দীর্ঘ অপেক্ষার পর বড় পরিসরে ক্রিকেট আয়োজনের অপেক্ষায় বরিশাল। ১৫ ডিসেম্বর কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়ামে শুরু হবে ভি-খ্রি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। প্রায় পাঁচ বছর সংস্কারকাজের পর ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক রূপ পাওয়া স্টেডিয়ামটিতে এই আসর দিয়ে ফিরছে বড় আয়োজন। তবে মাঠ-গ্যালারির উন্নয়ন ঘিরে উচ্ছ্বাস থাকলেও স্থানীয় ক্রিকেটের সংকট নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে খেলোয়াড় ও সংগঠকদের মধ্যে। তাঁদের অভিযোগ, অনুশীলনের মাঠের অভাব, খেলোয়াড় নির্বাচনে পক্ষপাত এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতা না থাকায় বরিশালে নতুন ক্রিকেটার তৈরি হচ্ছে না।
সরেজমিনে স্টেডিয়ামে দেখা গেছে সংস্কারকাজের ছাপ। গ্যালারিতে নতুন চেয়ার, সংস্কার করা প্যাভিলিয়ন ও মিডিয়া ভবন, তিনতলা হোস্টেল এবং সচল ফ্লাডলাইট—সব মিলিয়ে বদলেছে মাঠের চেহারা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এস কোহিনুর এন্টারপ্রাইজের সহকারী প্রকৌশলী মো. রায়হান গাজী জানান, ২০২১ সালে শুরু হওয়া সংস্কারকাজের প্রায় ৯৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা। দুই দফায় বাড়ানো হয়েছে কাজের মেয়াদ। ক্রীড়া সংস্থার একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন চেয়ার বসানোর পর স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা প্রায় ২২ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
তবে সংস্কারে দীর্ঘ পাঁচ বছর লাগায় অসন্তুষ্ট ক্রীড়া সংগঠকেরা। বরিশাল জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান খসরুর অভিযোগ, নিম্নমানের কাজের কারণে কয়েক দফায় সংস্কারকাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে। মাঠের ঘাস, মাটি ও বালুর কাজেও ত্রুটি ছিল। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) গ্রাউন্ডস কমিটির প্রধান শাহনিয়ান তানিমও মনে করেন, সংস্কারে এত সময় লাগার কথা নয়। যোগাযোগ করা হলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) পরিচালক জাহিদ পারভেজ চৌধুরী স্টেডিয়ামটির সংস্কারকাজ নিয়ে কিছু বলতে চাইলেন না।
অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় ক্রিকেটে সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন খেলোয়াড়েরা। বরিশাল জেলা দলের খেলোয়াড় মাইনুল ইসলাম সুজনের অভিযোগ, প্রায় ১০ বছর ধরে এই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য নতুন ক্রিকেটার তৈরি হয়নি। দল নির্বাচনে পক্ষপাতের কারণে যোগ্য খেলোয়াড়েরা সুযোগ হারাচ্ছেন বলেও দাবি তাঁর। স্থানীয় ক্রিকেটারদের বেশি সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি দলের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি তুললেন জেলা দলের আরেক খেলোয়াড় জহিরুল ইসলাম রকি।
বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের খেলোয়াড় সানিম চৌধুরী বলেন, ‘বরিশালে টার্ফ উইকেটে অনুশীলন এবং নিয়মিত চর্চার জন্য আলাদা মাঠ নেই। মূল স্টেডিয়াম ক্রিকেট বোর্ডের অধীনে থাকায় সেখানে ঘরোয়া লিগ আয়োজনের সুযোগও সীমিত।’ নতুন মাঠ তৈরি না হলে শুধু বড় ম্যাচ আয়োজন করে স্থানীয় ক্রিকেটের উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। বরিশাল ফরমার ক্রিকেটার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মীর হাসান মোরশেদ সুমনের অভিযোগ, খেলোয়াড় নির্বাচনের পাশাপাশি কোচ ও ম্যানেজার নিয়োগে বিসিবির গঠনতন্ত্র যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।
বিসিবির বরিশাল জেলা ক্রিকেট কাউন্সিলর মঈনুদ্দীন রুবেল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘খেলোয়াড় বাছাইয়ের প্রক্রিয়া ১০ বছর বন্ধ ছিল। এখানকার মূল সমস্যা হলো মাঠ, প্রশিক্ষণের জায়গা ও সরঞ্জামের অভাব।’ রুবেল অভিযোগের সুরে আরও বলেছেন, ‘ক্রীড়াঙ্গনকে ব্যবসার কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। একটি শ্রেণি রাজধানী থেকে এসে ঝলমলে স্টেডিয়ামে প্রদর্শনী করে চলে যেতে চায়।’ মঈনুদ্দীনের প্রশ্ন, ‘ঢাকার খেলোয়াড় দিয়ে বরিশালের দল পরিচালনা করা হলে স্থানীয় খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ কী হবে?’
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভেন্যু হিসেবে বরিশালকে গড়ে তুলতে অবকাঠামোগত উন্নয়নও দরকার। নিয়মিত বড় টুর্নামেন্টের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের পরিবেশ তৈরিতে উন্নত হোটেল ও নিয়মিত বিমান চলাচল জরুরি।
বরিশাল বিভাগীয় ক্রীড় সংস্থার সদস্যসচিব আনোয়ারুল হক তারিন জানিয়েছেন, ঘরোয়া ক্রিকেট লিগ চালুর চেষ্টা চলছে। মাঠের সংকট কাটাতে পরিত্যক্ত সুইমিংপুল সরিয়ে সেখানে খেলার মাঠ তৈরির বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে। খেলোয়াড় নির্বাচনে পক্ষপাত এড়ানো এবং বিভাগীয় দলের ব্যর্থতার কারণ খতিয়ে দেখারও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
বিসিবির পরিচালক ও বরিশাল বিভাগের খেলোয়াড় নির্বাচনের সমন্বয়কারী মিজানুর রহমান জানান, ১৫ ডিসেম্বর সংস্কারকৃত স্টেডিয়াম চালু করে সেখানে ১৫ দিনের ডি-থ্রি টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। ছয় দলের এই আসরে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন এলাকার ক্রিকেটারদের যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন খেলোয়াড় তৈরি না হওয়া ও মাঠের সংকটের কারণে বিভাগীয় দলের কাছ থেকে ভালো ফল আশা করা কঠিন। অনুশীলনের সুযোগ বাড়াতে বিকেএসপির সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সেখানে খেলার ব্যবস্থা করার চেষ্টাও চলছে বলে জানান মিজানুর।