বয়স ৩৭ বছর। অথচ ব্যাট হাতে ক্ষুধা কমেনি একটুও। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের খেলায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন বিরাট কোহলি। একসময় ইনিংসের ভিত গড়ে তোলা, উইকেটে থিতু হয়ে বড় রান করাই ছিল তাঁর ব্যাটিংয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সেই পরিচয়ের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে নতুন আগ্রাসন। ইনিংসের শুরু থেকেই আক্রমণ, বেশি বাউন্ডারি এবং ঝুঁকি নেওয়ার সাহস সব মিলিয়ে নতুন এক কোহলিকে দেখা যাচ্ছে ২২ গজে। ক্যারিয়ারের এই পর্যায়েও নিজেকে আরও উন্নত করার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেটের এই কিংবদন্তি।
তিরুবনন্তপুরমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে শেষে কোহলি বলেছিলেন, ‘ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে আমার সামনে একটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেটি হলো খেলার গতি বাড়ানো এবং আগের চেয়ে এক-দুই ধাপ উঁচু পর্যায়ে খেলা।’
সেই ম্যাচেই ওয়ানডে ক্রিকেটে ১৫ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করা দ্বিতীয় ব্যাটার হয়েছিলেন তিনি। তবে মাইলফলকের চেয়েও বেশি আলোচনায় আসে তাঁর এই স্বীকারোক্তি। কারণ, এত কিছু অর্জনের পরও নিজের খেলায় নতুন কিছু যোগ করার ক্ষুধা হারাননি কোহলি।
সেই প্রতিফলন দেখা গেল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অকল্যান্ডের ইডেন পার্কেও। পাঁচ ম্যাচের সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে মাত্র ৫১ বলে ৭৪ রানের ঝলমলে ইনিংস খেলেছেন তিনি। ১৩টি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো ইনিংসে তাঁর স্ট্রাইক রেট ছিল ১৪৫.১০। এর মধ্য দিয়ে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৮০তম অর্ধশতক পূর্ণ করেন কোহলি। ৩৮তম জন্মদিনের এক দিন আগেই এমন ইনিংস উপহার দিয়ে ভারতকে জয় পেতেও বড় ভূমিকা রাখেন তিনি।
এই ম্যাচেই আরও একটি অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন কোহলি। ওয়ানডে ক্রিকেটে তিন নম্বরে ব্যাটিং করে ১৩ হাজার রান করা বিশ্বের প্রথম ব্যাটার হয়েছেন তিনি। অকল্যান্ডে নিজের ইনিংসের ১৩তম বলেই এই কীর্তি গড়েন ভারতীয় তারকা।
কোহলির পরিবর্তনটা আসলে তাঁর সামর্থ্যে নয়, বরং সেই সামর্থ্য কত দ্রুত, কতবার এবং কতটা নির্ভীকভাবে কাজে লাগাচ্ছেন, সেটিতেই।
কঠিন সময় পেরিয়ে নতুন অধ্যায়
টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের পর ২০২৫ সালের মে মাসে কোহলি যখন এক ফরম্যাটের ক্রিকেটার হয়ে ওঠেন, তখন তাঁর নতুন রূপটি সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায়নি। ওই বছরের অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়া সফরে পরপর দুই ইনিংসে শূন্য রানে আউট হন তিনি। তাঁর ওয়ানডে ক্যারিয়ারে সেটিই ছিল প্রথম ঘটনা, যখন টানা দুই ইনিংসে কোনো রান না করেই ফিরতে হয়েছিল তাঁকে। তবে সিরিজের শেষ ম্যাচে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ান এই ব্যাটার।
এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ঘরের মাঠের সিরিজ থেকে বদলে যেতে শুরু করে কোহলির ব্যাটিং। ওই সিরিজের শুরু থেকে ১২ ইনিংসে ৮৫৪ রান করেছেন তিনি। গড় ৮৫.৪০, স্ট্রাইক রেট ১১৭.৬৩। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে অপরাজিত ১৩৯ রানের ইনিংসের পর তাঁর সর্বশেষ ১০ ইনিংসে এসেছে ৮২৫ রান। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে ১০ ইনিংসের কোনো ধারাবাহিকতায় এর চেয়ে বেশি রান এসেছে মাত্র ছয়বার। এর মধ্যে দুটি কীর্তিই কোহলির নিজের, ২০১২ ও ২০১৮ সালে।
১০ ইনিংসেই ইতিহাসের পাতায় কোহলি
কোহলির ধারাবাহিকতার প্রমাণ মেলে ওয়ানডে ক্রিকেটে টানা ১০ ইনিংসের রানের পরিসংখ্যানে। এই তালিকায় সর্বোচ্চ ৯৯৫ রান নিয়ে শীর্ষে রয়েছেন তিনি, যা করেছিলেন ২০১৮ সালে। ২০১২ সালেও ১০ ইনিংসে ৮৫০ রান করেছিলেন কোহলি। আর ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০ ইনিংসে তাঁর সংগ্রহ ৮২৫ রান। অর্থাৎ, এই তালিকায় কোহলির তিনটি কীর্তি রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে রান করার পাশাপাশি ব্যাটিংয়ের গতি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।
পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট বদলে যাওয়া
কোহলির ওয়ানডে ব্যাটিংয়ের সাম্প্রতিক পরিবর্তন বুঝতে তিনটি সময়ের পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। ২০২১-২২ সালে ১৪ ইনিংসে ৪৩১ রান করেছিলেন তিনি, গড় ছিল ৩০.৭৯। ২০২৩ বিশ্বকাপ থেকে অস্ট্রেলিয়া সফর পর্যন্ত ২৪ ইনিংসে ১১৭২ রান করেন ৬১.৬৮ গড়ে। কিন্তু ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে মাত্র ১২ ইনিংসে ৮৫৪ রান করেছেন ৮৫.৪০ গড়ে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই সময়ে তাঁর স্ট্রাইক রেট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৭.৬৩-তে। অর্থাৎ, আগের মতোই ধারাবাহিকভাবে রান করছেন কোহলি, তবে এখন অনেক বেশি দ্রুতগতিতে।
বাউন্ডারি-ছক্কায় বেড়েছে আগ্রাসন
কোহলির ব্যাটিংয়ে আগ্রাসন বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রমাণ বাউন্ডারি ও ছক্কার পরিসংখ্যান। ২০২১-২২ সালে প্রতি ১০.২ বলে একটি বাউন্ডারি মারতেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে সেই ব্যবধান কমে এসেছে ৭.৩ বলে। ছক্কার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনটি চোখে পড়ার মতো। আগে প্রতি ১৭৩.৫ বলে একটি ছক্কা মারলেও ২০২৩-২৫ সময়ে সেটি ছিল প্রতি ১৩৩.৫ বলে। আর দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের পর থেকে প্রতি ২৫ বলে একটি ছক্কা হাঁকাচ্ছেন তিনি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কোহলি এখন শুধু বড় শট খেলার চেষ্টা করছেন। বরং আগ্রাসন বাড়লেও নিজের স্বাভাবিক ব্যাটিংয়ের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন না তিনি। দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি ইনিংসের ভিত গড়ার দক্ষতাও ধরে রেখেছেন।
পেস-স্পিন দুই বিভাগেই নতুন কোহলির দাপট
কোহলির পরিবর্তন শুধু বাউন্ডারি মারার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে ভালো লেংথের বলে তাঁর স্ট্রাইক রেট ২০২৩-২৫ সময়ের ৭৯.২০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১১১.৯৫। আক্রমণাত্মক শট খেলার ক্ষেত্রে স্ট্রাইক রেট বেড়েছে ১২১.৯৫ থেকে ১৬৮.৮৮-তে।
স্পিনের বিপক্ষেও প্রথম ২০ বলে তাঁর স্ট্রাইক রেট ৮০.১২ থেকে বেড়ে হয়েছে ১০৩.৬৪। অর্থাৎ, ইনিংসের শুরুতে পেসার কিংবা স্পিনার কাউকেই বাড়তি সময় দিতে চাইছেন না এই অভিজ্ঞ ব্যাটার।
আগে ভালো লেংথের অনেক বল রক্ষণাত্মকভাবে খেললেও এখন সেগুলো থেকে রান বের করার চেষ্টা করছেন তিনি। ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে বোলারদের লেংথ নষ্ট করা, ফাঁকা জায়গায় বল পাঠিয়ে স্ট্রাইক পরিবর্তন করা এবং সুযোগ পেলেই বাউন্ডারি হাঁকানো সব মিলিয়ে তাঁর ব্যাটিংয়ে এসেছে নতুন মাত্রা।
কেন বাড়ছে কোহলির আগ্রাসন?
এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। কোহলি নিজেই বলেছেন, মানসিকভাবে এখন আগের চেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছেন। এর প্রভাব পড়ছে তাঁর ব্যাটিংয়েও। টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের পর নিজের ব্যাটিংয়ে নতুনভাবে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। আইপিএলে তৈরি হওয়া আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের অভ্যাসও এখন ওয়ানডেতে কাজে লাগাচ্ছেন।
এ ছাড়া দলের ব্যাটিংয়ের চাহিদাও বদলেছে। ইনিংসের শুরুতে দ্রুত রান তোলার গুরুত্ব বেড়েছে। ফলে পরিস্থিতি বুঝে নিজের স্বাভাবিক ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি আক্রমণাত্মক ভূমিকাও পালন করছেন কোহলি।
২০২৭ বিশ্বকাপের আগে ভারতের বড় স্বস্তি
৩৭ বছর বয়সে এসে কোহলি প্রমাণ করছেন, অভিজ্ঞতা মানেই শুধু রক্ষণাত্মক ক্রিকেট নয়। বরং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কখন আক্রমণ করতে হবে, কখন ঝুঁকি নিতে হবে এবং কীভাবে বোলারকে চাপে রাখতে হবে সেই দক্ষতাই তাঁকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।
২০২৭ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের আগে ভারতের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। দক্ষিণ আফ্রিকার ভিন্ন ভিন্ন কন্ডিশনে পেস ও বাউন্স সামলানোর পাশাপাশি শুরু থেকেই রান তোলার এই সামর্থ্য কোহলিকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সাহায্য করতে পারে।
১৫ হাজারের বেশি ওয়ানডে রান, অসংখ্য রেকর্ড ও অর্জনের পরও নিজের ব্যাটিংয়ে নতুন মাত্রা যোগ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। অকল্যান্ডে ৫১ বলে ৭৪ রানের ইনিংস তারই আরেকটি প্রমাণ। কোহলির টেকনিক হয়তো খুব বেশি বদলায়নি, বদলেছে সেই টেকনিক ব্যবহারের সাহস ও সময়।
আসলে এটি নতুন করে নিজেকে আবিষ্কারের গল্প নয়, বরং নিজের সামর্থ্যের ওপর আরও বেশি বিশ্বাস রেখে সেটিকে উন্মুক্ত করে দেওয়ার গল্প। ৩৭ বছর বয়সেও তাই থামার কোনো লক্ষণ নেই বিরাট কোহলির।