হোম > ল–র–ব–য–হ

‘স্লোজামাস্তান’: মরুর বুকে এক আজব দেশ, যার নাগরিক বাংলাদেশিরাও

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মাত্র ১১ একর জমির ওপর এই দেশ গড়ে তুলেছেন র‍্যান্ডি উইলিয়ামস নামে জনপ্রিয় এক রেডিও জকি। ছবি: ফেসবুক

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার তপ্ত মরুভূমি। মাইলের পর মাইল কেবল ধূ-ধূ প্রান্তর আর ঝোপঝাড়। এই জনমানবহীন রুক্ষ প্রকৃতির মাঝখানেই হঠাৎ চমকে দেবে একটি সাবমেরিন! আর তার পাশেই পতপত করে উড়ছে একটি অজানা পতাকা। এটি কোনো মরীচিকা নয়, বরং বিশ্বের কনিষ্ঠতম এক ‘ক্ষুদ্র রাষ্ট্র’ বা মাইক্রোনেশন, যার নাম ‘রিপাবলিক অব স্লোজামাস্তান’।

অদ্ভুত সব আইন আর পাগলাটে সব নিয়মের এই দেশে গত কয়েক বছরে নাগরিকত্বের আবেদনের হিড়িক পড়েছে। মজার ব্যাপার হলো, এই দেশের নাগরিক হতে এখন বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশিও আবেদন করছেন।

বিশ্বের ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ এই মাইক্রোনেশনের নাগরিক। তবে দেশটিতে মানুষের চেয়ে কোয়োট ও ইগুয়ানা নামক প্রাণীদের সংখ্যাই বেশি। তবে এদের সংখ্যা বেশি হলেও দেশটির জাতীয় পশু হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে র‍্যাকুন। দেশটির রয়েছে নিজস্ব মুদ্রা এমনকি পাসপোর্টও।

স্লোজামাস্তানের কিছু অদ্ভুত আইনের কথা আগে জানা যাক। এখানকার আইনগুলো শুনলে আপনি হাসবেন নাকি চমকে উঠবেন, তা ভাববার বিষয়। এই দেশে আইন করে ‘ক্রোকস’ নামক রাবারের তৈরি জুতো পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া দেশটিতে ‘রিপ্লাই-অল’ ইমেইল পাঠানো দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে আপনি দ্রুত গাড়ি ছোটাতে পারবেন তখনই, যখন আপনি ‘ট্যাকো’ নিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশিসহ বিশ্বের ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ এই মাইক্রোনেশনের নাগরিক। ছবি: ফেসবুক

মাত্র ১১ একর জমির ওপর এই আজব দেশ গড়ে তুলেছেন র‍্যান্ডি উইলিয়ামস নামে জনপ্রিয় এক রেডিও জকি। তিনি ‘স্লোজামাস্তানের সুলতান’ হিসেবে পরিচিত। মরুভূমির বুকে এই সাম্রাজ্য শাসনের পাশাপাশি সান দিয়েগোর দুটি জনপ্রিয় রেডিও স্টেশনে (Z 90 এবং Magic 92.5) প্রোগ্রাম ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন র‍্যান্ডি উইলিয়ামস। রেডিওর শ্রোতাদের কাছে তিনি ‘আর ডাব’ নামে পরিচিত। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি ‘সানডে নাইট স্লো জামস’ নামে একটি রেডিও শো পরিচালনা করছেন, যা এখন বিশ্বের ২৫০টিরও বেশি স্টেশনে শোনা যায়।

জাতিসংঘের স্বীকৃত সবগুলো দেশ ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ভ্রমণপিপাসু উইলিয়ামস। বছরের পর বছর ধরে ভ্রমণের পর ২০২০ সালের শুরুর দিকে কেবল একটি দেশ বাকি থাকতেই করোনা মহামারীর কারণে বিশ্বজুড়ে লকডাউন শুরু হয়। সবার মতো গৃহবন্দী হয়ে পড়লেও উইলিয়ামসের মন পড়ে থাকত বিশ্বজয়ে। তখনই তাঁর মাথায় বুদ্ধি খেলে, ‘যদি অন্য দেশে যেতে না পারি, তবে নিজেই একটি দেশ তৈরি করব না কেন?’

তারপর যেমন ভাবনা তেমন কাজ! ১৯ হাজার ৫০০ ডলারে মরুভূমির এক টুকরো জমি কিনে ২০২১ সালে উইলিয়ামস ঘোষণা করলেন নিজের স্বাধীন রাষ্ট্র। ২০২৬ সালে এসে এই রাষ্ট্রের নাগরিক ভ্যাটিকান সিটির চেয়েও বেশি!

এখন স্লোজামাস্তান পর্যটকদের জন্য পাসপোর্ট ইস্যু করছে, নিজস্ব মুদ্রা তৈরি করেছে এবং নিয়মিত পতাকা উত্তোলন উৎসব পালন করছে। এই ভূমিকে ডাবল্যান্ডিয়া, বাকসিলভেনিয়া ও কুইনডম অব হটড্যামাস্তানের মতো কয়েকটি রাজ্যে ভাগ করা হয়েছে। এমনকি এলটন জনের ‘রকেট ম্যান’-এর সুরে দেশটির সুলতান নিজেই একটি জাতীয় সংগীত লিখেছেন।

এখানে নাগরিকত্ব সবার জন্য উন্মুক্ত ও বিনামূল্যে পাওয়া গেলেও বিশেষ পদের জন্য ফি দিতে হয়। যেমন, কেউ চাইলে ফি দিয়ে পার্লামেন্ট মেম্বারও হতে পারবেন। বর্তমানে ১২০টি দেশের ২৫ হাজার নাগরিক এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত, যা ভ্যাটিকান সিটি বা পালাউয়ের মতো স্বীকৃত দেশগুলোর জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এই দেশটির নিজস্ব একটি ওয়েবসাইট আছে যেখান থেকে নাগরিকত্বের জন্য আবেদনেরও সুযোগ রয়েছে।

স্লোজামাস্তানের নাগরিকদের প্রায় ৫০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। ছবি: ফেসবুক

সে সময়ের কথা স্মরণ করে র‍্যান্ডি উইলিয়ামস বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি সৃজনশীল কিছু করতে পছন্দ করতাম। তাই এটিই ছিল আমার জন্য সেরা সুযোগ।’

নিজের পরিকল্পনার কথা প্রিয় বন্ধু মার্ক করোনাকে জানালে তিনি হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। মার্ক বলেন, ‘আমার শুধু ফ্যামিলি গাই কার্টুনের সেই পর্বটির কথা মনে পড়ছিল, যেখানে পিটার নিজের দেশ গড়েছিল। আমি ভাবছিলাম, ঠিক আছে বন্ধু, তোমার এই দেশ কি তোমার ঘরেই থাকবে?’

কিন্তু উইলিয়ামস দমে যাননি। তিনি রিয়েল এস্টেট সাইটে নিজের মনের মতো জমি খুঁজতে থাকেন। শর্ত ছিল, জমিটি পাঁচ একরের বেশি হতে হবে, পাকা রাস্তা থাকতে হবে এবং সান ডিয়েগো থেকে গাড়ি চালিয়ে যাওয়া যাবে। শেষমেশ ১৯ হাজার ৫০০ ডলারে ঝোপঝাড় আর বালুভরা একটি জমি কিনে নেন তিনি। ২০২১ সালে জমিটি কেনার পর উইলিয়ামস বলেন, ‘প্রথম দেখাতেই জমিটি আমার মনে ধরে যায়।’

তিনি ফিনিক্স থেকে একটি রাজকীয় ডেস্ক আনিয়ে মরুভূমির মাঝখানে বসান। এরপর ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট রুট ৭৮-এর পাশে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে নিজের রাজ্যের সীমানা নির্ধারণ করেন। নাম দেন ‘রিপাবলিক অব স্লোজামাস্তান’। প্রথমে নামটিকে কৌতুক মনে করা হলেও পরে এটিই স্থায়ী হয়।

খুব দ্রুতই স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নজরে আসে বিষয়টি। রাস্তার খুব কাছে সাইনবোর্ড বসানোর দায়ে তাদের নোটিশ দেওয়া হয়। উইলিয়ামস নিয়ম মেনে সাইনবোর্ড কিছুটা সরিয়ে নেন, কিন্তু নিজের দেশের প্রচার থামাননি। এরপর একে একে তৈরি হয় বর্ডার চেকপয়েন্ট, পতাকা এমনকি পাসপোর্টও। অল্প সময়ের মধ্যেই স্লোজামাস্তান একটি বাস্তব দেশের রূপ নিতে শুরু করে।

স্লোজামাস্তানে এখন নিজস্ব মুদ্রা চালু হয়েছে। ছবি: ফেসবুক

উইলিয়ামসের বন্ধু মার্ক করোনা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘লোকজন গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল আর ভাবছিল কী হচ্ছে এখানে। হয়তো আমাদের সন্ত্রাসী ভাবছিল, এটাই আমাদের আরও পরিচিতি এনে দেয়।’

উইলিয়ামস বলতে থাকেন, ‘হঠাৎ করেই আমি পুলিশ কার, মুদ্রা আর ইমিগ্রেশন বুথ কেনা শুরু করলাম।’

এরপর তিনি নিজেকে সুলতান ঘোষণা করেন এবং লিবিয়ার সাবেক শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির আদলে জাঁকজমকপূর্ণ সামরিক ইউনিফর্ম ও কালো চশমা পরতে শুরু করেন। কথা বলার সময় তিনি একটি বিশেষ বিদেশি টান ব্যবহার করেন।

সুলতান উইলিয়ামস জানান, মানুষ এখন দলে দলে স্লোজামাস্তানের নাগরিক হচ্ছে। কেউ কৌতূহলী হয়ে, কেউ মজাচ্ছলে, আবার কেউ বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে। তিনি আরও বলেন, ‘ফেসবুক খুললেই দেখতে পাই, মানুষ রাজনীতির কারণে বন্ধু-পরিজন হারাচ্ছে। স্লোজামাস্তান হলো সেই সব রাজনৈতিক তিক্ততা থেকে পালানোর জায়গা। আমাদের নিজস্ব রাজনীতি ছাড়া অন্য সব রাজনৈতিক আলোচনা এখানে নিষিদ্ধ।’

স্লোজামাস্তানের নাগরিকদের প্রায় ৫০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। তবে সুলতান জানান, এই দেশের আবেদন এখন সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকেও বিপুলসংখ্যক মানুষ নাগরিকত্বের আবেদন করছেন।

স্লোজামাস্তান পর্যটকদের জন্য পাসপোর্ট ইস্যু করছে। ছবি: ফেসবুক

স্টেফানি হেডন নামের এক নাগরিক জানান, এনবিসি চ্যানেলের গেম শো জিওপার্ডি!-এর একটি পর্বে প্রথম এ দেশের কথা শোনেন তিনি। পরে লং বিচ ট্রাভেল অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার শোতে গিয়ে স্লোজামাস্তানের সুলতানের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি বলেন, ‘এই দেশ আমাকে আনন্দ দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে পোস্টগুলোই আমাকে আনন্দ দেয়। সবকিছুই আমাকে খুশি করে। কঠিন সময়েও এটি আনন্দের উৎস।’

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে কয়েকশ মাইক্রোনেশন বা ক্ষুদ্র রাষ্ট্র রয়েছে। আগামী বছর স্লোজামাস্তান ‘মাইক্রোকন ২০২৭’ আয়োজন করবে, যেখানে ৪৩টিরও বেশি স্বঘোষিত রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। আলোচনা হবে সার্বভৌমত্ব থেকে প্রতীকচিহ্ন তৈরির মতো নানা বিষয় নিয়ে। স্লোজামাস্তানে রাতযাপনের ব্যবস্থা না থাকায় সান ডিয়েগোর একটি বহুতল ভবনে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।

উইলিয়ামস বলেন, এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ। ২০২৩ সালের মে মাসে তিনি তুর্কমেনিস্তান ভ্রমণের মাধ্যমে বিশ্বের সব দেশ দেখার লক্ষ্য পূরণ করেন। তত দিনে স্লোজামাস্তান কেবল শখের বশে তৈরি কিছু নয়, বরং বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সীমানার মানুষকে যুক্ত করার একটি মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

সুলতান বলেন, ‘স্লোজামাস্তান কেবল আমার নয়; যদিও আমি একজন একনায়ক, তবুও এটি আসলে সবার। প্রতিটি মানুষের কাছে এর গুরুত্ব আলাদা।’

১২ টন কিটক্যাট চকলেট চুরির ঘটনায় মিমের বন্যা

ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে বাড়ি বিক্রির ঘোষণা ভক্তের

সত্যিকারের নায়ক হতে সুপারপাওয়ার লাগেনি ইতালির স্পাইডার-ম্যানের

৭ বছর বয়সেই পেশাদার কার রেসার চীনের এক শিশু

বরকে ৮০ কোটি টাকা যৌতুক দিলেন চীনা নারী

৮ ঘণ্টা ওড়ার পর এয়ার ইন্ডিয়ার পাইলট জানলেন কানাডায় অবতরণের অনুমতি নেই

দানের ব্যাগে মিলল গাঁজা ও নগদ টাকা, দুই কিশোর-কিশোরী আটক

স্ত্রীর সঙ্গে ‘গর্ভবতী’ বোধ করেন স্বামীও, কিন্তু কেন

১০ বছর জেল খেটেও সোনার হদিস দিলেন না গুপ্তধন অনুসন্ধানকারী, অবশেষে মুক্তি

গর্তে পড়ে অ্যাম্বুলেন্সের ঝাঁকুনিতে প্রাণ ফিরে পেলেন ‘ব্রেন ডেড’ নারী