১১ জুন শুরু ফুটবল বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে খেলছে ৪৮ দল। ‘বিশ্বকাপের দল' শীর্ষক এই ধারাবাহিকে কোন দল কেমন, সেটি তুলে ধরার প্রয়াস। আজকের পর্বে কলম্বিয়া
১২ বছর আগের ব্রাজিলের সেই সোনালি গ্রীষ্মের কথা ফুটবলপ্রেমীদের মনে থাকার কথা। হামেস রদ্রিগেস নামের এক চটপটে তরুণ বল পায়ে জাদুকরি সব মুহূর্তে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিল বিশ্বকে, কলম্বিয়া পেয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার স্বাদ। তবে ফুটবলের রোলারকোস্টারে চড়ে সেই সোনালি সময় দ্রুতই ফিকে হয়ে এসেছিল।
২০১৮ সালে রাশিয়ায় মলিন পারফরম্যান্সের পর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের টিকিট কাটতেই ব্যর্থ হয় তারা। একপ্রকার উপেক্ষিত এবং প্রায় বিস্মৃত হয়ে যাওয়া সেই কলম্বিয়াই এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে ফিরছে এক বুক স্বপ্ন আর রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প নিয়ে।
কাতার বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে জায়গা না পাওয়ার চরম হতাশা থেকে কলম্বিয়াকে টেনে তুলেছেন আর্জেন্টাইন কোচ নেস্তর লরেন্সো। ২০২২ সালের জুনে যখন তিনি দায়িত্ব নেন, তখন দলটির অবস্থা ছিল নড়বড়ে। হোসে পেকারম্যানের সহকারী হিসেবে কাজ করা লরেন্সো দলটির ভেতরের নাড়িনক্ষত্র জানতেন। এসেই দলে ফিরিয়ে আনেন অভিজ্ঞতার চাদর এবং তারুণ্যের গতি।
লরেন্সোর অধীনেই দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বে নিজেদের জাত চিনিয়েছে কলম্বিয়া। নিজেদের মাঠে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মতো পরাশক্তিকে হারিয়ে এবং চিলিকে ৪-০ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে তিনে থেকে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে তারা।
এই দলের অধিনায়ক সেই চিরসবুজ হামেস রদ্রিগেস। বাছাইপর্বে ৭ অ্যাসিস্ট এবং ঘরের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স বাড়লেও তাঁর বাঁ পায়ের ধার কমেনি। ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে দেশকে বড় কিছু এনে দিতে মরিয়া এই তারকা। তবে মাঠের খেলায় কলম্বিয়ার আসল চালিকাশক্তি এখন বায়ার্ন মিউনিখ তারকা লুইস দিয়াস। বাছাইপর্বে ৭ গোল করা ২৮ বছর বয়সী দিয়াস এখন ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে আছেন। তাঁর গতি, নিখুঁত ড্রিবলিং এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণকে চূর্ণ করার ক্ষমতা কলম্বিয়াকে যেকোনো পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়ার সাহস জোগায়। সঙ্গে রিচার্দ রিওস, জন আরিয়াস এবং তরুণ তুর্কি ইয়াসের আসপ্রিয়ার মতো প্রতিভাধর খেলোয়াড়েরা যোগ হওয়ায় কলম্বিয়ার আক্রমণভাগ যেকোনো কোচের জন্য ঈর্ষণীয়।
কলম্বিয়া মূলত ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে নান্দনিক ফুটবল খেলতে পছন্দ করে। তবে এই শৈল্পিক ফুটবলের পাশাপাশি শারীরিকভাবে শক্তিশালী রক্ষণভাগ তৈরি করাকেও অগ্রাধিকার দিয়েছেন কোচ। সেট পিস ও পাল্টা আক্রমণে দলটির কার্যকারিতা প্রতিপক্ষের জন্য বেশ ভীতি জাগানিয়া। তবে সব ইতিবাচক দিকের মধ্যেও কিছু দুশ্চিন্তা থেকে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রীতি ম্যাচগুলোতে ক্রোয়েশিয়া এবং ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় শক্তির কাছে হার তাদের ডিফেন্সের দুর্বলতা এবং ফিনিশিংয়ের অভাবকে ফুটিয়ে তুলেছে।
‘কে’ গ্রুপে পর্তুগালের মতো কঠিন প্রতিপক্ষ থাকলেও উজবেকিস্তান ও ডিআর কঙ্গোকে টপকে নকআউট পর্বে যাওয়া কলম্বিয়ার জন্য খুব একটা কঠিন হওয়ার কথা নয়। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের ট্র্যাজিক স্মৃতি ভুলে, ২০২৪ কোপা আমেরিকার রানার্সআপরা এবার উত্তর আমেরিকার মাটিতে নতুন কোনো রূপকথা লিখতে প্রস্তুত।
প্রধান কোচ হিসেবে নেস্তর লরেন্সোর ট্র্যাক রেকর্ড দীর্ঘ না হলেও খেলোয়াড় ও ব্যাকরুম স্টাফ হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা বিশাল। ২০১৪ ও ২০১৮ বিশ্বকাপে হোসে পেকারম্যানের সহকারী থাকায় আর্জেন্টাইন এই কোচ কলম্বিয়া দলটিকে খুব ভালো করেই চেনেন। ২০২২ সালের জুনে দায়িত্ব নিয়ে তিনি পেকারম্যানের আমলের ঘরানার কৌশল তৈরি করেন। দলে হামেস রদ্রিগেসকে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি তিনি রিওস, আরিয়াস, কাস্তানিও ও ডুরানের মতো তরুণদের ওপর আস্থা রাখেন; যা দলটিকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছে।
ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে থাকা লুইস দিয়াস এবার বিশ্বমঞ্চে কলম্বিয়ার আক্রমণভাগের মূল চালিকাশক্তি। বায়ার্ন মিউনিখের এই তারকা উইঙ্গার তাঁর অফুরন্ত শক্তি, গতি আর চতুর ড্রিবলিং দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ চূর্ণ করতে সিদ্ধহস্ত। বায়ার্ন বস ভিনসেন্ট কোম্পানির ভাষায়, দিয়াসের খেলায় রয়েছে এক বৈচিত্র্যময় ‘কেয়াটিক ক্রিয়েটিভিটি’ (সহজে অনুমেয় নয় এমন সৃজনশীলতা)। মাঠের লড়াকু ফুটবল আর জাদুকরি ড্রিবলিংয়ে হলুদ জার্সির চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে জ্বলবেন এই ফরোয়ার্ড, এমনটাই প্রত্যাশা ফুটবলপ্রেমীদের।
র্যাঙ্কিং: ১৩
অঞ্চল: লাতিন আমেরিকা
অংশগ্রহণ: ৭
ডাকনাম: লস কাফেতেরোস
সর্বোচ্চ সাফল্য: শেষ আট (২০১৪)
বিশ্বকাপে
ম্যাচ ২২, জয় ৯, ড্র ৩, হার ১০
১৮ জুন উজবেকিস্তান মেক্সিকো সিটি সকাল ৮টা
২৪ জুন ডিআর কঙ্গো গুয়াদালাহারা সকাল ৮টা
২৮ জুন পর্তুগাল মায়ামি ভোর সাড়ে ৫টা