যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ মিশন শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে স্নায়ুচাপে ভুগছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। কাল ভোর ৪টায় মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে সেলেসাওদের এবারের বিশ্বকাপ অভিযান। তবে ম্যাচের আগের দিনও শুরুর একাদশের চূড়ান্ত রূপরেখা নিশ্চিত করতে পারেননি ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তি। অথচ মিসরের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের পর আত্মবিশ্বাসী আনচেলত্তি নিজেই জানিয়েছিলেন, বিশ্বকাপের জন্য তাঁর প্রথম একাদশ চূড়ান্ত করা আছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় অনুশীলনের পর এবং মরক্কোর গতিময় ফুটবলের কথা মাথায় রেখে সেই নিশ্চিত পরিকল্পনা এখন অনেকটাই এলোমেলো; বিশেষ করে ফুলব্যাক পজিশন এবং আক্রমণভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিয়ে এখনো দলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। মরক্কোর গতি রুখতে এবং নিজেদের হাই-প্রেসিং কৌশল মাঠে নিখুঁতভাবে বাস্তবায়নে একাদশে কিছু কৌশলগত পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
গোলপোস্টের নিচে অবশ্য কোনো সংশয় নেই। চোট কাটিয়ে সদ্য দলে ফেরা লিভারপুল তারকা আলিসন বেকারের ওপরই শতভাগ ভরসা রাখছেন কোচ। তবে সেন্টারব্যাকে অধিনায়ক মার্কিনিওসের সঙ্গী কে হবেন—লিও পেরেইরা নাকি গাব্রিয়েল মাগালাইস; তা নিয়ে এখনো দোলাচলে আছেন কোচ। দলের এমন কঠিন ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে অবশ্য দারুণ ইতিবাচক অধিনায়ক মার্কিনিওস। ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের আত্মবিশ্বাসের কথা জানিয়ে এই ডিফেন্ডার বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের দলে অনেক দুর্দান্ত খেলোয়াড় আছেন। রক্ষণ, আক্রমণ কিংবা মাঝমাঠ—সব বিভাগেই ব্রাজিল দল বেশ সমৃদ্ধ। তবে আমাদের এখন নিজেদের খেলার মূল শক্তি ও ধরনটা আরও বেশি খুঁজে বের করতে হবে, প্রতিপক্ষকে কীভাবে আটকানো যায়, সেটা বুঝতে হবে এবং মাঠের কঠিন মুহূর্তগুলোর সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে জানতে হবে।’
অধিনায়কের এই বিশ্বাসের বড় পরীক্ষা দিতে হবে দুই ফুলব্যাক পজিশনে। রোমা তারকা ওয়েসলির চোটের কারণে রাইটব্যাকে বড় ধাক্কা খেয়েছে দল, যা আনচেলত্তির মিসরের ম্যাচের পরের চেনা ছক বদলে দিয়েছে। এই পজিশনে ফ্লামেঙ্গোর অভিজ্ঞ দানিলোর সঙ্গে লড়াই চলছে আল-আহলির ইবানেসের। অনুশীলনে ইবানেস চমৎকার শারীরিক সক্ষমতা ও স্ট্যামিনা মরক্কোর গতিশীল উইঙ্গারদের রুখতে আনচেলত্তিকে আকৃষ্ট করেছে, তবে দানিলোর দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও ফেলে দেওয়ার মতো নয়।
লেফটব্যাক পজিশনেও ফ্লামেঙ্গোর আলেক্স সান্দ্রো ও জেনিতের দগলাস সান্তোসের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হবে কোচকে।
রক্ষণ ও আক্রমণে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও মাঝমাঠ নিয়ে বেশ নিশ্চিন্ত আনচেলত্তি। সেখানে কাসেমিরো এবং ব্রুনো গিমারায়েসের চেনা জুটির ওপরই দাঁড়াচ্ছে ব্রাজিলের মেরুদণ্ড। মাঝমাঠে তাঁদের সঙ্গে তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে কার্লো আনচেলত্তির শতভাগ আস্থা অর্জন করে নিয়েছেন লুকাস পাকেতা। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে এই ত্রয়ীই হতে যাচ্ছেন ব্রাজিলের মূল চালিকা শক্তি।
সবচেয়ে বড় কৌশলগত লড়াই চলছে আক্রমণভাগে। মরক্কোর রক্ষণভাগকে বিল্ড-আপের শুরুতে চেপে ধরার (হাই-প্রেস) জন্য তরুণ ইগর থিয়াগো অনুশীলনে দারুণ কার্যকারিতা দেখিয়েছেন। তবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের স্ট্রাইকার মাথিয়াস কুনিয়ার টেকনিক্যাল দক্ষতা, খেলার বৈচিত্র্য ও অভিজ্ঞতা তাঁকে কিছুটা এগিয়ে রাখছে। মূলত আনচেলত্তির ‘অফ দ্য বল’ (বল ছাড়া দলের পজিশন) কৌশলের কারণে কুনিয়ার গুরুত্ব অনেক বেশি। এই কৌশলে বল যখন প্রতিপক্ষের পায়ে থাকবে, তখন ব্রাজিল মূলত ৪-৪-২ ফরমেশনে চলে যাবে। যেখানে কুনিয়া বাঁ দিকে এবং পাকেতা ডান দিকে নিচে নেমে রক্ষণকে সাহায্য করবেন। এর ফলে দলের দুই মূল তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রাফিনিয়া আক্রমণভাগে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে খেলার সুযোগ পাবেন। এখন দেখার বিষয়, আনচেলত্তি প্রথম ম্যাচের তীব্রতার কথা চিন্তা করে ইগর থিয়াগোকে নামান, নাকি কুনিয়ার ট্যাকটিক্যাল দক্ষতায় ভরসা রাখেন।