আগামীকালই মেক্সিকোতে পর্দা উঠছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। আর এই বিশ্বমঞ্চের চারটি ম্যাচের আয়োজক হিসেবে এখন দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে আসা ফুটবলভক্ত ও পর্যটকদের উন্মাদনায় মুখর শিল্পনগরী মন্তেরে। তবে মেক্সিকোর জন্য এই বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া আসর নয়, বরং এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা ‘কার্টেল সহিংসতা’র অন্ধকার ও রক্তাক্ত অতীতকে পেছনে ফেলে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের নিরাপদ ভাবমূর্তি তুলে ধরার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।
আন্তর্জাতিক অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায়, ‘কার্টেল’ হলো বিলিয়ন ডলারের অবৈধ মাদক কারবার ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণকারী অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুসংগঠিত অপরাধী সিন্ডিকেট। আর মাদক পাচারের লাভজনক রুট বা এলাকা নিজেদের দখলে রাখতে এই অপরাধী গোষ্ঠীগুলো যখন একে অপরের ওপর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে সামরিক কায়দায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তখন সেটাকে ‘কার্টেল সহিংসতা’ বলা হয়। সমাজে একচ্ছত্র আধিপত্য ও ভয়ের রাজত্ব কায়েম করতে এই চক্রগুলো প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাং, পুলিশ বা সাধারণ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা এবং রাজপথে গাড়ি পুড়িয়ে প্রায়ই ব্যাপক বিশৃঙ্খলা তৈরি করে থাকে। একসময় এই সহিংসতা মন্তেরেই শহরের নিত্যদিনের চিত্র ছিল।
শহরটির এই আমূল পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে নবনির্মিত ‘লিবার্টি পার্ক’। বিশ্বকাপের ঠিক প্রাক্কালে নতুন খেলার মাঠ দিয়ে সাজানো এই পার্কটি মূলত গড়ে উঠেছে মেক্সিকোর ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত ‘টোপো চিকো’ কারাগারের ধ্বংসাবশেষের ওপর। ২০১৬ সালে এই কারাগারের ভেতরেই মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী কার্টেলের নৃশংস রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ৪৯ জন বন্দী নিহত হন। ২০১৯ সালে সেই অভিশপ্ত কারাগার ভেঙে ফেলার পর আজ সেখানে বিশ্বকাপের আমেজে স্থানীয় শিশুরা মেতে উঠেছে ফুটবল খেলায়।
বিশ্বকাপের নিরাপত্তা নিয়ে মেক্সিকোর আরেক আয়োজক শহর গুয়াদালাহারায় যখন সাম্প্রতিক কার্টেল সহিংসতার কারণে কড়া নজরদারি ও উদ্বেগ চলছে, তখন মন্তেরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত ১৫ বছরে পুলিশিং ব্যবস্থায় ব্যাপক বিনিয়োগ এবং ধারাবাহিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ফলে মন্তেরে আজ মেক্সিকোর অন্যতম নিরাপদ প্রধান শহরে পরিণত হয়েছে। এখানে আসা আন্তর্জাতিক ফুটবলভক্ত এবং পর্যটকদের প্রধান দুশ্চিন্তা এখন কোনো অপরাধ বা বন্দুকযুদ্ধ নয়, বরং শহরের তীব্র যানজট আর ধোঁয়াশা।
এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পেছনে বড় অবদান রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘ আইনি লড়াই ও সামাজিক আন্দোলনের। ২০২৩ সালে পার্কের জমিতে হাসপাতাল নির্মাণের সরকারি পরিকল্পনাকে স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষোভ ও আইনি চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে রুখে দেন এবং জায়গাটিকে ‘প্রাকৃতিক সংরক্ষিত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানান, যা বর্তমানে চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বুলেটের ইতিহাস পেছনে ফেলে ফুটবলের হাত ধরে মন্তেরে এখন বিশ্বজয়ের আনন্দে মেতে উঠতে পুরোপুরি প্রস্তুত।