নকআউট পর্ব তো এমনই হয়, হয় মারতে হবে, না হয় মরতে হবে। জিতলে পরের রাউন্ড, হারলেই বিদায়। ২৯ জুন শেষ ৩২ পর্বের তিনটি ম্যাচই এতটা শ্বাসরুদ্ধকর, রোমাঞ্চকর আর নাটকীয়তায় ভরা, যেন প্রতি বেলায় একেকটা ব্লকবাস্টার সিনেমা!
‘স্পেস সিটি’ হিসেবে জগদ্বিখ্যাত হিউস্টনে ভয়ংকর এক ক্ষেপণাস্ত্রে ব্রাজিলকে ঘায়েলই করে বসেছিল জাপান। কিন্তু যারা নেমেছে বড় মিশনে, কার্লো আনচেলত্তির স্পেসক্র্যাফট তো এত ঠুনকো নয় যে শেষ বত্রিশেই সেটা ভেঙে পড়বে। আঘাত পেয়েই গর্জে উঠল সেলেসাওরা, ৯৬তম মিনিটে আর্সেনাল ফরোয়ার্ড গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির নাটকীয় জয়সূচক গোলে শেষ ১৬ নিশ্চিত হয়েছে ব্রাজিলের। নেইমারবিহীন ব্রাজিলের আনচেলত্তির আরেকটা ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাস দেখা গেল হিউস্টনে।
ব্রাজিল-জাপান ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে যেতে যেতেও যায়নি। কিন্তু একই দিনে বোস্টন আর মন্তেরেই যা দেখাল, অবিশ্বাস্য! দুটি ম্যাচই গড়িয়েছে টাইব্রেকারে। আর তাতে বিদায় ইউরোপের দুই পরাশক্তির। বোস্টনে জার্মানিকে বিদায় করেছে প্যারাগুয়ে। আর এই খুশিতে প্যারাগুয়েতে বুধবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার। প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা স্বয়ং নিজেই ইনস্টাগ্রামে জানিয়েছেন।
মন্তেরেইয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে আফ্রিকার সিংহ মরক্কো বিদায় করে দিয়েছে নেদারল্যান্ডসকে। এবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপ বলে গ্রুপপর্বে অনেক একতরফা ম্যাচ দেখার যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, সেটা এরই মধ্যে ভুল প্রমাণ হয়েছে। বরং কাগজে-কলমে ছোট দলগুলো অবাক করে দিয়েছে সবাইকে। নকআউট পর্বের শুরু থেকেই যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁজ আরও বেড়েছে।
জার্মানির বিপক্ষে পুরো ম্যাচজুড়ে জমাট রক্ষণব্যূহ তৈরি করে জার্মানদের আক্রমণভাগ কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখে প্যারাগুয়ে। যদিও বলের দখল ছিল বেশির ভাগ সময় জার্মানদের কাছেই। প্রথমার্ধে বারবার বল ঘুরিয়ে প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগে ফাঁক খোঁজার চেষ্টা করে জার্মানি। কিন্তু প্রতিবারই ফ্লোরিয়ান ভির্টজ ও কাই হাভার্টজদের প্রচেষ্টা অরল্যান্ডো গিলদের দৃঢ় রক্ষণে থেমে যায়।
প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগে ম্যাচে পাওয়া অল্প কয়েকটি কর্নারের একটা কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যায় প্যারাগুয়ে। কর্নার থেকে আসা বল ম্যানুয়েল নয়্যার ফিরিয়ে দিলেও প্যারাগুয়ে আবার বলের দখল নেয়। মাতিয়াস গালারসার দারুণ এক ক্রসে সম্পূর্ণ ফাঁকায় থাকা হুলিও এনসিসো হেডে জালে বল পাঠিয়ে দলকে এগিয়ে দেন।
বিরতির পর অনেক বেশি আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে মাঠে নামে জার্মানি এবং দ্রুতই সমতায় ফেরে। বাঁ দিক থেকে ফ্লোরিয়ান ভির্টজের নিখুঁত ক্রসে কাই হাভার্টজ হেডে গোল করে স্কোরলাইন ১-১ করেন।
দ্বিতীয়ার্ধ যত এগোয়, জয়ের গোলের জন্য মরিয়া হয়ে আক্রমণ বাড়াতে থাকে জার্মানি। প্যারাগুয়ে আরও রক্ষণাত্মক হয়ে নিজেদের অর্ধে নেমে আসে এবং পাল্টা আক্রমণের সুযোগের অপেক্ষায় থাকে, যদিও সেই সুযোগ আর তৈরি হয়নি।
টাইব্রেকার এড়াতে জার্মান কোচ নাগেলসমান একে একে সব আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়কে মাঠে নামান। একপর্যায়ে জনাথান তাহের গোলে জার্মানি জয়সূচক গোল পেয়েছে বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু অরল্যান্ডো গিলের ওপর ভালদেমার আন্তনের ফাউলের কারণে ভিএআরের সিদ্ধান্তে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। এরপর টাইব্রেকারের পরীক্ষায় প্যারাগুয়ের আনন্দে ভাসা। ২০১৪ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর জার্মানির কী যে ‘অভিশাপ’ লেগেছে, টানা তিনটি বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতেও যেতে পারল না ইউরোপীয় পরাশক্তিরা।
নেদারল্যান্ডস-মরক্কো ম্যাচ আরও রোমাঞ্চে ভরপুর। মেক্সিকোর মন্তেরেইয়ে নেদারল্যান্ডসের ফরোয়ার্ড কোডি গাকপো ব্যক্তিগত শোকের মধ্যে গোল করলেও ডাচদের আর শেষ হাসি হাসা হয়নি, হেসেছে মরক্কো।
নিজের অনাগত সন্তানকে হারানোর খবর প্রকাশের মাত্র দুই দিন পর মাঠে নেমে ডাচদের প্রথম গোলটা করেন গাকপো। তবে মরক্কো দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত জয় তুলে নেয় টাইব্রেকারে। একটা সময়ে ম্যাচটি জিতেই ফেলেছে বলে মনে হচ্ছিল নেদারল্যান্ডস। কিন্তু ডাচদের এই গোল মরক্কো শোধ করে দেয় ৯১ মিনিটে। গোল করেন ইসা দিওপ।
টাইব্রেকারে নায়ক হয়ে ওঠেন বুনু। দুই দলই দুটি করে শট মিস করার পর সামারভিলের স্পট-কিক রুখে দেন তিনি। এরপর সাইবারি নির্ভুলভাবে শেষ পেনাল্টিটি জালে জড়িয়ে শেষ ষোলোয় তুলে নেন মরক্কোকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, গ্রুপপর্বের সমীকরণে ৩২ রাউন্ডে ব্রাজিলের হুমকি হওয়ার কথা ভাবা হচ্ছিল যে তিন দলকে—জাপান, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস বাদ পড়েছে একই দিনে।
প্রায় প্রতিদিনই রোমাঞ্চ ছড়িয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ যেভাবে এগোচ্ছে, আরও অনেক কিছু দেখার বাকি।