ফুটবল বিশ্বকাপ মানে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি নানা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নিয়েও আলোচনা। এবারের বিশ্বকাপেও তেমনই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে টুর্নামেন্টের অফিশিয়াল ম্যাচ বল ‘ট্রাইওন্ডা’। কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আয়োজনে চলমান বিশ্বকাপের জন্য তৈরি করা এই বলকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ট্রাইওন্ডা নামটির পেছনেও রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। ইংরেজি উপসর্গ ‘ট্রাই’ অর্থ তিন এবং স্প্যানিশ শব্দ ‘ওন্ডা’ অর্থ তরঙ্গ বা ঢেউ। দুই শব্দের সমন্বয়ে গঠিত নামটি তিন আয়োজক দেশের ঐক্য ও যৌথ আয়োজনের প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। বিশ্বখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস বলটি তৈরি করেছে। এর নকশায় লাল, সবুজ ও নীল রঙের ঢেউ ব্যবহার করা হয়েছে, যা তিনটি আয়োজক দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে। পাশাপাশি বলের গায়ে গ্রাফিকসের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তিন দেশের জাতীয় প্রতীকও।
নকশার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর কেন্দ্রীয় প্যানেল-বিন্যাস। ত্রিভুজাকৃতিতে মিলিত হওয়া প্যানেলগুলো উত্তর আমেরিকার তিন দেশের ঐক্য, সংস্কৃতি এবং ফুটবল আবেগের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে ট্রাইওন্ডার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর প্রযুক্তিগত গঠন। প্রচলিত ফুটবলের তুলনায় এতে ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র চারটি প্যানেল, যা তাপীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত করা হয়েছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কোনো অফিশিয়াল বল এত কম প্যানেল দিয়ে তৈরি হয়নি।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই বলে প্রচলিত অর্থে বাতাস ভরার প্রয়োজন নেই; এটি চার্জের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। স্মার্টফোনের মতো চার্জ দেওয়ার পর বলটি প্রায় ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত সেই চার্জ ধরে রাখতে সক্ষম। বলের বায়ুগতিগত সক্ষমতাও বিশেষভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। উইন্ড টানেল পরীক্ষার ফল অনুযায়ী, এর গভীর সেলাই ও বিশেষ জ্যামিতিক নকশা বাতাসে বলের গতিপথকে আরও স্থিতিশীল রাখে। ফলে গতি কমে গেলেও বলের আচরণ থাকে নিয়ন্ত্রিত ও অনুমানযোগ্য, যা পাসিং, শট নেওয়া এবং গোলকিপিংয়ে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
এ ছাড়া বলের বাইরের বিশেষ টেক্সচার ভেজা কিংবা আর্দ্র আবহাওয়াতেও খেলোয়াড়দের ভালো গ্রিপ নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে বলকে আরও নিখুঁতভাবে স্পিন করানোর সুযোগও মিলবে। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের দিক থেকে ট্রাইওন্ডাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে অ্যাডিডাসের ‘কানেক্টেড বল টেকনোলজি’। বলটির ভেতরে সংযুক্ত করা হয়েছে ৫০০ হার্জ ইনার্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট (আইএমইউ) মোশন সেন্সর চিপ, যা প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার বলের গতিবিধি ও স্পর্শের তথ্য সংগ্রহ করে।
এই তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থার কাছে পৌঁছে যায়। ফলে অফসাইড শনাক্তকরণ আরও দ্রুত ও নির্ভুল হয়। পাশাপাশি পেনাল্টি বক্সে হ্যান্ডবল, ফাউল কিংবা অন্যান্য বিতর্কিত পরিস্থিতি বিশ্লেষণেও সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল ট্রাইওন্ডা শুধু একটি ম্যাচ বল নয়; এটি আধুনিক ফুটবলে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের নতুন এক প্রতীক হিসেবেই আলোচনায় উঠে এসেছে।