ফুটবল দিনশেষে নিখাদ এক দলগত খেলা। নিঃস্বার্থভাবে পারস্পরিক সহযোগিতা আর দলীয় বোঝাপড়া ছাড়া সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো অসম্ভব। যেকোনো কোচ তাঁর শিষ্যদের বলে থাকেন, ‘দলের চেয়ে বড় কোনো খেলোয়াড় হতে পারে না।’
কথাটি নিয়ে দ্বিমত করার সুযোগ পাবেন না কেউই। তবে ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু দিন আসে, যা কোনো তত্ত্ব বা দর্শনের ফ্রেমে বাঁধা যায় না। তখন সব কৌশল এক পাশে পড়ে থাকে, আর মাঠের সবুজ গালিচায় লেখা হয় একেক তারকার নাম।
১৬ জুন; তারিখটা মনে গেঁথে রাখার মতো। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পরপর তিনটি ম্যাচে তিন তারকার অসাধারণ পারফরম্যান্সে বুঁদ হয়ে রইল পুরো ফুটবল বিশ্ব।
মহাজাগতিক উৎসবের শুরুটা হয়েছিল নিউইয়র্কের নিউজার্সি স্টেডিয়ামে। প্রায় ৮০ হাজার দর্শকের সামনে ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে জোড়া গোল করে সমালোচকদের মুখে জোরে একটা চপেটাঘাতই করলেন। সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচটি তাঁর জন্য ছিল একপ্রকার অ্যাসিড টেস্ট। প্রথমার্ধ কিছুটা ম্যাড়মেড়ে কাটলেও দ্বিতীয়ার্ধে খোলস ছেড়ে বের হন এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকা। ৬৬ মিনিটে মাইকেল ওলিসের চমৎকার পাস থেকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে এগিয়ে নেন ফ্রান্সকে। তবে আসল নাটকের তখনো বাকি ছিল। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে সেনেগালের সমতায় ফেরার স্বপ্ন চুরমার করে দিয়ে বক্সের বাইরে ৩০ গজ দূর থেকে এক চোখধাঁধানো রকেট শটে জাল কাঁপান এমবাপ্পে। ফ্রান্স জয় পায় ৩-১ ব্যবধানে। এই জোড়া গোলের মাধ্যমে মাত্র ২৭ বছর বয়সে জিরুকে টপকে ফ্রান্সের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা (৫৮ গোল) বনে যান এমবাপ্পে। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৪-তে, যা তাঁকে কিংবদন্তি জার্ড মুলারের সমকক্ষে নিয়ে গেছে।
নিউইয়র্কের রেশ কাটতে না কাটতেই বোস্টনে শুরু হয় আরলিং হালান্ডের গর্জন। ইরাকের বিপক্ষে ৪-১ ব্যবধানের বড় জয় দিয়ে দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বমঞ্চে রাজকীয় প্রত্যাবর্তন করল নরওয়ে। আর এই ঐতিহাসিক দিনটিকে জোড়া গোল করে স্মরণীয় করে রাখলেন ২৫ বছর বয়সী হালান্ড।
ম্যাচের আগে নরওয়ে কোচ স্টেল সোলবাকেন হালান্ডকে ‘বিশ্বের সেরা গোল স্কোরার’ বলে যে বাজি ধরেছিলেন, তার শতভাগ প্রতিদান দিলেন তিনি। পনি টেইলের এই ৬ ফুট ৫ ইঞ্চির ‘ভাইকিং দানব’ প্রথমার্ধেই ইরাকের রক্ষণভাগকে ধ্বংস করে দেন। তাঁর প্রথম গোলটি ছিল শারীরিক শক্তি ও নিখুঁত টাইমিংয়ের মেলবন্ধন। এর কিছুক্ষণ পরেই ইরাকি ডিফেন্ডারের এক মারাত্মক ব্যাকপাসের ভুলকে কাজে লাগিয়ে গন্ডারের মতো তেড়ে গিয়ে গোলরক্ষককে পরাস্ত করে দ্বিতীয় গোলটি আদায় করে নেন তিনি। সতীর্থদের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ‘নৌকা চালানো’ উদ্যাপনে মেতে ওঠা হালান্ডের গোলসংখ্যা দেশের হয়ে এখন ৫১ ম্যাচে অবিশ্বাস্য ৫৭! বিশ্বকাপ কি সুন্দরভাবেই না আলিঙ্গন করে নিল এই তারকা।
তিন পার্টের সিনেমার শেষ অংশটুকু জমা ছিল লিওনেল মেসির জন্য। যাঁর কাছে অপূর্ণতা বলে কিছুই নেই এখন। তবু জাদু দেখাচ্ছেন, আনন্দ দিচ্ছেন; সমর্থকদের তা লুফে না নিয়ে উপায় আছে? ৩৯ ছুঁইছুঁই মেসি নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেই ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা এক রাত উপহার দিলেন।
অফসাইডের কারণে একটি গোল বাতিল হলেও মেসিকে দমানো যায়নি। ১৭ মিনিটে রদ্রিগো দি পলের পাস থেকে তাঁর সেই চিরচেনা জাদুকরি বাঁ পায়ের বাঁকানো শটে আলজেরিয়ার জাল কাঁপান। দ্বিতীয় গোলটি ছিল আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদানের হাত থেকে ফসকে যাওয়া বলের এক চতুর রিবাউন্ড শট।
মেসি কি তৃতীয় গোলটি পাবেন? এই পর্যায়ে এসে এমন কিছু খুঁজে পাওয়া কঠিন, যা তিনি ক্যারিয়ারে করেননি; তবে বিশ্বকাপে একটি হ্যাটট্রিক করা তখনো বাকি ছিল। দ্বিতীয়ার্ধে সেটিও চলে এল; প্রতিপক্ষের জটলার মধ্য দিয়ে বল নিয়ে গিয়ে অসহায় জিদানের বুকে শেল বিঁধিয়ে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন তিনি।
এই তিন গোলের সুবাদে বিশ্বকাপে মেসির মোট গোলসংখ্যা দাঁড়াল ১৬-তে, যা জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডের সমান।
অনেকে বলতে পারেন, ৪৮ দলের এই বর্ধিত বিশ্বকাপে তারকারা দুর্বল প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের জন্য মঙ্গলবারের দিনটি ছিল পয়সা উসুল। সে জন্য ভাগ্যকে একটা ধন্যবাদ দেওয়াই যায়।
তারকাদের গুরুত্ব আছে, সমর্থকেরা তাঁদের ভালোবাসে। ফিফা বাণিজ্য বাড়াতে টুর্নামেন্ট যতই বড় করুক, টিকিটের দাম যতই বাড়াক; দিনশেষে মাঠের খেলাটা যখন তারকারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন, তখন জিতে যায় ফুটবলই।