মাঠে তাঁর বলের গতি লাভার মতো উত্তাপ ছড়ায়, অথচ মাঠের বাইরে তিনি শান্ত জলের মতো শীতল। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৫ উইকেট নেওয়ার পর ড্রেসিংরুমে ফেরার পথে সতীর্থরা সামনে ঠেলে দিলে নাহিদ রানার মুখে খেলে যায় লাজুক হাসি। সে হাসি দেখে বোঝার উপায় ছিল না এই হাত দিয়ে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছেন তিনি। পেয়েছেন ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ‘ফাইফার’।
প্রথম ওয়ানডেতে ১০ ওভারে ৬৫ রান দিয়ে কিছুটা সমালোচনার মুখে পড়া সেই নাহিদ রানাই মাত্র দুই দিনের মধ্যে ফিরে এলেন ‘ভয়ংকর’ রূপে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে তাঁর ১০ ওভারে ১ মেইডেনসহ ৩২ রানে ৫ উইকেটের বোলিং বিশ্লেষণী সংখ্যায় নয় বরং গতি দিয়েও ব্যাখ্যা করতে হয়।
৫ উইকেট নেওয়া সবকটি ডেলিভারিই ছিল ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ম্যাচে ৫ উইকেটের প্রতিটিই এমন ঝোড়ো গতিতে নেওয়ার নজির নেই বললেই চলে। বৈশাখী খরতাপে ৫০ ওভারের ম্যাচে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এভাবে গতি ধরে রাখার রহস্য নিয়ে নাহিদ বলেন, ‘অনুশীলনের বাইরে ফিটনেস নিয়ে কাজ করি। যখন অনুশীলন চলে তখনো ফিটনেস ট্রেনারের সঙ্গে কাজ করি। ম্যাচের সময় আমি মাঠের মধ্যে এমন অনুভূতি পাই যে আমি বোলিং করছি, কিন্তু কখনো ক্লান্ত হচ্ছি না।’
পরিশ্রমের ফল মিলেছে হাতেনাতে। মাঠে শরীফুল ও তাসকিন শুরুতে চাপ তৈরি করলেও উইকেট পাচ্ছিল না বাংলাদেশ। অষ্টম ওভারে আক্রমণে এসেই প্রথম বলে হেনরি নিকোলসকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন নাহিদ। এরপর একে একে উইল ইয়ং, মোহাম্মদ আব্বাস এবং ডিন ফক্সক্রফটকে শিকার করেন শর্ট লেংথের বলে। তিনটি উইকেট তিনি পেয়েছেন ওভারের প্রথম বলে। তাতেই নিউজিল্যান্ড দাঁড় করাতে পারেনি বড় কোনো জুটি।
উইকেট পাওয়া না-পাওয়া নিয়ে অবশ্য সেভাবে ভাবেন না নাহিদ, ‘সব সময় চেষ্টা করি যে দলে প্রভাব ফেলে এমন পারফর্ম করতে। আমার কাছে উইকেটের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে যে দলকে জেতাতে পারছি কি না।’
গতির পাশাপাশি এখন ইয়র্কার এবং বৈচিত্র্য নিয়েও কাজ করছেন রানা। বোলিং কোচ শন টেইটের কাছে দীক্ষা নিয়ে মানসিকভাবে তৈরি করেন নিজেকে। অনুশীলনে নতুন কিছু চেষ্টা করার পর তৃপ্তি না পেলে সেটা ম্যাচে প্রয়োগ করেন না তিনি, ‘চেষ্টা করছি নতুন কিছু শেখার এবং বিষয়গুলো অনুশীলনে প্রয়োগ করার...যদি কাছে মনে হয় যে, শতভাগ কাজে লাগাতে পারছি। তখন মাঠে এসে ম্যাচে ডেলিভার করি।’
রান আটকানো নাকি উইকেট নেওয়া—এমন প্রশ্নে রানার উত্তর, ‘পরিস্থিতি যা দাবি করে। রান আটকালে যদি দলের জন্য ইমপ্যাক্টফুল হয় তাহলে সেটাই করব। আর উইকেট নিলে উইকেট। পরিস্থিতি অনুযায়ী বোলিং করা উচিত।’
গত মাসে মিরপুরে পাকিস্তান সিরিজের প্রথম ম্যাচে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন রানা। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে ছন্দে না থাকা নিয়ে তিনি, ‘পরিস্থিতি বুঝে যে বোলিং করবে সেই সফল। হয়তো অনেক সময় বাস্তবায়ন হবে, অনেক সময় হবে না। সব সময় একটা চেষ্টা করি যে আগের ম্যাচে যে ভুলটা করেছি, সামনের ম্যাচে সেই একই ভুলগুলো করব না।’
উদ্যাপনে তিনি কখনো স্মিত আবার কখনো খ্যাপাটে। রানার জবাব, ‘আক্রমণাত্মক মানসিকতা ভেতর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে। কখনো আসে, আবার কখনো আসে না, এটাই স্বাভাবিক...এটা বলে-কয়ে আসে না।’
সিরিজের শেষ ম্যাচ বৃহস্পতিবার। কিউইরা হুংকার দিয়েছে সিরিজ জয়ের। রানা তাই নির্লিপ্ত হাসিতে বললেন, ‘মুখে ক্রিকেট খেলা হয় না, খেলতে হয় মাঠে।’ মিরপুরের ২২ গজ আজ রানার সেই কথারই সাক্ষ্য দিল।