বিশ্বকাপের মঞ্চে একটি গোলই একজন ফুটবলারের পরিচয় বদলে দিতে পারে। কিন্তু ইরাকের আয়মান হুসাইনের গল্প শুধু ফুটবলীয় সাফল্যের নয়, বরং যুদ্ধ, সন্ত্রাস ও ব্যক্তিগত শোককে জয় করে উঠে আসার এক অনন্য কাহিনি।
নরওয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ম্যাচে ইরাকের হয়ে সমতা ফেরানো গোলটি করেন আয়মান। আমির আল-আম্মারির ক্রস থেকে দুর্দান্ত এক হেডে জাল খুঁজে নেন তিনি। যদিও শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ৪-১ ব্যবধানে হেরে যায় ইরাক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে নরওয়ের শেষ গোলটিও তাঁর গায়ে লেগে জালে জড়ায়।
এই একটি গোলের গুরুত্ব অনেক বড়। বলিভিয়ার বিপক্ষে প্লে-অফে আয়মানের গোল যেমন ইরাককে বিশ্বকাপের পথে এগিয়ে দিয়েছিল, তেমনি বিশ্বকাপের মঞ্চে নরওয়ের বিপক্ষে তাঁর গোল লাখো ইরাকির মুখে হাসি ফোটায়। বাগদাদ থেকে বসরা, মসুল থেকে কারবালা—দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উচ্ছ্বাস। কিন্তু মাঠের সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বেদনাময় জীবনসংগ্রাম।
১৯৯৬ সালে হাওইজায় জন্ম নেওয়া আয়মান বেড়ে উঠেছেন এমন এক অঞ্চলে, যা ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আইএসআইএসের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক অভিযান, তেল পাইপলাইনে হামলা এবং গাড়িবোমা বিস্ফোরণ ছিল তাঁর দৈনন্দিন বাস্তবতার অংশ।
আয়মানের জীবনের ট্রজেডির গল্পটা তারও আগের। ২০০৮ সালে বাগদাদে এক হামলায় আল-কায়েদার হাতে নিহত হন তাঁর বাবা, যিনি ইরাকি সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা ছিলেন। বুকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে হুমকি পেলেও তিনি বিশ্বাস করতেন, তাঁর কোনো ক্ষতি হবে না।
আয়মানের পরিবারের দুর্ভোগ সেখানেই শেষ হয়নি। স্থানীয় পুলিশের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই ফুটবলারের ভাইকে একদিন নিজ বাড়ি থেকে অপহরণ করা হয়। এরপর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ মেলেনি। অপহরণের এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তাদের বাড়িতে বোমা হামলা চালানো হয় এবং সেটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
নিজের ভাইয়ের অপহরণ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আয়মান বলেন, ‘আসলে তার সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল, সেটা কেউই জানে না। আমার পরিবারে এটাই প্রথম ঘটনা নয়, সম্ভবত শেষ ঘটনাও নয়।’ নিরাপত্তাহীনতার কারণে ২০১৪ সালে পরিবারসহ কিরকুকে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন তিনি। শরণার্থী জীবনের কষ্টের মধ্যেও ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার কথা কখনো ভাবেননি।
আয়মেন বলেন, ‘আমি যদি ফুটবল ছেড়ে দিই, তাতে কিছুই বদলাবে না। আমি হারানো জিনিসগুলো ফিরে পাব না। বরং আমি আমার অবস্থার জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। আমার মাথার ওপর একটি ঘরের ছাদ আছে। অথচ ইরাকের অনেক বাস্তুচ্যুত মানুষ এখনো তাঁবুতে বসবাস করছে।’
সংগ্রামকে সঙ্গী করেই ইরাকের ফুটবলের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হয়েছেন আয়মান। জাতীয় দলের জার্সিতে ৯৬ ম্যাচে ৩৪ গোল করা এই স্ট্রাইকার ২০১৬ রিও অলিম্পিকে ইরাকের যোগ্যতা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
বিশ্বকাপের আলোয় আজ তিনি একজন নায়ক। তবে তার জীবনের গল্প মনে করিয়ে দেয়, অনেক সময় একটি গোলের পেছনে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য হারানোর বেদনা, অগণিত ত্যাগ আর অবিশ্বাস্য এক মানসিক শক্তির ইতিহাস।