সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলো বিভিন্ন বয়সের মানুষকে আসক্ত করে তুলছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিশু ও তরুণদের ওপর। এ ধরনের আসক্তি তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, অনলাইন আসক্তি রোধ এবং সাইবার বুলিং বা ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে শিশুদের বাঁচাতে বিভিন্ন দেশের সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা অত্যন্ত কঠোর আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন শুরু করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু যুগান্তকারী ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি-সংক্রান্ত মামলাগুলোর রায় এবং বড় অঙ্কের সমঝোতা বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতি ও কার্যক্রমে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনতে বাধ্য করছে। এর ফলে টেক জায়ান্টরা তাদের কাঠামোগত নকশা এবং ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনছে।
আদালতে বিচারাধীন মামলাগুলোতে নতুন মোড় এসেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মেটা প্ল্যাটফর্ম মামলার দুই টিনএজার বাদীর সঙ্গে আদালতের ট্রায়াল শুরুর আগে সমঝোতা করে নিয়েছে। এর ফলে এই বিচারপ্রক্রিয়া এখন স্ন্যাপচ্যাটের মূল প্রতিষ্ঠান স্ন্যাপ ইনকের বিরুদ্ধে পরিচালিত হবে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের স্টেট কোর্টে এই ট্রায়ালের জুরি নির্বাচন শুরু হয়েছিল দুজন টিনএজার বাদী এস জে (ইলিনয়ের ১৬ বছর বয়সী কিশোরী) এবং কে ডি বির (মিসিসিপির ১৮ বছর বয়সী তরুণী) দাবিগুলো যাচাই করার জন্য। তাঁরা অভিযোগ করেছিলেন যে ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো আসক্তিপূর্ণভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। যার ফলে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং খাদ্যাভ্যাসে সমস্যা দেখা দেয়। এর আগে এই দুই বাদী টিকটক ও ইউটিউবের সঙ্গে সমঝোতা করে নিয়েছিলেন। ট্রায়াল শুরুর কয়েক দিন আগে মেটা এস জের সঙ্গে এবং পরে কে ডি বির সঙ্গেও সমঝোতা করায় মামলাটি এখন শুধু স্ন্যাপের বিরুদ্ধে এগোচ্ছে। বাদীর আইনজীবীরা শিশুদের নিরাপত্তা উন্নত করতে এবং টেক কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। অন্যদিকে মেটা জানিয়েছে, এ ধরনের সমঝোতা ও ট্রায়াল মামলার প্রক্রিয়া যাচাইয়ের অংশ এবং তারা নিজেদের রেকর্ড ও নিরাপত্তা টুলগুলোর পক্ষে আদালতে লড়াই চালিয়ে যাবে। স্ন্যাপ অবশ্য এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। মামলাটি হাজার হাজার বিচারাধীন মামলার মধ্যে একটি টেস্ট কেস হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল, যার রায় অন্যান্য মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অনলাইন আসক্তি রোধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কঠোর আইন প্রণয়ন করছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে, যা অমান্য করলে কোম্পানিগুলোকে বিশাল জরিমানা গুনতে হবে। পাশাপাশি ব্রাজিল ও মালয়েশিয়ায় অ্যাকাউন্ট খুলতে সরকারি আইডি বা ফেস স্ক্যানভিত্তিক বাধ্যতামূলক বয়স যাচাই চালু করা হয়েছে। ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে অভিভাবকদের ডিজিটাল সম্মতি ছাড়া অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ নেই। এ ছাড়া আইনপ্রণেতারা অটোপ্লে ও ইনফিনাইট স্ক্রলের মতো আসক্তিপূর্ণ ফিচারের বিরুদ্ধেও কঠোর নীতি গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছেন। এই আইনগুলোর মূল লক্ষ্য হলো টেক জায়ান্টগুলোকে বাধ্য করা, যাতে তারা শিশুদের বাণিজ্যিক স্বার্থের বলি না বানিয়ে একটি নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ নিশ্চিত করে।
সূত্র: রয়টার্স