২ মার্চ সকালের কথা। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর তিন দিন পরের ঘটনা। ইরাকের উত্তর বাগদাদে নিজ বাড়ির সামনে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন ৬৬ বছর বয়সী প্রখ্যাত নারী অধিকারকর্মী ইয়ানার মোহাম্মদ। তাঁর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখনো চলছে। তবে এটি সবাই জানে, ইয়ানার মোহাম্মদ তাঁর কাজের কারণেই প্রাণ হারিয়েছেন।
ইয়ানার মোহাম্মদ ২০ বছর ধরে নারী অধিকার নিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন। তিনি নির্যাতিত নারী, আইএসআইএস থেকে পালিয়ে আসা নারী এবং ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর সৃষ্ট সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য একটি সেফ হাউস পরিচালনা করতেন। কিন্তু ইয়ানার মোহাম্মদের মৃত্যু নিয়ে ভাবার মতো একমুহূর্ত সময়ও পায়নি বিশ্ববাসী। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া আরেকটি যুদ্ধের দামামায় খবরটি ঢাকা পড়ে গিয়েছিল।
তেহরানজুড়ে আগুন জ্বলছে, ৩ হাজার পাউন্ডের একটি মার্কিন টমাহক মিসাইল দক্ষিণ ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়কে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামা অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান সিনেটর টমি টিউবারভিল সিনেটে দাঁড়িয়ে দুটি ছবি দেখিয়েছেন। একটিতে ইসলামিক বিপ্লবের আগের ইরানি নারীদের ছবি—যেখানে তাঁরা পশ্চিমা পোশাকে, খোলা চুলে, এমনকি মিনি স্কার্ট পরে আছেন। অন্যটিতে ১৯৭৯ সালের পরের—বোরকায় ঢাকা ইরানি নারীরা। সিনেটর টিউবারভিল বলেন, ‘দুঃখজনক! মধ্যপ্রাচ্যের এই সন্ত্রাসীরা নারীদের সঙ্গে কুকুরের মতো আচরণ করছে। আমাদের উচিত এই নারীদের মুক্ত করা।’
সিনেটর টিউবারভিল হলেন সেই মার্কিন রাজনীতিবিদদের একজন; যাঁরা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে বোমা হামলা সেখানকার মুসলিম নারীদের পোশাকের ঝুল ছোট করার একটি পথ। নারীদের ‘মুক্ত’ করার উপায়।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও তাঁর যুদ্ধের প্রোপাগান্ডায় বারবার ইরানি নারীদের অধিকারের বিষয়টি টেনে এনেছেন। গত বছরের জুনে ইরানে হামলার এক দিন পর তিনি একটি ভিডিও বার্তায় বলেছিলেন, ‘এখন ইরানের নারীদের জেগে ওঠার সময়।’
অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সপক্ষে একেক সময় একেক যুক্তি দিয়েছে। কখনো আসন্ন হুমকি ঠেকানো, কখনো মার্কিন সেনাদের রক্ষা, পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিরোধ কিংবা গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য শাসন পরিবর্তন। যদিও ‘নির্দিষ্ট লক্ষ্যে হামলা হচ্ছে’ বলে দাবি করে গেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বাস্তবে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলো সেই সীমার অনেক বাইরে চলে গেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একটি ডিস্যালিনেসন প্ল্যান্ট (পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র) ধ্বংসের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি সেই দায় অস্বীকার করে বলেছিলেন, ‘ওরা বর্বর। ওরা শিশুদের মাথা কাটে। নারীদের দুই টুকরো করে ফেলে।’
ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রে যা সত্য, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাধানো আগের সব প্রশাসনের ক্ষেত্রেও তা-ই ছিল। প্রতিবার যুক্তরাষ্ট্র যখন কোনো মুসলিমপ্রধান দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, নীতিনির্ধারকেরা একই ধারণা সামনে আনেন—যুদ্ধ হলো একটি রূপক, যা মুসলিম নারীদের ‘মুক্ত’ করবে।
কিন্তু আসলেই কি তাই? যুক্তরাষ্ট্র কি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে সেখানকার নারীদের ‘মুক্ত’ করতে চায়? আজ পর্যন্ত পেরেছে?
হ্যাঁ, এই দেশগুলোতে নারীরা দমনপীড়নের শিকার হন এবং তাঁদের অধিকার পদ্ধতিগতভাবে লঙ্ঘিত হয়। কিন্তু যুদ্ধের বিধ্বংসী প্রভাব নারীদের ওপর আরও ভয়াবহ।
নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ক্যারোলিন ম্যালোনি সিনেটে নীল বোরকা পরে আফগানিস্তানে হামলার সপক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। ভাষণে তিনি বলেছিলেন, আমেরিকার নারীরা তাদের পাশে আছে। লরা বুশ থেকে শুরু করে হিলারি ক্লিনটন—সবাই সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধকে ‘নারীদের অধিকার রক্ষার লড়াই’ বলেছিলেন। এই বক্তব্যগুলো যুদ্ধের গায়ে একটি ‘নৈতিকতার আবরণ’ দিয়েছিল, যে যুদ্ধে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন ও পাকিস্তানে প্রায় ১০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের একটি বড় অংশই ছিল নারী ও শিশু।
আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের অবস্থানকালে নারী শিক্ষার হার বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান পুনরায় কাবুল দখল করার পর সেই ২০ বছরের চিত্র এক দিনেই ধসে পড়ে। একসময় যুক্তরাষ্ট্র যে নারীদের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এখন সেই লাখ লাখ নারীকে একঘরে করে রাখা হয়েছে আফগানিস্তানে।
ইরাকের ক্ষেত্রে সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে নারীদের দমনপীড়নের বিষয়টিকে যুদ্ধ বাধানোর অজুহাতে পরিণত করেছিলেন বুশ। ২০০৪ সালে বুশ বলেছিলেন, ইরাকের প্রত্যেক নারী এখন নিরাপদ। তবে তিনি আবু গারিব কারাগারে মার্কিন বাহিনীর হাতে বন্দী নারীদের ধর্ষণ ও নির্যাতনের কথা বলেননি। অধিকারকর্মী ইয়ানার মোহাম্মদ ২০০৩ সালে বলেছিলেন, ‘সবাই জানে, আমরা এক খুনি স্বৈরাচার থেকে মুক্তি পেয়েছি। কিন্তু কেউ জানে না, আমাদের আগের জীবন তুলনামূলক নিরাপদ ছিল।’
ইয়ানার মোহাম্মদ আজ নেই। সম্প্রতি তাঁর মতো আরও অনেকে নিহত হয়েছেন। কেউ ছিলেন বিউটি পারলারের মালিক কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার। তাঁদের অপরাধ ছিল, তাঁরা জনসমক্ষে সক্রিয় থাকতে চেয়েছিলেন।
এখন প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র যে নারীদের ‘মুক্ত’ করতে যুদ্ধ বাধাল, তাঁরা কোথায়? ইয়ানার মোহাম্মদের মতো নারীরা কেন নিহত হচ্ছেন?
আসলে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের কোনো নারীকেই ‘মুক্ত’ করতে পারেনি; বরং যুদ্ধকালীন এবং যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে নারীদের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।
যুদ্ধ সব প্রাণীর জন্যই খারাপ। কিন্তু নারীদের জন্য ভয়ংকর। অক্সফামের তথ্যমতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় প্রতি পাঁচজন বাস্তুচ্যুত নারীর একজন যৌন সহিংসতার শিকার হন। যুদ্ধের সময় নারীর শিক্ষাই সবার আগে বন্ধ হয়। প্রতিরোধযোগ্য মাতৃমৃত্যুর ৬০ শতাংশই ঘটে সংঘাতপূর্ণ এলাকায়। অথচ আমরা ২০ বছর পরও বোমা হামলা চালিয়ে মুসলিম নারীদের ‘মুক্ত’ করার কথা শুনছি।
এই বিশ্বাস টিকে আছে মূলত মুসলিমদের নিয়ে ভুল ধারণার কারণে। পশ্চিমা নারীবাদীরা এটা বুঝতে চান না যে একজন হিজাব পরা নারীও ক্ষমতাশালী হতে পারেন।
ইরানের বর্তমান সময়টিও এ ক্ষেত্রে জরুরি। সিনেটর টিউবারভিলের মতো নেতারা বিপ্লবের আগের ছবি দেখালেও বাস্তবতা হলো, ইরানি নারীরা নিজেরাই পরিবর্তন আনছেন। মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া আন্দোলনই এর প্রমাণ। এই পরিবর্তন ইরানি নারীরা নিজেদের ভেতর থেকে এনেছেন। গাড়ির ওপর দাঁড়িয়ে হিজাব পোড়ানো কিংবা স্কুলছাত্রীদের খোমেনি-খামেনির ছবির দিকে অশালীন ইঙ্গিত প্রমাণ করে—তাঁদের পর্দা সরানোর জন্য কোনো ইসরায়েলি ফাইটার পাইলটের প্রয়োজন পড়েনি। মার্কিন বোমা হামলার দরকার পড়েনি।
বোমাবর্ষণ করে তাঁদের এই দীর্ঘ সংগ্রামকে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া মুক্তি নয়, বরং বিশ্বাসঘাতকতা। নারীদের মুক্তি আসে সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে, যুদ্ধের মাধ্যমে নয়। যতক্ষণ বোমা পড়ছে, ততক্ষণ ইরাকি অধিকারকর্মী ইয়ানার মোহাম্মদের শেষ কথাগুলোই সত্য হয়ে বাজছে—‘এই সবকিছুর প্রথম শিকার নারীই।’
‘নিউইয়র্ক টাইমসে’ কলামিস্ট মেহের আহমদের প্রকাশিত মতামত থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা।