ভেঙে যায়। শুধু এক মাসেই ৩৩৩ জন নারী ও শিশু নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়।
হিসাব করলে দেখা যায়, বছরের প্রথম পাঁচ মাসে যেখানে মোট নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৩৫ জন; সেখানে জুনের ৩৩৩ জনসহ এ বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ১ হাজার ৩৬৮ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুন, এই ছয় মাসে নির্যাতনের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৮১ দশমিক ৯৬ শতাংশে।
২৫০ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়, তাদের মধ্যে ৬৫ জনের ক্ষেত্রে ঘটেছিল সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মতো পাশবিক ঘটনা। এ ছাড়া ১৮ জনকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। জুন মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর রূপ নেয়। শুধু এ মাসেই নতুন করে আরও ১০০ জন নারী এবং শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে ২৪ জন দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং ৭ জন ধর্ষণের পর খুনের শিকার হয়। এর সঙ্গে হত্যা এবং রহস্যজনক মৃত্যুর সংখ্যাগুলোও বিভীষিকা তৈরি করেছে। শুধু জুন মাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই এক মাসে ৫৪ জন নারী ও কন্যাশিশুকে সরাসরি হত্যা করা হয়েছে এবং ৩৩ জনের মৃত্যু ঘটেছে রহস্যজনকভাবে।
এর বাইরে অন্যান্য অপরাধের পরিধি ছিল বিশাল। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী ও শিশু এই ছয় মাসে প্রতিনিয়ত যৌন নিপীড়ন, উত্ত্যক্তকরণ, সাইবার সহিংসতা, যৌতুক-সংক্রান্ত পাশবিক নির্যাতন এবং চারদেয়ালের ভেতরে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে।