পৃথিবীর কক্ষপথে ১০ লাখ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের অনুমতির জন্য আবেদন করেছে ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। আবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কম্পিউটিং শক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্য ‘অরবিটাল ডেটা সেন্টার’ সবচেয়ে কম খরচে ও শক্তি–সাশ্রয়ী উপায়।
সাধারণত ডেটা সেন্টার বলতে শক্তিশালী কম্পিউটারে ঠাসা বিশাল গুদামঘরের মতো স্থাপনাকে বোঝায়, যেখানে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ করা হয়। তবে মাস্কের মহাকাশ গবেষণা সংস্থাটি দাবি করছে, এআই-এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের কারণে যে পরিমাণ প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা প্রয়োজন হচ্ছে, তা এরইমধ্যে পৃথিবীর স্থলভিত্তিক সক্ষমতাকে (terrestrial capabilities) ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
এই স্যাটেলাইট স্থাপনের অনুমতি পেলে কক্ষপথে স্পেসএক্স-এর স্যাটেলাইটের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করবে। বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার স্যাটেলাইট নিয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানটির স্টারলিংক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে এরইমধ্যে মহাকাশে জটলা তৈরির অভিযোগ আনা হয়েছে, যদিও মাস্ক সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের (এফসিসি) কাছে জমা দেওয়া আবেদনে বলা হয়েছে, নতুন এই নেটওয়ার্কে সর্বোচ্চ ১০ লাখ সৌরশক্তিচালিত স্যাটেলাইট অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি আবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
স্পেসএক্সের দাবি, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ‘বিলিয়ন বিলিয়ন ব্যবহারকারীকে’ সেবা দিতে প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং সক্ষমতা সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এটি হবে কারদাশেভ লেভেল-২ (Kardashev II-level) স্তরের একটি সভ্যতায় পরিণত হওয়ার পথে প্রথম ধাপ। অর্থাৎ এমন এক সভ্যতা, যা সূর্যের সম্পূর্ণ শক্তি কাজে লাগাতে সক্ষম। ষাটের দশকে এক জ্যোতির্বিদের প্রস্তাবিত কাল্পনিক ভিনগ্রহী সমাজের একটি মানদণ্ডের উল্লেখ করেই এই বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।
মাস্ক নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স–এ লিখেছেন, ‘স্যাটেলাইটগুলো বাস্তবে একে অপরের থেকে এত দূরে থাকবে যে একটি থেকে আরেকটি দেখা কঠিন হবে। মহাকাশ এতটাই বিশাল যে তা কল্পনারও বাইরে।’
উচ্চগতির ইন্টারনেট সরবরাহকারী স্টারলিংক স্যাটেলাইটগুলোর মতোই নতুন স্যাটেলাইটগুলোও পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে (low-Earth orbit) অবস্থান করবে। এগুলোর অবস্থান হবে ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০০ থেকে ২ হাজার কিলোমিটার (৩১০ থেকে ১ হাজার ২৪২ মাইল) উচ্চতায়।
স্পেসএক্সের দাবি, ‘অরবিটাল ডেটা সেন্টার’ নিয়ে অন্যান্য সংস্থাগুলোও গবেষণা করছে। প্রচলিত ডেটা সেন্টারের তুলনায় বেশি পরিবেশবান্ধব বিকল্প হতে পারে এটি। কারণ, প্রথাগত ডেটা সেন্টারগুলো শীতলীকরণের জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানি প্রয়োজন হয়।
একজন বিশেষজ্ঞ আগে বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, কক্ষপথে হার্ডওয়্যার পাঠানো এখনো বেশ ব্যয়বহুল। পাশাপাশি সেগুলোর সুরক্ষা দেওয়া, শীতল রাখা ও শক্তি সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও বেশ জটিল। এর ওপর ক্রমবর্ধমান মহাকাশ বর্জ্য (space debris) হার্ডওয়্যারগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।
অন্য আরেকজন বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেন, নিম্ন কক্ষপথে যানের সংখ্যা বাড়তে থাকায় বস্তুগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের সম্ভাবনাও বেড়েছে। এতে যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কিংবা ভেঙে পড়া অংশ পৃথিবীর দিকে নেমে আসতে পারে।
২০২৪ সালে জ্যোতির্বিদেরা অভিযোগ করে বলেন, স্টারলিংক নেটওয়ার্ক থেকে নির্গত রেডিও তরঙ্গ তাদের টেলিস্কোপকে ‘অন্ধ’ করে দিচ্ছে এবং গবেষণা কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। তবে মাস্ক আগেও এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন যে তাঁর স্যাটেলাইটগুলো অতিরিক্ত জায়গা দখল করছে বা প্রতিযোগীদের জন্য বাধার সৃষ্টি করছে।