প্যারাগুয়ের বিপক্ষে গতকাল ৪-১ গোলের দাপুটে জয় দিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু করেছে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। ঘরের মাঠে এমন শুরুর পেছনে কৃতিত্বটা জোড়া গোল করা ফোলারিন বালোগানের। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে এই প্যারাগুয়ের বিপক্ষেই বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম হ্যাটট্রিক করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ট প্যাটেনোড। এরপর বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ফুটবলারই এক ম্যাচে একাধিক গোল করতে পারেননি। ৯৬ বছর পর সেই আক্ষেপ ঘুচিয়েছেন বালোগান।
২৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের ‘আমেরিকান’ হয়ে ওঠার গল্পটা যেকোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসকেও হার মানায়। এক বিমান সংস্থার অনড় সিদ্ধান্ত আর ভাগ্যের এক আশ্চর্য মোচড়ে ইংল্যান্ড ও নাইজেরিয়ার ডেরা ছেড়ে এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জার্সি গায়ে বিশ্বমঞ্চ কাঁপাচ্ছেন।
২০০১ সালের ঘটনা, বালোগান তখনো মায়ের গর্ভে। তাঁর নাইজেরিয়ান মা ইংল্যান্ড থেকে বেড়াতে এসেছিলেন নিউইয়র্কে। ছুটি কাটিয়ে যখন লন্ডনে ফেরার বিমানে উঠতে যাবেন, তখন বাদ সাধল বিমান সংস্থা। গর্ভের অবয়ব এবং প্রসবের সময় একদম ঘনিয়ে আসায় বিমান কর্তৃপক্ষ তাঁকে প্লেনে চড়তে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। বাধ্য হয়েই নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে থেকে যেতে হয় তাঁকে। আর সেখানেই জন্ম নেন বালোগান; জন্মসূত্রে পেয়ে যান মার্কিন নাগরিকত্ব। এর কয়েক মাস পরই অবশ্য মা-বাবার সঙ্গে লন্ডনে পাড়ি জমান তিনি।
লন্ডনে বড় হতে হতেই ফুটবলের প্রেমে পড়েন বালোগান। জায়গা করে নেন বিখ্যাত ক্লাব আর্সেনালের যুব একাডেমিতে। গানারদের মূল দলে নিয়মিত সুযোগ না পেয়ে ২০২২ সালে ধারে যোগ দেন ফরাসি ক্লাব রেঁসে। আর সেখানেই ঘটে তাঁর প্রতিভার বিচ্ছুরণ। সেই মৌসুমে লিগ ওয়ানে ৩৯ ম্যাচে ২২ গোল করে চমকে দেন এই তরুণ, যা ছিল লিওনেল মেসির চেয়েও ৬ গোল বেশি! এই চোখধাঁধানো পারফরম্যান্সের পর ২০২৩ সালে ৩০ মিলিয়ন ইউরোর চুক্তিতে তাঁকে লুফে নেয় ফরাসি ক্লাব এএস মোনাকো।
পারিবারিক সূত্রে নাইজেরিয়া, বেড়ে ওঠার কারণে ইংল্যান্ড আর জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্র—তিনটি দলের হয়েই খেলার যোগ্যতা ছিল বালোগানের। ২০২৩ সালের দিকে এই তরুণ তুর্কিকে নিজেদের ডেরায় টানতে মরিয়া হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশন। কেবল ফেডারেশনই নয়, মার্কিন ফুটবলভক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘উই ওয়ান্ট ফ্লো’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে রীতিমতো ঝড় তোলেন। তাঁকে রাজি করাতে ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ, ওয়েস্টন ম্যাককেনিদের মতো মার্কিন তারকারা বালোগানকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান। এমনকি বাস্কেটবল লিগ এনবিএ এবং বেসবল দল নিউইয়র্ক ইয়ানকিজের পক্ষ থেকেও তাঁকে দেওয়া হয় ভিআইপি আতিথেয়তা। তাতে মুগ্ধ হয়ে ২০২৩ সালের মে মাসে বালোগান বেছে নেন যুক্তরাষ্ট্রের জার্সি।
গতকাল লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে সেই সিদ্ধান্তকে সার্থক করলেন তিনি। প্রথম গোলটি ছিল চোখ ধাঁধানো বাঁকানো শটে গোলরক্ষককে বোকা বানানো। দ্বিতীয় গোলে ফুটে উঠল সতীর্থদের সঙ্গে তাঁর দারুণ রসায়ন। তৃতীয় গোলও হতে পারত, বাদ সাধল ভিএআর। তবু রাতটা ছিল বালোগানের। ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের বালোগান বলেন, ‘পুরো স্বপ্নের মতো একটা রাত। সত্যি বলতে, ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আমি এখনো সবকিছু পুরোপুরি উপলব্ধি করে উঠতে পারিনি। যখন হোটেলে ফিরে গিয়ে বিশ্রাম নেব, তখনই হয়তো এই চমৎকার মুহূর্তটি ভালোভাবে অনুভব করতে পারব।’
প্যারাগুয়েকে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘টেক অফ’ করা বালোগানের চোখ এখন অঘটন ঘটানোয়। বিশ্বমঞ্চে বড় দলগুলোকে হারানোর স্বপ্ন তাঁর, ‘ভাগ্য সহায় হলে আমরা টুর্নামেন্টটাই জিতে যাব। ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল, স্পেন... এগুলো সেই দল যাদের বিপক্ষে বড় কোনো অঘটন ঘটাতে আমি মুখিয়ে আছি।’
ফুটবল এমন কিছু অবিশ্বাস্য গল্প তৈরি হয়, যা ভাগ্য ছাড়া আর কিছু দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ভাগ্য পাশে না থাকলে বালোগানও ‘আকস্মিক আমেরিকান’ হয়ে উঠতে পারতেন না।