তার মুখে ব্রণ আছে, ত্বকে ছোট ছোট দাগ। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। সারাদিনের পর মেকআপও কিছুটা ফিকে হয়ে যায়। সিঁড়ি ভাঙতে গেলে ঘাম হয়, চুল এলোমেলো হয়ে যায়, পোশাকে ফুটে ওঠে ঘামের দাগ। কখনো কখনো ভুলও করে সে। দেখতে একেবারেই সাধারণ এক তরুণী। অথচ বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্বই নেই।
চীনের নতুন ভার্চুয়াল তারকা ফ্যাং তাওজি এখন দেশটির বিনোদন দুনিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। মাত্র ২০ বছর বয়সী এই চরিত্রটি পুরোপুরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি। কিন্তু দুই মাসেরও কম সময়ে তার অনুসারীর সংখ্যা প্রায় চার লাখ। আর তাকে নিয়ে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য ধারাবাহিক ‘দ্য লেড-অফ গার্ল’ দেখেছে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ।
চীনা সংবাদমাধ্যম ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্যাংয়ের জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় রহস্য তার ‘অসাধারণ’ হওয়া নয়, বরং ‘সাধারণ’ হয়ে ওঠা।
ধারাবাহিকটিতে ফ্যাং অভিনয় করেছে ছোট শহরের এক তরুণীর চরিত্রে। মডেল হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সে কাল্পনিক শহর শাংনানে পাড়ি জমায়। কিন্তু চীনা নাটকের প্রচলিত নিখুঁত, আত্মবিশ্বাসী নায়িকাদের মতো নয় ফ্যাং। সে দুর্বল হয়, প্রয়োজনে আপস করে, কখনো শর্টকাট খোঁজে, কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয়।
অর্থাৎ, তাকে নিখুঁত মানুষ হিসেবে তৈরি করা হয়নি। বরং মানুষের মতো করে তোলার জন্য দেওয়া হয়েছে তার অসম্পূর্ণতাগুলোই।
জুনের মাঝামাঝি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাত্রা শুরু করে ফ্যাং। এ পর্যন্ত সে রান্না করছে, শরীরচর্চা করছে, আবার প্যারিসের ফ্যাশন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে—এমন ৪৩টি ভিডিও প্রকাশ করেছে। ভিডিওগুলোতে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ লাইক পড়েছে।
তার চারপাশে তৈরি হয়েছে পুরো একটি কাল্পনিক জগৎ। তার সহকারী মিমির অনুসারী প্রায় ২০ হাজার। নাটকের প্রেমিক ঝৌ ইহেংয়ের অনুসারী প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার। দর্শকেরা তাদের সম্পর্ক নিয়েও আগ্রহী—যেন তারা বাস্তব জীবনের তারকা।
কেউ কেউ ফ্যাংয়ের চুলের সাজ ও মেকআপও অনুকরণ করছেন। আর যেখানে ভক্ত, সেখানেই বিজ্ঞাপন। সম্প্রতি রঙিন কন্টাক্ট লেন্সের প্রচারে দেখা গেছে তাকে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার বিজ্ঞাপনের পারিশ্রমিক এখন ১ কোটি অনুসারী থাকা কিছু মানব ইনফ্লুয়েন্সারের পারিশ্রমিককেও ছাড়িয়ে গেছে।
তবে এখানেই তৈরি হচ্ছে অদ্ভুত এক প্রশ্ন। যে চোখে কখনো কন্টাক্ট লেন্স পরেনি, সে কন্টাক্ট লেন্সের বিজ্ঞাপন করবে কীভাবে?
ফ্যাংয়ের উত্থান তাই শুধু প্রযুক্তির সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাস্তব অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জন্যও সতর্ক সংকেত। চীনের দ্রুত বর্ধনশীল স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটকের শিল্পে গত বছর প্রায় ৭ শতাংশ প্রযোজনায় এআই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছিল। চলতি বছরে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশে।
মানব অভিনয়শিল্পীদের উদ্বেগের কারণও স্পষ্ট। অভিনেতা ঝাং শিয়াওলেই, যিনি স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটকে প্রায়ই দাপুটে বসের চরিত্রে অভিনয় করতেন, কয়েক মাস কাজ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের শহরে ফিরে কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অবশ্য ফ্যাং তাওজির সাফল্য এখনই প্রমাণ করে না যে, এআই মানব কলা-কুশলীদের পুরোপুরি সরিয়ে দেবে। কিন্তু একটি বিষয় সে ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে—মানুষ এমন একজন তারকার প্রেমে পড়তে পারে, রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে যার কখনো জন্মই হয়নি।
সম্ভবত এআই বিনোদনের সবচেয়ে বড় কৌশলটিও এখানেই। মানুষকে বিশ্বাস করাতে যে—তুমি মানুষ, তোমাকে নিখুঁত হতে হবে না। বরং তোমার দরকার ঘাম, ক্লান্তি, এলোমেলো চুল, ত্বকের দাগ—আর কিছুটা দুর্বলতা।
কারণ দর্শক হয়তো নিখুঁত নায়ককে পছন্দ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আপন করে নেয় অসম্পূর্ণ মানুষকেই—এমনকি সেই মানুষটি যদি কেবল একটি অ্যালগরিদমের তৈরি চরিত্র হয়।