প্রাত্যহিক জীবনে বিনোদন কিংবা অফিসের কাজে হেডফোন এখন অপরিহার্য। তবে সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে পিলে চমকানো তথ্য। বাজারজাত হওয়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হেডফোন পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এগুলোর প্রতিটিতেই মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ও বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি রয়েছে। এসব রাসায়নিক ক্যানসার, স্নায়বিক সমস্যা এবং হরমোনের ভারসাম্য (পুরুষের মধ্যে মেয়েলি স্বভাব) নষ্ট করার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
আপনার প্রিয় হেডফোনটিও কি আপনার অজান্তেই শরীরে বিষ ছড়াচ্ছে?
সম্প্রতি ‘টক্সফ্রি লাইফ ফর অল’ প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষায় ব্যবহৃত প্রতিটি হেডফোনেই মানবস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক রাসায়নিকের উপস্থিতি রয়েছে। গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, হেডফোনে থাকা এসব রাসায়নিক ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে এবং পুরুষের হরমোনের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে পারে।
টক্সফ্রির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বোস, প্যানাসনিক, স্যামসাং এবং সেনহাইজারের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের হেডফোনেও প্লাস্টিক তৈরির ফর্মুলায় ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া গেছে। চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, স্লোভেনিয়া এবং অস্ট্রিয়ার বাজারসহ অনলাইন শপ শেইন ও টেমু থেকে সংগৃহীত ৮১ জোড়া ইন-ইয়ার এবং ওভার-ইয়ার হেডফোন ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা গেছে, সব কটি হেডফোনেই কোনো না কোনো বিপজ্জনক উপাদান রয়েছে।
চেক অলাভজনক সংস্থা আর্নিকার রাসায়নিক বিশেষজ্ঞ ক্যারোলিনা ব্র্যাবকোভা বলেন, এই রাসায়নিকগুলো কেবল হেডফোনের উপাদানের সঙ্গে মিশে নেই; এগুলো সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে ব্যায়াম করার সময় বা দীর্ঘ সময় ব্যবহারের ফলে শরীর গরম হয়ে ঘাম তৈরি হয়, যা রাসায়নিকগুলোকে ত্বক দিয়ে শরীরে শোষিত হতে সাহায্য করে।
গবেষকেরা বলছেন, যদিও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ঝুঁকি দেখা যায় না, তবে দীর্ঘ মেয়াদে এটি বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ। হরমোনের ভারসাম্য নষ্টকারী এসব উপাদানের কোনো ‘নিরাপদ মাত্রা’ নেই।
কী কী রাসায়নিক পাওয়া গেছে
বিসফেনল এ এবং বিসফেনল এস—৯৮ শতাংশ নমুনায় বিপিএ এবং তিন-চতুর্থাংশ নমুনায় বিপিএস পাওয়া গেছে। এগুলো ইস্ট্রোজেন হরমোনের অনুকরণ করে শরীরে প্রবেশ করে ক্যানসার সৃষ্টি করে এবং ছেলেদের মধ্যে মেয়েলি বৈশিষ্ট্য বাড়িয়ে দেয়।
থ্যালেটস নামে একধরনের রাসায়নিক—যা প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। ক্লোরিনেটেড প্যারাফিন—যা যকৃৎ ও কিডনির ক্ষতি করে। এ ছাড়া ফ্লেম রিটারডেন্ট নামেও একধরনের রাসায়নিক পাওয়া গেছে, যা হরমোনের ক্ষতি করে।
মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী কর্মীরা একে ‘বাজারব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যর্থতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁরা ভোক্তা পণ্যে এ ধরনের হরমোন ধ্বংসকারী রাসায়নিকের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং উৎপাদনকারীদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এর আগে একই প্রকল্পের অধীনে শিশুদের প্যাসিফায়ার বা চুষনি এবং মেয়েদের অন্তর্বাসেও এ ধরনের বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল।