পুষ্টিগুণ ও ভেষজ গুণের জন্য বহুদিন ধরে সমাদৃত শজনেগাছ। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। বলা হচ্ছে, এটি পানির ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করতেও অত্যন্ত কার্যকর!
ব্রাজিল ও যুক্তরাজ্যের একদল বিজ্ঞানী সম্প্রতি দেখেছেন, শজনেবীজের নির্যাস পানির মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণে প্রচলিত রাসায়নিকের মতোই কার্যকর। এই মাসেই (এপ্রিল) প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, দ্রুত বর্ধনশীল এই গাছের বীজ থেকে তৈরি নির্যাস পানিতে থাকা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাকে একত্র করে সহজে ছেঁকে ফেলতে সাহায্য করে।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) এ বিষয়ে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শজনেগাছ দিয়ে পানি পরিশোধনের ধারণা নতুন নয়। প্রাচীন গ্রিক, রোমান ও মিসরীয় সভ্যতায়ও এর ব্যবহার ছিল। গবেষক আদ্রিয়ানো গনসালভেস দোস রেইস জানিয়েছেন, তাঁরা প্রায় এক দশক ধরে এই বীজের ‘কোয়াগুল্যান্ট’ বা জমাট বাঁধানোর ক্ষমতা নিয়ে কাজ করছেন। এই পদার্থ পানিতে ভাসমান সূক্ষ্ম কণাগুলোকে একত্র করে বড় আকারে পরিণত করে। ফলে সেগুলো সহজে ফিল্টার করা যায়।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের আকার এক মাইক্রোমিটার পর্যন্ত ক্ষুদ্র হতে পারে। বর্তমানে এটি বৈশ্বিক দূষণের একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমুদ্রের গভীরতা থেকে শুরু করে পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত সর্বত্রই এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে পরীক্ষিত কলের পানির ৮৩ শতাংশে মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। এমনকি মানবদেহের মস্তিষ্ক, প্রজনন অঙ্গ ও হৃদ্রোগ-সংক্রান্ত ব্যবস্থাতেও এসব কণার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্যের ওপর এর পূর্ণ প্রভাব নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। প্রাণীর ওপর পরীক্ষায় এটি হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও প্রজনন সমস্যার সঙ্গে যুক্ত বলে দেখা গেছে।
গবেষণায় বিশেষভাবে পিভিসি (PVC) মাইক্রোপ্লাস্টিকের ওপর নজর দেওয়া হয়। কারণ, এগুলো তুলনামূলক বেশি ক্ষতিকর এবং পানিতে বেশি পাওয়া যায়। প্রায় ১৮.৮ মাইক্রোমিটার আকারের এই কণাগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, শজনেবীজের নির্যাস ব্যবহার করে ৯৮.৫ শতাংশ পর্যন্ত অপসারণ সম্ভব। এই কার্যকারিতা বহুল ব্যবহৃত রাসায়নিক অ্যালুমিনিয়াম সালফেটের সমতুল্য। এমনকি ক্ষারীয় পানিতে শজনে আরও ভালো ফল দেয়।
তবে শজনে ব্যবহারের বড় সুবিধা হলো এটি প্রাকৃতিক, নবায়নযোগ্য ও বায়োডিগ্রেডেবল। এতে বিষাক্ততার ঝুঁকি কম এবং অতিরিক্ত বর্জ্য তৈরি হয় না। বিপরীতে অ্যালুমিনিয়াম সালফেট উচ্চমাত্রায় ক্ষতিকর হতে পারে এবং স্নায়বিক রোগের সঙ্গেও এটির সম্পর্ক রয়েছে।
তবে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। একটি শজনেবীজ প্রায় ১০ লিটার পানি পরিশোধন করতে পারে। ফলে বড় কোনো শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় এটি প্রয়োগ করতে প্রচুর বীজের প্রয়োজন হবে। তাই ছোট সম্প্রদায় বা যেখানে রাসায়নিক সহজলভ্য নয়, সেখানে এই পদ্ধতি বেশি কার্যকর হতে পারে।
গবেষকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে আরও গবেষণার মাধ্যমে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা, ব্যয় ও বিভিন্ন ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক এমনকি ন্যানোপ্লাস্টিক দূর করার সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। ক্রমবর্ধমান প্লাস্টিক দূষণের এই যুগে এটি একটি আশাব্যঞ্জক ও পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।