জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচের দায়িত্ব থেকে গত পরশু আকস্মিক সরিয়ে দেওয়া হয়েছে মোহাম্মদ আশরাফুলকে। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বোর্ডের সময়ে নিয়োগ পাওয়া আশরাফুলকে সরিয়ে দেওয়া হলো এক বছরের কম সময়ের মধ্যে। কদিন আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশ দলের ব্যর্থতার দায়ই যেন চুকাতে হলো সাবেক এ অধিনায়ককে। তাঁকে নিয়ে বিসিবির সিদ্ধান্ত, বাংলাদেশ দলের সাম্প্রতিক ব্যাটিং ব্যর্থতা নিয়ে বিস্তারিত কথা হলো আশরাফুলের সঙ্গে। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রানা আব্বাস।
প্রশ্ন: পুরো দলীয় ব্যর্থতার ভার কি আপনার একার কাঁধেই চাপানো হলো?
মোহাম্মদ আশরাফুল: আমি এ নিয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না। গতকালও (পরশু) অনুশীলন করিয়েছি ছেলেদের। টেস্টে ওরা খুব ভালো করছে। কদিন পর ঘরের মাঠে আরেকটি টেস্ট সিরিজ, ঠিক তার আগে...।
প্রশ্ন: ব্যাটিং কোচ হিসেবে জাতীয় দলে প্রায় এক বছরের যাত্রা কেমন ছিল?
আশরাফুল: আলহামদুলিল্লাহ খুবই ভালো। আটটা টেস্ট ম্যাচে কাজ করছি। পাঁচটা জিতেছি, একটা ড্র। ব্যাটারদের প্রায় ৪৫-৫০ গড়। র্যাঙ্কিংয়ে চার নাম্বারে আছে ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের। ওয়ানডেতে ১৪ ম্যাচ কাজ করছি। সেখানে ব্যাটাররা শেষ চার-পাঁচ ম্যাচে ভালো করেনি। আগের ৯ ম্যাচ যদি দেখেন, আমরা অস্ট্রেলিয়ার মতো দলকে সিরিজ হারালাম। নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তানকেও হারিয়েছি। সেখানেও আপনি ব্যাটারদের গড় দেখেন, ৪৫-৫০ গড়ে খেলেছে। ১১ টি-টোয়েন্টিতে কাজ করেছি। ১১টার মধ্যে পাঁচটা জিতেছে। ছয়টা হার। ওয়ানডে ব্যর্থতার ব্যাখ্যায় বলব, তানজিদ তামিম আর তাওহীদ হৃদয় ভালো খেলেছে। আর কেউ অতটা ভালো খেলতে পারেনি। নিয়মিত অধিনায়ক লিটন দাস আসলে খেলতে পারেনি অনেক ম্যাচ। সব মিলিয়ে উপভোগ করেছি এবং দলের ব্যাটিংও ভালো হচ্ছিল। শুধু শেষ পাঁচটা ওয়ানডেতে ভালো হয়নি। কিন্তু টেস্টে তো আমরা খুব ভালো করছি। অস্ট্রেলিয়ার মাঠে গিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো তো ইতিহাস। আর আমার বয়স যা হয়েছে, কোচিংয়ে আমি তরুণ। এটা আমার সামনের দিনগুলোয় আরও কাজে দেবে।
প্রশ্ন: টেস্টে ব্যাটিং ভালো হচ্ছে বলেও টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ চারে আছে। কিন্তু সাদা বলের ক্রিকেটে ঠিক তার বিপরীত। বিশেষ করে দেশের বাইরে। এখানে উন্নতি হচ্ছে না কেন?
আশরাফুল: দেশের বাইরে আগের ব্যর্থতা নিয়ে তো জানি না। আমি দলে কাজ শুরুর পরে পাঁচটা ম্যাচ পেয়েছি। চারটা হেরেছি। একটা জিতেছি। যে দুইটা ম্যাচ হেরেছি, সহজ ম্যাচ ছিল। কিন্তু হেরে গেছি। যেমন—প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে ছিল। বাইরের উইকেট নিয়ে আরও কাজ করতে হবে, যেহেতু আমরা গত এক বছরে ভালো উইকেটে খেলছি। বাংলাদেশ কিন্তু আগে এত ভালো উইকেটে খেলত না। এখন তো আমরা ভালো উইকেটে খেলছি, স্পোর্টিং উইকেটে। তো উন্নতি হবে। টেস্ট দলটা ভালো করার পেছনে দলে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারে পূর্ণ। ওয়ানডে দলটাতে যদি দেখেন যে লিটন খুব ভালো ফর্মে ছিল। এই বছর ৯ ম্যাচে ৪২ গড়ে। কিন্তু পরে সে চোটে পড়ায় শেষ পাঁচ ওয়ানডে খেলতে পারেনি। এই জায়গায় আমাদের একটা বড় ঘাটতি হয়ে গেছে। শেষ পাঁচটা ম্যাচ যে বাংলাদেশ খারাপ করেছে, ওই জায়গায় লিটনের না থাকাটা একটা বড় প্রভাব পড়েছে।
প্রশ্ন: সৌম্য সরকারের বিষয়টি কী, ১২-১৩ বছর হয়ে গেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। এখনো ধারাবাহিক ছন্দের অভাব।
আশরাফুল: আমরা কাজ করছিলাম ওর সঙ্গে। এখন তার যে অবস্থা, প্রতি দুই ম্যাচ পরপরই একটা বড় ইনিংস খেলা উচিত। কারণ, এত দিন ধরে খেলছে। সেটা নিয়ে কাজ হচ্ছিল। কিন্তু আসলে এভাবেও যদি দেখেন যে এক ম্যাচ খারাপ করলেই প্রশ্ন ওঠে। এই চাপটা তো সবাই নিতে পারে না। দুই ম্যাচ আগেও কিন্তু ৬০ করছিল, ঠিক না? এগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম।
প্রশ্ন: আমাদের ব্যাটারদের মূল সমস্যাটা আপনার কোথায় মনে হয়েছে? যে বিশেষ করে দেশের বাইরে বেশি ব্যর্থ হওয়ার কারণ কী?
আশরাফুল: তারা ঠিক বুঝতে পারে না আর কী! পরিস্থিতি কী চাচ্ছে, দল কী চাচ্ছে—এসব বুঝতে পারছে না। টেকনিক্যাল বিষয় তো আছে। কিন্তু মূল সমস্যাটা আমার মনে হয় যে আসলে এই সময়ে আমার কাছে দল কী চাচ্ছে? ম্যাচ কী চাচ্ছে, সেটা বুঝতে গিয়ে একটু ভুল করে ফেলে। বলা হয়। কানেও শোনে। শোনার পরে ভেতরে ঢোকায় না আর কি! সাইফের সর্বশেষ ইনিংস দেখুন, ৮২ বলে ৪১ রান করেছে। ধৈর্য ধরে খেলার পরে ঠাস করে ডাউন দ্য উইকেটে চলে গেল। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে ওই শট তো দরকারই নেই। ক্যারেক্টার তো আর কোচ তৈরি করতে পারবে না। ক্যারেক্টার ভেতর থেকে আনতে হবে।
প্রশ্ন: যেভাবে জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ অধ্যায় আকস্মিক শেষ হয়ে গেল, কতটা হতাশ?
আশরাফুল: আমি এত হতাশ না। আমার কোচিংয়ে মাত্র ক্যারিয়ার শুরু। শুরুতে এত বড় একটা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি জীবনে। সামনে তো ভবিষ্যৎ পড়ে রয়েছে। এত হতাশ না। কারণ, দল খারাপ করেনি। আমি মনে করি যে ব্যাটাররা ভালোই করছিল। হ্যাঁ, ওয়ানডে লাস্ট কয়েকটা ম্যাচ খারাপ করছে। কিন্তু টেস্ট দল তো খুবই ভালো হচ্ছিল।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ টেস্টটা যেহেতু ভালো করছে। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে আপনি কতটা আশাবাদী?
আশরাফুল: অবশ্যই। ভালো হবে ইনশা আল্লাহ। আমরা তো টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে খুব ভালো অবস্থানে আছি।
প্রশ্ন: আপনার জায়গায় আপাতত কোচ মোহাম্মদ সালাহ উদ্দীনকে আনা হচ্ছে। অথচ আপনাকে আনা হয়েছিল তাঁর জায়গায়। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
আশরাফুল: আজ এই জায়গায়, কাল ওই জায়গায়, ইমপ্রুভমেন্টের জন্য যা হবে, ওটা তো আপনার মানতে হবে।
প্রশ্ন: যাদের সঙ্গে কাজ করলেন, এর মধ্যে আগামী পাঁচ-দশ বছরে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মনে হয় কাদের?
আশরাফুল: তানজিদ তামিম তো অসাধারণ একজন ট্যালেন্টেড প্লেয়ার। ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টিতে তাওহীদ হৃদয় অসাধারণ। সব ব্যাটারই ভালো করছে। (নাজমুল হোসেন) শান্ত চমৎকার ফর্মে। মুমিনুল (হক) অনেক ভালো খেলছে, মুশফিকও (রহিম) ভালো খেলছে। মনে করি সামনের পাঁচ বছর তো অবশ্য শান্ত তো থাকবেই সহজে। তারপর তামিম, তাওহীদ, লিটনের তো আরও পাঁচ বছর ধারাবাহিক সেরাটা দেওয়া উচিত বাংলাদেশকে।