হোম > রাজনীতি

স্থানীয় সরকার নির্বাচন: আ.লীগ নিয়ে বিএনপিতে দুই মত

রেজা করিম, ঢাকা

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) চূড়ান্ত করা নির্বাচনী বিধিমালায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদেরও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ নিয়ে বিএনপির নেতাদের মত দুই রকম। তাঁদের একাংশ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে কিছুটা নমনীয়, আবার সতর্কও। তবে অন্য নেতারা বলছেন, জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আসলে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কোনো সুযোগই নেই।

এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাফল্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ধরে রাখতে প্রস্তুতি শুরুর পাশাপাশি কৌশলও ঠিক করছে বিএনপি। ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ এড়াতে ত্যাগীদের মূল্যায়ন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) স্থানীয় নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতি কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করেছে বিএনপির নেতাদের মধ্যে।

সরকারের পক্ষ থেকে চলতি বছরের শেষ নাগাদ স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের আভাস দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি), পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনসহ দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। বাজেটের প্রাপ্যতার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে এই নির্বাচনগুলো হবে, যার মধ্যে প্রথমে ইউপি নির্বাচন হতে পারে।

এমন আভাসের পর রাজনৈতিক দলগুলো ভেতরে ভেতরে নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশনও প্রস্তুতি শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে নির্বাচনী বিধিমালা চূড়ান্ত করেছে। এই বিধিমালায় কোনো দলকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখার কোনো বিধান রাখা হয়নি। বিধিমালায় দলীয় প্রতীকহীন এই নির্বাচনে যোগ্য যে কারও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিধিমালার এই বিধানকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নির্বাচনে মাঠে নামার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ইসি সূত্র জানায়, বিধিমালার প্রস্তাবনায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই, এই মর্মে ইসির তৈরি করা অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছিল। এই বিধান ইসির চূড়ান্ত করা বিধিমালায় রাখা হয়নি। চূড়ান্ত করা বিধিমালা এখনো পাস হয়নি। ইউপির পর পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনেরও বিধিমালা চূড়ান্ত করা হবে নতুন আইন অনুযায়ী। সে ক্ষেত্রে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতায় একই বিধান বহাল রাখা হবে।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে মাঠে নেই। ইসির চূড়ান্ত করা এই বিধিমালা পাস হলে যোগ্য যে কারও স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকবে। নির্দলীয় এই নির্বাচনে সেই সুযোগ আওয়ামী লীগের কত নেতা-কর্মী নেবেন, তা নিশ্চিত নয়। একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, আওয়ামী লীগ সম্পর্কে মানুষের ধারণার বদল না হওয়ায় স্থানীয় অনেকে মাঠে নামবেন না। হাতে গোনা কয়েকজন প্রার্থী হতে পারেন।

স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগের বিষয়ে বিএনপির নেতাদের মধ্যে দুই রকম মত আছে। একপক্ষ এ বিষয়ে কিছুটা নমনীয় হলেও সতর্ক। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা রাখা এক নেতা এ বিষয়ে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার মানসে জনগণের প্রতিনিধি হয়ে আসতে চাইলে বিএনপির কোনো সমস্যা নেই। কোনো বাধাও দেবে না। তবে রাজনীতির নোংরামির চিন্তা বাদ দিয়ে আসতে হবে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্বাচনের মাঠে এসে কেউ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা দলীয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

অবশ্য বিএনপির নেতাদের বড় একটি অংশই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেখছেন না। তাঁদের মতে, স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতাদের অংশ নেওয়ার বাস্তব কোনো সুযোগই নেই। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁদের নির্বাচনে আসার চেষ্টা অবাস্তব বা দুরাশার শামিল। আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা-কর্মী এখন জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত ও গণধিক্কৃত। দলটির শীর্ষ থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের অনেক নেতা-কর্মী বিভিন্ন মামলার আসামি এবং আত্মগোপনে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কেউ জোরপূর্বক বা ভিন্ন কৌশলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করলে নির্বাচনী পরিবেশ বিঘ্নিত হতে পারে।

আওয়ামী লীগের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগের বিষয়টি বিএনপি কীভাবে দেখছে—এমন প্রশ্নে দলটির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মাথা থেকে পা পর্যন্ত পচন ধরেছে। সেখানে ক্লিন ইমেজের কোনো লোক আছে—এমন তো আমরা দেখি না। আওয়ামী লীগের ভেতর এখন আর ভালো বা গ্রহণযোগ্য কোনো নেতৃত্ব অবশিষ্ট নেই।’

এদিকে জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় নির্বাচনেও ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ নিয়ে জটিলতার আশঙ্কা করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা। এ অবস্থায় আগেভাগেই সতর্ক হয়ে মাঠপর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীর জটিলতা এড়ানোর কৌশল ঠিক করছেন তাঁরা।

বিএনপির সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শীর্ষ পদগুলোতে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ এড়াতে দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতারাই দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবেন। গত কোরবানির ঈদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের শোডাউনের পর মাঠপর্যায়ের নানা হিসাবনিকাশ কষছেন দায়িত্বশীল নেতারা। একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে তৃণমূল থেকে তথ্য সংগ্রহের কাজও চলছে পুরোদমে।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা রাখা একাধিক নেতা জানান, ফ্যাসিবাদী আমলে যাঁরা রাজপথে ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং এলাকায় যাঁদের জনপ্রিয়তা রয়েছে, তাঁদেরই সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা হবে। বিএনপি সরকারে থাকায় বর্তমানে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে সক্রিয়। তবে কোন্দল এড়াতে নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার আগেই একক প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজ শেষ করতে চায় দল।

কেন্দ্র থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বার্তা না পেলেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় পোস্টার-ফেস্টুন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অঘোষিতভাবে প্রচার শুরু করেছেন। সিটি করপোরেশনে নিযুক্ত দলীয় প্রশাসকদের অনেকে নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছেন। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, ‘আমার নির্বাচনের প্রস্তুতি রয়েছে। জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করছি। আশা করি দল থেকে আমাকে মূল্যায়ন করা হবে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৪ নং ওয়ার্ডের সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থী ও স্থানীয় যুবদল নেতা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সাধারণ মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়িয়েছি, আগে থেকে প্রস্তুতি রাখছি। প্রত্যাশা করি দল আমাকে মূল্যায়ন করবে।’

এদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীদের আগাম প্রস্তুতি নিয়েও বিএনপিতে অস্বস্তি রয়েছে বলে জানা গেছে। মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের অনেকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির আগাম প্রস্তুতি বিএনপিকে কিছুটা অস্বস্তির মুখে ফেলেছে। জামায়াত প্রায় এক বছর আগে থেকে প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠে কাজ শুরু করেছে। বিপরীতে প্রায় প্রতিটি এলাকায় বিএনপির একাধিক যোগ্য প্রার্থী তোড়জোড় শুরু করায় কর্মীদের মধ্যে একধরনের অনৈক্য বা পক্ষ নেওয়া নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।

বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল ঠেকাতে পারলে এবং নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও বিএনপির জয় নিশ্চিত করা সহজ হবে।

নেতাদের দায়িত্ব পুনর্বণ্টন হচ্ছে এনসিপিতে

ধানমন্ডিতে সাংবাদিকের ওপর হামলা: তদন্ত কমিটির সুপারিশে জামায়াতের ৪ কর্মী বহিষ্কার

বাজেট পাসে সংসদের ভূমিকা রাবার স্ট্যাম্প: জামায়াতের এমপি নাজিবুর

এক-এগারোর সময়ে তারেক রহমানের ওপর নির্যাতনের ঘটনার বিচারের দাবি সংসদে

সরকার একদলীয় শাসনের দিকে ধাবিত হচ্ছে: জামায়াত আমির

১৮ আইন কর্মকর্তার পদত্যাগকে স্টান্টবাজি বলছে বিএনপি

বিচার করুন, না হয় যাওয়ার পথ খুঁজুন: সরকারের উদ্দেশে জামায়াত আমির

আওয়ামী লীগের বিচার দাবিতে এনসিপির বিক্ষোভ মিছিল

বিচার নিশ্চিত না হলে সরকার ৫ বছর পূর্ণ করতে পারবে না: নাহিদ ইসলাম

সাংবাদিকের ওপর হামলা: তদন্তে জামায়াতের কমিটি