মহাকাশবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে ২০২২ সালের একটি পরীক্ষার মাধ্যমে। সে বছর নাসা পৃথিবী সুরক্ষার পরীক্ষা হিসেবে একটি গ্রহাণুর ওপর মহাকাশযান আছড়ে ফেলেছিল। এরপর সাম্প্রতিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ বলছে, এই অভিযানের প্রভাব তাদের প্রাথমিক ধারণার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুদূরপ্রসারী। ভবিষ্যতে পৃথিবীকে কোনো ধ্বংসাত্মক মহাজাগতিক বস্তুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এই সাফল্য দারুণ এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছে।
ডার্ট মিশন: মহাকাশে গতির লড়াই
নাসার ডাবল এস্ট্ররেড রিডিয়েকশন টেস্ট বা ডার্ট ছিল মূলত কাইনেটিক ইমপ্যাক্টর পদ্ধতির একটি পরীক্ষা। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ৫৬০ ফুট প্রশস্ত ছোট একটি গ্রহাণু ডিমরফোসের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে মহাকাশযানটি আছড়ে ফেলা হয়। তবে লক্ষ্য ছিল এটি দেখা যে, কোনো বিশাল পাথর যদি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে, তাহলে ধাক্কা দিয়ে সেটির গতিপথ বদলে দেওয়া সম্ভব কি না। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু মহাকাশযানের ধাক্কা নয়, বরং ধাক্কার ফলে ডিমরফোস থেকে ছিটকে আসা বিপুল পাথুরে ধ্বংসাবশেষ এই মিশনের সফলতায় বড় ভূমিকা রেখেছে।
মহাকাশ থেকে যখন ধ্বংসাবশেষগুলো ছিটকে বেরিয়ে যায়, তখন তা গ্রহাণুটিকে পেছনের দিকে একটি বাড়তি ধাক্কা অথবা থ্রাস্ট দেয়। তবে বিজ্ঞানীরা একে বলছেন মোমেনটাম এনহ্যান্সমেন্ট ফ্যাক্টর। দেখা গেছে, এই ফ্যাক্টরের মান ছিল প্রায় ২। অর্থাৎ, মহাকাশযানের একক ধাক্কার চেয়ে ধ্বংসাবশেষ ছিটকে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট ধাক্কা পুরো শক্তির পরিমাণকে দ্বিগুণ করে দিয়েছিল।
কক্ষপথের বিস্ময়কর পরিবর্তন
ডিমরফোস ও বড় গ্রহাণু ডিডাইমোস একে অপরকে কেন্দ্র করে ঘোরে এবং তারা একসঙ্গে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। ডার্টের আঘাত এই পুরো সিস্টেমের ওপর প্রভাব ফেলেছে। ডিডাইমোসকে কেন্দ্র করে ডিমরফোসের ১২ ঘণ্টার কক্ষপথের সময়কাল ৩৩ মিনিট কমে গেছে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ডিডাইমোস ও ডিমরফোস জুটির সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময়কালও শূন্য দশমিক ১৫ সেকেন্ড কমে গেছে। পুরো সিস্টেমটির কক্ষপথের গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১১ দশমিক ৭ মাইক্রন বা প্রতি ঘণ্টায় ১ দশমিক ৭ ইঞ্চি পরিমাণ পরিবর্তিত হয়েছে। এটি খুব সামান্য মনে হলেও নাসার বিজ্ঞানী থমাস স্ট্যাটলারের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সামান্য পরিবর্তনই একটি বিশাল গ্রহাণুকে পৃথিবীর বুক থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো পরিমাপ করা মোটেই সহজ ছিল না। বিজ্ঞানীরা স্টেলার অকাল্টেশন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। যখন কোনো গ্রহাণু কোনো নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যায়, তখন নক্ষত্রের আলো ক্ষণিকের জন্য নিভে যায়। সারা বিশ্বের কয়েক ডজন স্বেচ্ছাসেবক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এমন ২২টি ঘটনা রেকর্ড করেছেন। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ডিডাইমোসের কক্ষপথের এত নিখুঁত পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছে।
এই মিশন থেকে ডিমরফোসের ঘনত্ব সম্পর্কেও নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। এটি ডিডাইমোসের দ্রুত ঘূর্ণনের ফলে ছিটকে আসা ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি হওয়া একটি রাবল পাইল বা আলগা পাথরের স্তূপাকার গ্রহাণু। পৃথিবী রক্ষায় নাসা এখন একটি পরবর্তী প্রজন্মের টেলিস্কোপ তৈরি করছে। এটি মহাকাশে থাকা অন্ধকার গ্রহাণু ও ধূমকেতুগুলো খুঁজে বের করবে, যা সাধারণ আলোয় দেখা যায় না।
সূত্র: নাসা