১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে খেলছে ৪৮ দল। ‘বিশ্বকাপের দল’ নিয়ে এই ধারাবাহিকে কোন দল কেমন, সেটি তুলে ধরার প্রয়াস। আজ থাকছে তিউনিসিয়া
উত্তর আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসে তিউনিসিয়া নামটির সঙ্গে একধরনের ধারাবাহিকতা মিশে আছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করার মাধ্যমে একবিংশ শতাব্দীতে সাত বিশ্বকাপের পাঁচটিতেই খেলতে যাচ্ছে। এই অর্জনের আনন্দ ছাপিয়ে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—তিউনিসিয়া কি কেবল অংশগ্রহণেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি গ্রুপ পর্বের গেরো খুলতে পারবে?
বিশ্বকাপ বাছাইয়ে তিউনিসিয়ার পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। ১০ ম্যাচে একটি গোলও হজম না করার অবিশ্বাস্য রেকর্ডটিই বলে দেয় তাদের মূল শক্তি কোথায়। ১০ ম্যাচের ৯টিতেই জয় এবং একটি ড্র—সম্ভাব্য ৩০ পয়েন্টের মধ্যে ২৮ পয়েন্ট নিয়ে তারা আধিপত্য বিস্তার করে। ফাউজি বেনজারতির হাত ধরে শুরু হলেও পরে সামি ট্রাবেলসির অধীনে দলটি যে রক্ষণাত্মক নিশ্ছিদ্রতা দেখিয়েছিল, তা যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্কের কারণ। বিশেষ করে গত সেপ্টেম্বরে ইকুয়েটরিয়াল গিনির বিপক্ষে মোহাম্মদ আলী বিন রোমদানের সেই নাটকীয় জয় তাঁদের আত্মবিশ্বাসকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এনে দিয়েছে বিশ্বকাপের টিকিট।
সবকিছু ঠিকঠাক চললেও কাসাব্লাঙ্কায় ২০২৫ আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের শেষ ১৬ থেকে বিদায় বেশ বড় ধাক্কা দেয় তিউনিসিয়াকে। টুর্নামেন্টে আশানুরূপ ফল না আসায় কোচিংয়েও আসে পরিবর্তন। সামি ট্রাবেলসিকে সরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সাবরি লামুশিকে। ৫৪ বছর বয়সী এই ফরাসি কোচের জন্য চ্যালেঞ্জটা ভিন্ন। ২০১৪ বিশ্বকাপে আইভরি কোস্টকে সামলানোর অভিজ্ঞতা থাকলেও, বর্তমান তিউনিসিয়া দলে বিশ্বমানের খেলোয়াড়ের অভাব রয়েছে। লামুশির অধীনে দল হাইতি বা কানাডার বিপক্ষে হারেনি ঠিকই, কিন্তু বিশ্বকাপের ‘এফ’ গ্রুপে নেদারল্যান্ডস কিংবা জাপানের মতো দলগুলোর বিপক্ষে কেবল ড্র দিয়ে পার পাওয়া কঠিন। দেখা যাক কোচ বদলে ভাগ্য বদলায় কি না।
তিউনিসিয়ার বিশ্বকাপ ইতিহাস গৌরব এবং আক্ষেপের এক মিশ্রণ। ১৯৭৮ সালে মেক্সিকোকে হারিয়ে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে জয়ের ইতিহাস গড়েছিল তিউনিসিয়া। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে স্তব্ধ করে দিয়ে ১-০ ব্যবধানে জয়টি ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় চমক।
তবে পরিসংখ্যান বলছে, আগের ছয়টি আসরে একবারও নক-আউট পর্বে যেতে পারেনি তিউনিসিয়া। তাদের খেলা ১৮ ম্যাচের মধ্যে জয় মাত্র তিনটি। এই বৃত্ত ভাঙতে হলে লামুশিকে কেবল রক্ষণে মনোযোগ দিলে চলবে না, বরং প্রতি আক্রমণে গোল বের করে আনার দক্ষতায় শান দিতে হবে।
জুনে মেক্সিকোর এস্তাদিও মন্তেরে স্টেডিয়ামে সুইডেন ও জাপানের বিপক্ষে এবং কানসাসে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মাঠে নামবে তিউনিসিয়া। গ্রুপটি মৃত্যুকূপ না হলেও তিউনিসিয়ার জন্য মোটেও সহজ নয়। বিশেষ করে জাপানের গতি এবং নেদারল্যান্ডসের ট্যাকটিক্যাল ফুটবলের সামনে তিউনিসিয়ার জমাট রক্ষণই হবে শেষ অস্ত্র। হাতেম ট্রাবেলসি বা ওয়াহবি খাজরিদের মতো বড় তারকার অভাব থাকলেও, বর্তমান স্কোয়াডটি অভিজ্ঞতায় টইটম্বুর।
একদিকে বাছাইপর্বের সেই অপরাজেয় তকমা, অন্যদিকে বড় টুর্নামেন্টে নক-আউট পর্বে না পৌঁছানোর আক্ষেপ। কাসাব্লাঙ্কার সেই বিপর্যয় ভুলে কার্থেজের ইগলরা সপ্তমবারে বিশ্বকাপে এসে সপ্তম স্বর্গে ভাসতে পারবে তো।
কোচ
সাবরি লামুশি
বিশ্বকাপকে সামনে রেখে তিউনিসিয়ার পুনর্গঠনেই এখন মনোনিবেশ সাবরি লামুশির। দলের ভেতর লড়াকু মানসিকতা গড়ে তোলাই তাঁর মূল চ্যালেঞ্জ। ফ্রান্স ও ইতালির ফুটবলে সমৃদ্ধ ক্যারিয়ার শেষ করে লামুশি এখন কোচিংয়ে নিজের ছাপ রাখছেন। সাবেক এই ফরাসি মিডফিল্ডার এর আগে আইভরি কোস্ট ও নটিংহাম ফরেস্টের মতো দলে কোচিং করিয়েছেন। তাঁর ক্যারিয়ারের সঙ্গে মরক্কোর কোচ ওয়ালিদ রেগরাগির অনেক মিল পাওয়া যায়। হানিবাল মেজব্রি ও এলিয়েস সখিরির মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নিয়ে তিউনিসিয়াকে বিশ্বমঞ্চে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়াই এখন লামুশির প্রধান লক্ষ্য।
তারকা
হানিবাল মেজব্রি
চাপে থেকেও বল নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের নিখুঁত পাস দেওয়ার ক্ষমতার জন্য হানিবাল মেজব্রি বিশেষভাবে পরিচিত। ২৩ বছর বয়সী এই ফুটবলার মূলত ‘প্লে-মেকার’ হিসেবে খেললেও মাঝমাঠের বিভিন্ন ভূমিকায় মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তাঁর আছে, যা রক্ষণভাগ থেকে আক্রমণ তৈরির সময় তিউনিসিয়াকে বাড়তি সুবিধা দেয়। ২০২১ সালে তিউনিসিয়ার হয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু করার আগে মেজব্রি বয়সভিত্তিক পর্যায়ে ফ্রান্সেরও প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে বেড়ে উঠলে বর্তমানে ইংলিশ ক্লাব বার্নলিতে খেলছেন তিনি।
বিশ্বকাপে তিউনিসিয়ার ইতিহাস
র্যাঙ্কিং: ৪৪
অঞ্চল: আফ্রিকা
অংশগ্রহণ: ৭
সর্বোচ্চ সাফল্য: গ্রুপপর্ব