আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে গত পরশু মধ্যরাতে লাহোরের বিমানবন্দরে বিদায় দিতে এসেছেন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) প্রধান মহসিন নাকভি। লাহোরের বিমানবন্দরে উপমহাদেশের দুই ক্রিকেট প্রশাসকের হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবি বলে দিচ্ছিল, লাহোরে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকটা বৃথা যায়নি!
গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে কাল সন্ধ্যায় ঢাকায় ফিরেছেন বিসিবির প্রধান বুলবুল। রাতে এক বিবৃতিতে তিনি পিসিবি এবং আইসিসিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। বিবৃতিতে বিসিবি সভাপতি বলেছেন, ‘এই সময়ে বাংলাদেশকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রচেষ্টা আমাদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। আমাদের ভ্রাতৃত্ব দীর্ঘজীবী হোক। গতকাল (পরশু) পাকিস্তানে আমার সংক্ষিপ্ত সফর এবং আমাদের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সমগ্র ক্রিকেট ইকোসিস্টেমের কল্যাণে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিপক্ষে আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচটি খেলতে পাকিস্তানকে অনুরোধ করছি।’
বিসিবির এই ‘অনুরোধে’ই বোঝা যাচ্ছিল সব সংকটের সমাধান হতে চলেছে দ্রুতই। এক অর্থে সবার চাওয়াই পূরণ হয়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেয়। সেটির পাল্টা হিসেবে বাংলাদেশ গেল না ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে। ভারত বাংলাদেশের চাওয়া অনুযায়ী শ্রীলঙ্কায় ভেন্যু পরিবর্তন করল না। বাংলাদেশ সরকার অটল রইল নিজেদের অবস্থানে। ভারতকে পাল্টা জবাব দিতে পাকিস্তান ম্যাচ বর্জনের সিদ্ধান্ত নিল। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ না হওয়া মানে আইসিসির বিপুল আর্থিক ক্ষতি।
শেষ পর্যন্ত সৃষ্ট জট ছুটল গত পরশু লাহোরের বৈঠকে। পাকিস্তান খেলবে ভারতের বিপক্ষে। অনেক দিন পর ক্রিকেটে ভারতকে চাপে ফেলতে পেরে খুশি পাকিস্তান। জয় হলো ভারতের ইগোরও, তারা বাংলাদেশের দাবি অনুযায়ী ভেন্যু পরিবর্তন করেনি। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) একেবারে শূন্য হাতে নেই। তারা আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে, ২০২৮ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে একটি আইসিসির ইভেন্ট আয়োজনের সুযোগ পাচ্ছে। আসলে ক্রিকেটে ভারতের মতো মোড়লকে অস্বস্তিদায়ক পরিস্থিতিতে ফেলতে বাংলাদেশ-পাকিস্তান উভয়ই নিজেদের নৈতিক জয় খুঁজে নিচ্ছে। শুধু আফসোসটা রয়ে গেল বর্তমান জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের—রাজনীতির বলি হয়ে তাঁদের জীবন থেকে হারিয়ে গেল একটা আইসিসির ইভেন্ট।
অথচ ভারতের মতো চেনা কন্ডিশনে ভালো কিছু করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের এই দল তৈরি হচ্ছিল দুই বছর ধরে। সাকিব-মাহমুদউল্লাহদের মতো সিনিয়র ক্রিকেটারদের যুগ পেছনে ফেলে লিটন দাসের নেতৃত্বে দলটা বেশ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। গত বছর টানা চারটি টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতেছিল তারা। ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কলকাতায় তিনটি ম্যাচ থাকায় ভালো করতে আরও আত্মবিশ্বাসী ছিল। বিসিবি বিশ্বকাপের দলও ঘোষণা করে দিয়েছিল গত ৪ জানুয়ারি। কিন্তু ৩ জানুয়ারি মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার পর পুরো প্রেক্ষাপটই বদলে গেল।
ক্রিকেটের মধ্যে ঢুকে গেল রাজনীতি। সেই রাজনৈতিক খেলার অনেক মারপ্যাঁচে বাংলাদেশ হয়ে থাকল এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দর্শক! বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বিনিদ্র সময় গেল। দীর্ঘদিন আইসিসিতে চাকরি করেও ক্রিকেট দূতিয়ালিতে তিনি কতটা সফল নাকি ব্যর্থ—দুই রকম আলোচনাই আছে। সাম্প্রতিক সময়ে পুরো দেশে ভারতবিরোধী মনোভাব যেভাবে ছড়িয়েছে, তাতে বুলবুলকে যেমন দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের ‘সাহসী বিসিবি সভাপতি’ চিত্রিত করা হচ্ছে, একই সঙ্গে বিশ্বকাপ খেলতে না পারার দায়ে কাঠগড়ায় তুলছেন তাঁর বিরোধীরা। তবে বিশ্বকাপ খেলতে বুলবুলের চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না। যেহেতু সরকারের সিদ্ধান্তে এগোতে হয়েছে, তাঁর একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও ছিল না।
বুলবুল সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ করার। দেশে বসে থাকা ক্রিকেটারদের জন্য একটি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছেন। আইসিসির কাছে ‘ক্ষতিপূরণ’ আদায় করেছেন। একটি আইসিসির ইভেন্ট আয়োজনের স্বত্ব পেয়েছেন। এত কিছুর পরও লিটনদের মতো বুলবুলেরও নিশ্চয়ই মাঝে মাঝে বুকটা হু হু করে উঠছে, আহ, শুধু বিশ্বকাপটাই খেলা হলো না...।