গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে অনড় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। এ জন্য সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে গঠিত বিশেষ কমিটিকে তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। এই কমিটিতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল আছে তারা। দলগুলো বলছে, সংসদে দাবি উপেক্ষিত হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত করা হবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ গতকাল মঙ্গলবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করার কথা ছিল, সেটা হলে আমরা অংশ নিতাম। কিন্তু সংশোধনের কমিটিতে নাম দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। সংস্কারের দাবিতে আমাদের আন্দোলন কর্মসূচি চলমান রয়েছে। ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে কয়েকটি সমাবেশ বাকি আছে। এরপর আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে যাব।’
সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গত সোমবার জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম। এর প্রতিবাদে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করার পর বাইরে এসে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, প্রথম অধিবেশনেই এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেদিনই বিরোধী দল অবস্থান স্পষ্ট করেছিল।
বিরোধী দল ওয়াকআউটের পরে সংসদে কণ্ঠভোটে সংবিধান সংশোধনবিষয়ক কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাস হয়। এই কমিটিতে ১৭ জন সদস্য থাকার কথা ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলকে পাঁচজনের নাম দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু বিরোধী দল তা প্রত্যাখ্যান করায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
বিরোধীদলীয় জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা বলছেন, তাঁরা সংবিধান সংস্কার চান, সংশোধন নয়। এই দাবিতেই তাঁরা শেষ পর্যন্ত অটল থাকবেন।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিকুর রহমান মোজাহিদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে এনসিপি অংশ নেবে না। জনগণ যে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, দল সেই অবস্থানেই অটল থাকবে। সরকার যদি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি সরকারের বিষয়। তবে এনসিপি জনগণের রায়কে সম্মান জানায় এবং সেই রায়ের পক্ষেই থাকবে।
আতিকুর রহমান মোজাহিদ আরও বলেন, ‘সংসদে যদি আমাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকে, তাহলে সংসদের বাইরে আন্দোলন জোরদার করা হবে। জনগণের অধিকার আদায়ে অবশ্যই মাঠের আন্দোলনে আমরা থাকব।’
এনসিপির নেতারা জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সারা দেশে তাদের পদযাত্রা চলছে ৷ এরপর জোটসঙ্গীদের সঙ্গে আলোচনা করে পর্যায়ক্রমে তাঁরা বৃহত্তর আন্দোলনে যাবেন।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উপপ্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, ‘গণভোটের রায় অগ্রাহ্য করে প্রহসনের কমিটিতে বিরোধী দল অংশ নেবে না। দুই-তৃতীয়াংশের জোরে সরকার গণরায় অগ্রাহ্য করে যাচ্ছে। তবে এতে দীর্ঘ মেয়াদে তাদেরই ক্ষতি হচ্ছে।’
এনসিপির এই নেতা আরও বলেন, ‘আমরা এখনো আহ্বান জানাচ্ছি, গণভোটের রায় মেনে নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হোক। অন্যথায় বিরোধী দল আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করে নেবে। ধারাবাহিকভাবে আন্দোলনের গতি বৃদ্ধি পাবে।’
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংবিধান সংস্কার নিয়ে গতকাল সংসদে বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেছেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদ ঠেকাতে সরকার সংবিধান সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য এখনো পাঁচটি আসন খালি রাখা হয়েছে। আলোচনায় ফিরে আসার জন্য বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব প্রথম আসে গত ২৯ এপ্রিল। সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে, যেখানে বিরোধী দল থেকেও সদস্য রাখা হবে। কিন্তু বিরোধী দল শুরু থেকে বলে আসছে, গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে আলাদা বিশেষ কমিটির প্রয়োজন নেই।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর বিএনপি, জামায়াতসহ ২৫টি রাজনৈতিক দল সনদে স্বাক্ষর করে। পরে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) সনদে স্বাক্ষর করে।
জুলাই সনদের ৮৪টি ধারার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। এসব বাস্তবায়নের জন্য পরে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশ অনুযায়ী জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হয়।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবে এবং সনদের বিষয়গুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, গণভোটের রায় অনুযায়ী তারা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য—দুই পরিচয়ে শপথ নিলেও সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ নেননি। ফলে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পরিবর্তে সরকার এখন সংবিধান সংশোধনের জন্য পৃথক বিশেষ কমিটি গঠন করে ভিন্ন পথে এগোচ্ছে। এ কারণেই বিশেষ কমিটিতে অংশ না নিয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সংসদ ও রাজপথ—দুই জায়গাতেই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিরোধী জোট।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘সরকার যদি আন্দোলন করার ইস্যু দিয়ে দেয়, তাহলে তো আমাদের আন্দোলন জোরদার করার উপাদান আরও বাড়ল। আমাদের আন্দোলনটা হয়তো আরেকটু সময় নিয়ে জোরদার হতো, এই ইস্যুতে তাড়াতাড়ি জোরদার হবে। এই জায়গায় কোনো ছাড় নেই।’
যদিও বিরোধী জোটের নেতারা বলছেন, আন্দোলন চলমান থাকলেও আপাতত তারা কিছুটা নমনীয় অবস্থানে রয়েছেন। চূড়ান্ত আন্দোলনে যাওয়ার আগে সরকারকে কিছুটা সময় দিতে চান তাঁরা। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতে ইসলামীর একজন নেতা বলেন, ‘সংবিধান সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলমান রয়েছে। এর চূড়ান্ত রূপ দেখা যেতে পারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন প্রশ্নে।’
তবে এনসিপির নেতারা বলছেন, জামায়াত বরাবরই সরকারের প্রতি নমনীয়। কিন্তু এনসিপি শুরু থেকে সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে সোচ্চার ছিল। যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রশ্ন সামনে আসবে, তখন জামায়াতও তাদের নমনীয় ভাব পরিহার করে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলবে বলে মনে করে এনসিপি। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির একজন যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, ‘বিএনপি পূর্বের মতোই নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে চাইবে। রাষ্ট্রপতি সরকারের পরামর্শে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেবে। সে-ই হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান। এই প্রক্রিয়া এবার মেনে নেওয়া হবে না। সংস্কারের চূড়ান্ত আন্দোলনটা তখন রাজপথে দেখা যাবে।’