ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল গণনার পরবর্তী সময়ে ১১ দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ এনেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘আমরা চাইলেও যদি তাঁরা ইতিবাচক ধারার রাজনীতি না চান, তাহলে আমরা জোর করে ইতিবাচক রাজনীতি করতে পারব না। নির্বাচনে যাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছেন—যেভাবেই পেয়ে থাকুন, এ ব্যাপারে আমাদের যথেষ্ট অবজারভেশন ও আপত্তি আছে—দায় মূলত তাঁদেরই নিতে হবে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করার।’
জামায়াত আমির আরও যোগ করেন, ‘যদি তাঁরা সরকার গঠন করেন, এটা তাঁদের দায়িত্ব। কিন্তু এখন এগুলো কিসের আলামত? এখন এগুলো বন্ধ করতে হবে। এখনো যদি বন্ধ করা না হয়, আমরা বাধ্য হব যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে।’ এ সময় রাজপথে নামার হুঁশিয়ারিও দেন জামায়াত আমির।
আজ শুক্রবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ব্রিফিংয়ের আগে বিকেল ৫টায় নিজেদের নির্বাহী পরিষদ ও রাত ৮টার দিকে জোটের শরিক ১১ দলের শীর্ষনেতাদের নিয়ে দুটি বৈঠক করে জামায়াত।
ব্রিফিংয়ে জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, নির্বাচন মানে হার-জিতের ব্যাপার থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। সেই হার-জিতটা যদি স্বাভাবিকভাবে হয়, তাহলে কারও সেখানে বড় কোনো আপত্তি থাকে না, সবাই সাধারণত মেনে নেয়। কিন্তু যদি সেখানে বড় ধরনের কোনো বৈষম্য অথবা অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এটা প্রশ্ন তৈরি করে।
জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা আমাদের পক্ষ থেকে গতকাল এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জানানোর পরেও আপনারা লক্ষ করেছেন, আজ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ১১ দলের কর্মী-সমর্থক, এজেন্ট ও ভোটারদের বাড়িতে বাড়িতে হামলা হচ্ছে, ব্যক্তির ওপর হামলা হচ্ছে, আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা তো ফ্যাসিবাদী তৎপরতা। ফ্যাসিবাদের ধ্বংসস্তূপের ওপর এই জাতির জন্য এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক এবং এর সম্পূর্ণ দায় তাঁদের নিতে হবে, যাঁরা এই ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হবেন।’
বেশ কিছু জায়গায় নির্বাচনী ফলাফল কারচুপির অভিযোগও উত্থাপন করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বেশ কিছু জায়গায় গতকাল নির্বাচনী সম্প্রচার যখন হয়, ফলাফল হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায়। যে পিছিয়ে ছিল, কিছু ভোট নষ্ট করে তাকে ছাড় দিয়ে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে, যেটা অবাস্তব। আবার আমাদের কাছে ডকুমেন্ট আছে, বিভিন্ন জায়গায় রেজাল্ট শিটের ওপর ঘষামাজা করা হয়েছে। কিছু কিছু আসনে দ্বৈত নীতি অবলম্বন করা হয়েছে।’
শফিকুর রহমান যোগ করেন, ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর আসনের ব্যাপার আপনারা সবাই জানেন, এটা আমাকে বড় করে আর বলতে হবে না। সেখানে কী হয়েছে? সেন্টার দখল করে একজন নেতার আপনজনের নেতৃত্বে সেখানে যা হয়েছে, তার সাক্ষী এই দেশবাসী ও বিশ্ববাসী। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক সাহেব এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওখানে যে কারণে অন্য একজনের পক্ষে ব্যালট একসেপ্ট করা হয়েছে, ঠিক একই কারণ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও মাওলানা মামুনুল হক সাহেবের পক্ষে এটা একসেপ্ট করা হয়নি। তো এক দেশে কি দুই আইন চলবে? নির্বাচন কমিশন কি এক এক জায়গায় এক একটা আইনের প্রয়োগ করবে?’
এসব আসনে নির্বাচনের ফলাফল পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘যাদের ওপরে এই অন্যায় আচরণ করা হয়েছে, যাদের অধিকার জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, আমাদের সিদ্ধান্ত তারা প্রতিকার চাইবেন। সুনির্দিষ্ট সময়ের ভেতরে যদি আমরা প্রতিকার পাই, তাহলে এক কথা, কিন্তু যদি না পাই, তাহলে এখানেও আমরা বাধ্য হব আমাদের পথ দেখতে। আমরা আশা করব, নির্বাচন কমিশনের শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং তারা ন্যায়-ইনসাফ করবে। না করলে দায় তাদের নিতে হবে।’
দেশের সবাই একই সংবিধানের অধীনে সমান অধিকার ভোগ করবেন মন্তব্য করে শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘অতীতে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই হয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম, সেই কালো অধ্যায়ের অবসান হোক। কিন্তু যদি আবার এটা ফিরে আসে, আমরা লড়ে যাব। আমরা থামব না, এখানে কোনো ছাড় দেব না।’
গণভোট বাস্তবায়ন নিয়ে শফিকুর বলেন, ‘গণভোটের ব্যাপারে আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার রায় দিয়েছে গণভোটের পক্ষে। অবশ্যই তা বাস্তবায়ন করতে হবে, এর কোনো ব্যতিক্রম আমরা দেখতে চাই না। পচা রাজনীতির পরিবর্তনের জন্যই ছিল এই গণভোট। নতুন ধারার সুস্থ রাজনীতির পক্ষেই গণভোট। গণভোটে ‘‘হ্যাঁ’’ বিজয়ী হয়েছে। এখন বাস্তবায়ন করা যারাই সরকার গঠন করবেন, তাঁদের দায়িত্ব। তাঁরা যদি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন, আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব। কেউ যদি এড়িয়ে চলতে চান, এ বিষয়ে অবশ্যই আমাদের কণ্ঠ থেমে থাকবে না। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করব।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘যারা ভালোবেসে একটা পরিবর্তনের পক্ষে গণভোটে হ্যাঁ বলেছেন এবং আমাদের ভোট দিয়েছেন, সহযোগিতা-সমর্থন করেছেন, আমরা তাঁদের বলতে চাই, আপনারা যেমন আমাদের সঙ্গে ছিলেন, আগেও আমরা আপনাদের সঙ্গে ছিলাম। আজকে থেকে আরও শক্তভাবে আমরা আপনাদের সঙ্গে থাকব ইনশা আল্লাহ। আমাদের যদি বাধ্য করা হয়, তাহলে রাজপথেও আমরা নামব।’