সাক্ষাৎকার

‘আমাদের খেলার ধরনে আমরাই সেরা’

মাত্র চার বছর আগের কথা। স্প্যানিশ ফুটবলে লুইস দে লা ফুয়েন্তের নামের পাশে তখনো অভিজ্ঞতার অভাব আর নানা প্রশ্নের কালো ছায়া। সেই মানুষটাই বর্তমানে ফুটবলের সবচেয়ে প্রশংসিত কোচ। স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের অনূর্ধ্ব দলগুলোতে দীর্ঘ পথচলার পর যখন জাতীয় দলের দায়ভার হাতে নেন, একে একে উপহার দিলেন নেশনস লিগ, ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ, আর এবার বিশ্বকাপ জয়! স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএসকে দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হলো আজকের পত্রিকার পাঠকদের জন্য—

প্রশ্ন: চার বছর আগে বলেছিলেন, আপনার কাছে সেরা খেলোয়াড়েরা আছে। ভেবেছিলেন, বিশ্বকাপ জিতেই তা প্রমাণ করতে হবে?

ফুয়েন্তে: নিশ্চিতভাবেই না, তবে পথ তো তৈরি হয় ধাপে ধাপে। আর এই দল প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়েছে দারুণ আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা, শক্তি ও বিচক্ষণতার সঙ্গে...যখন বিশ্বকাপের মূল লড়াইয়ে নেমে পড়ি, তখন মনে হয, ‘আমরা নিশ্চিতভাবেই লড়ব।’ আমি সব সময় এটাই বলেছি। তবে জেতাটা আলাদা বিষয়। ফাইনালে আমরা স্পষ্টভাবেই সেরা ছিলাম, তারা আমাদের গোলমুখে একটা শটও নিতে পারেনি। আমাদের মধ্যে কিছুটা প্রশান্তি ছিল ঠিকই, তবে সেটিকে সব সময় সতর্কতার সঙ্গে দেখতে হয়। কারণ, এর পরেও আপনি হারতে পারেন। অতিরিক্ত সময়ে কুবারসির সেই ক্লিয়ারেন্সটি যদি উনাই সিমনের গায়ে লেগে গোলে ঢুকে যেত...তবে তারা কোনো শট না নিয়েই জিতে যেত। ভাগ্য ভালো, পরিস্থিতি খুব ভালোভাবে সামলানো গেছে।

প্রশ্ন: যখন শোনেন, বলা হচ্ছে এটি ‘লুইস দে লা ফুয়েন্তের বিশ্বকাপ’, তখন কী মনে হয়?

ফুয়েন্তে: সত্যি বলতে আমার লজ্জা লাগে (হাসি)। তবে মনে করিয়ে দিতে চাই যে এটি একটি অসাধারণ দলের বিশ্বকাপ।

প্রশ্ন: পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করে কীভাবে বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব?

ফুয়েন্তে: পুরো টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষ আমাদের গোলমুখে মাত্র ১০টি শট নিতে পেরেছে। এর কারণ, আমাদের ডিফেন্সিভ কৌশল খুব ভালোভাবে গোছানো ছিল। পুরো টিম দারুণভাবে রক্ষণ সামলায়। সেখানে ১১ জন খেলোয়াড়ই ডিফেন্স করে। এই দল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ; কারণ, পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, আমরা গোলস্কোরিং দল। প্রচুর গোল করেছি, আর হজম করেছি মাত্র একটি। আর এটি ধারাবাহিকতা। ৫০ ম্যাচে আমরা ১০০টির বেশি গোল করেছি এবং বিপক্ষে হজম করেছি খুব কমই। এই দল খুবই ঐক্যবদ্ধ, দায়িত্বশীল ও নিখুঁত রক্ষণাত্মক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে।

প্রশ্ন: বিশ্বকাপ চলাকালীন কি আপনার মনে কোনো সন্দেহ জেগেছিল?

ফুয়েন্তে: না। এমনকি প্রথম ম্যাচের পরও নয়। বাইরে কী বলা হচ্ছে, তা আমি খেয়াল করি না; এতে মন শান্ত থাকে। প্রথম ম্যাচের পর আমরা জানতাম, এটিই সঠিক প্রক্রিয়া। কোনো দিন যদি আপনার অনুপ্রেরণার অভাব হয় আর প্রতিপক্ষের তা থাকে...অসাধারণ এক পরিবেশে দল ধীরে ধীরে আরও উন্নত হয়েছে। ৫২ দিনে একটিও সমস্যা হয়নি। এটা সত্যিই কঠিন।

প্রশ্ন: খেলোয়াড়দের প্রায় ১৬ বছর বয়স থেকে জানা নিশ্চয় পুরো টুর্নামেন্ট পরিচালনায় সাহায্য করেছে?

ফুয়েন্তে: অবশ্যই, এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। যেমন উনাই সিমন, মিকেল মেরিনো, রদ্রি...এরা সেই প্রজন্ম, যাদের নিয়ে আমরা ২০১৫ সালে শুরু করেছিলাম। তারও আগে ইউরো প্রাক্‌-বাছাইয়ে আমি মার্কোস ইয়োরেন্তেকে কোচিং করিয়েছি। মনে হচ্ছে, ১৬-১৭ বছর বয়সে যাদের নিয়ে শুরু করেছিলাম, সেই প্রজন্মের চক্রটি পূরণ হলো। ২০২৬ সালের ১৯ জুলাই বিশ্বকাপ ফাইনাল অনুষ্ঠিত হলো; ঠিক ১১ বছর আগে গ্রিসে অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম আমরা। তবে সেবার মিকেল ওইয়ারসাবাল ও ফাবিয়ান রুইস আমাদের দলে ছিল না।

প্রশ্ন: আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফেরান তোরেসের গোলটি বিশেষ কিছু ছিল?

ফুয়েন্তে: ফাইনালে ফেরান গোল করায় আমি ভীষণ খুশি হয়েছিলাম; কারণ, আমি সৎ থাকার চেষ্টা করি। যখন ভিত্তিহীন, অতিরঞ্জিত বা খারাপ উদ্দেশ্যে সমালোচনা দেখি, তখন দেখেছি যে পরে জীবনই নিজেকে প্রমাণ করার এবং জবাব দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। জাতীয় দলে ফেরানের পরিসংখ্যান অসাধারণ, এমনকি তার ক্লাবেও ঠিক একই রকম। তার গোল করার হার চমকপ্রদ। সে আমাকে অনেকটাই আলভারো মোরাতার কথা মনে করিয়ে দেয়। অন্যায্য সমালোচনার মুখে মানুষ যখন বলতে সক্ষম হয়, ‘আমি এখনো এখানে আছি’। তখন সত্যিই আনন্দ লাগে, আর এই সাফল্য সে নিজেই অর্জন করে নিয়েছে; অন্য কেউ হলে নিশ্চিতভাবেই হাত গুটিয়ে নিত এবং হারিয়ে যেত।

প্রশ্ন: ২০২৪ ইউরো জেতার চেয়ে এই বিশ্বকাপ জেতা বেশি কঠিন ছিল?

ফুয়েন্তে: এগুলো সম্পূর্ণ আলাদা টুর্নামেন্ট। ইউরোপীয় ফুটবল আমাদের খুব ভালো চেনা এবং আয়ত্তে আনা। তা অনেক বেশি পরিচিত। কিন্তু বিশ্বকাপ আপনাকে অন্যভাবে মানিয়ে নিতে বাধ্য করে—আফ্রিকান, দক্ষিণ আমেরিকান দলগুলোর বিপক্ষে খেলতে হয়...আমরা জানতাম, উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ বা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনাল কেমন হবে। দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল এমনই। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল আমাদের নিজেদের খেলাটা খেলা। কেউ ছকের বাইরে যায়নি এবং প্রতিপক্ষের ফাঁদে পা দেয়নি; কারণ, আমরা ওই ধাঁচে খেলতে জানি না। তারা ওই ধারায় সেরা, তা করতে গেলে আমরা নিশ্চিতভাবে হারতাম এবং বাজেভাবে হারতাম। কিন্তু আমাদের খেলার ধরনে আমরাই সেরা।

প্রশ্ন: এখন স্পেনের মডেলকে অনুসরণ করতে চাচ্ছে সবাই।

ফুয়েন্তে: এসব প্রশংসা আমাদের ধারণাকে আরও সুদৃঢ় করে। এটি নতুন কিছু নয়; বছরের পর বছর ধরে এই মডেলে কাজ করার ফল। আমরা এর প্রতি আস্থা রেখেছি। তবে জাতীয় দলের প্রতিটি কোচই নিজ নিজ কিছু বৈচিত্র্য যোগ করেছেন—শুধু সিনিয়র দলে নয়, যুব পর্যায়েও, যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে মূল ভাবনা সব সময় একই ছিল। এটি আমার আসার আগের মডেল, যা সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে। প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টই নতুন এক ধাপ। ইউরোতেও যখন আমরা উইঙ্গারদের নিয়ে খেলা শুরু করলাম, তখন ধারণায় পরিবর্তন এসেছিল। এখন গতি ও ট্রানজিশনই মূল বিষয়। আগে ভাবা হতো, পজেশন বেশি থাকা দলই বেশির ভাগ ম্যাচ জিতবে, এখন তা নয়। ৩০% পজেশন থাকা দলও আপনাকে ৩-১ গোলে হারিয়ে দিতে পারে।

প্রশ্ন: ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়ন দলের সঙ্গে বর্তমান দলের কী মিল দেখতে পান?

ফুয়েন্তে: গত ১৬ বছরে ফুটবল অনেক বদলে গেছে। আমাদের মডেল একই আছে, তবে তা বিকশিত হয়েছে। আমি ‘টিকিটাকা’র মতো বাঁধাধরা শব্দের অনুরাগী নই। আমি বুঝি, কেন মানুষ এটি ব্যবহার করে, তবে আমার পছন্দ নয়। আমি মনে করি, পজেশনভিত্তিক ফুটবল বলাই শ্রেয়। টিকিটাকা শব্দটি মাঝেমধ্যে একটু তুচ্ছ অর্থে ব্যবহৃত হয়। তা সত্ত্বেও এই ধরন স্প্যানিশ ফুটবলে গভীরভাবে গেঁথে আছে। প্রথমে ক্লাবগুলোতে, আর জাতীয় দল এটিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরে প্রভাব ফেলেছে। যদিও তা শুরু হয় ক্লাব থেকে। অন্য কিছু হওয়া সম্ভবও ছিল না; কারণ, জাতীয় দল ক্লাব থেকেই খেলোয়াড় পায়।

প্রশ্ন: আপনি যেমন সব সময় বলেন, এমন খেলোয়াড়দের খোঁজেন, যারা ভালো মানুষও...

ফুয়েন্তে: কারণ, এটি পরস্পরবিরোধী নয়। আমরা টানা ৫২ দিন একসঙ্গে কাটিয়েছি, অলিম্পিকে ৪৫ দিন, অনূর্ধ্ব-২১ দলের সঙ্গে ৪৩ দিন...আর ভালো মানুষের কথা বলতে—কাজের জায়গায় কে না চায়, একজন ভালো মানুষকে পাশে পেতে? আমার মনে হয়, ভালো মানুষের সঙ্গে পথচলা অনেক বেশি নিরাপদ হয়। তা ছাড়া এটি খেলোয়াড়ের মান, ব্যক্তিত্ব বা জেদের সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করে না। মানুষ প্রায়ই দুটোকে গুলিয়ে ফেলে। ভালো মানুষের সঙ্গে আমি বেশি নিরাপদ বোধ করি। বয়সভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে এত দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে বেশির ভাগ ফুটবলারকেই খুব কাছ থেকে চিনি। আমি ওদের ‘কাঁচামাল’ বলি; আমরা খুব ভালো করেই জানি, কারা কখনো হতাশ করবে না, কিংবা ৫২ দিন ক্যাম্পে থেকে এক মিনিটও খেলার সুযোগ না পেলেও অসন্তোষ প্রকাশ করবে না। আমরা জানি, তারা কেমন মানুষ।

প্রশ্ন: ২০৩০ বিশ্বকাপের দিকে কি এখন থেকেই নজর রাখছেন?

ফুয়েন্তে: চার বছর পর আবার এই অনুভূতির পুনরাবৃত্তি করতে পারব বলে আশা করি। কারণ, এবারের অভিজ্ঞতা ছিল অনন্য। আনন্দের কারণে, অভিজ্ঞতার কারণে এবং এমন এক সাফল্য উপভোগ করে পুরো দেশের মুখে হাসি ফোটানোর কারণে। ২০৩০ বিশ্বকাপ নিয়ে ভাবছি? আমি খুব স্বল্পমেয়াদি চিন্তার মানুষ। আর এখন আমাদের পুরো নজর সেপ্টেম্বর মাসের ম্যাচগুলোর ওপর। সেটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা শুধু পরবর্তী প্রতিযোগিতার কথাই ভাবি।

‘অস্ট্রেলিয়ায় আমরা জিততে পারব না, বিষয়টা তেমন না’

‘অস্ট্রেলিয়া সিরিজের পর নিজের প্রতি প্রত্যাশা আরও বেড়ে গেছে’

জন্মদিনে নিজের জন্য কী চাইবেন মেসি

ফ্রান্সই হট ফেবারিট

‘ব্রাজিলকে অহংকার সরিয়ে রেখে খেলতে হবে’

‘দলকে আমার এখনো অনেক কিছুই দেওয়ার আছে’

টেস্ট বিশেষজ্ঞ তকমা চান না অমিত

‘১৫ বছর খেলেও বাফুফের কাছ থেকে সাপোর্ট পাইনি’

‘আমার ক্যারিয়ারে আর অবশিষ্ট কী রইল’

জানি না রিপোর্টটা কীভাবে ব্যবহৃত হবে