দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করাতেই হবে। বর্তমান সরকার দুদক আইন সংশোধনের যে নতুন খসড়া তৈরি করেছে, তাতে সংস্কার কমিশনের যুগান্তকারী প্রস্তাবগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে দুদক একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে আর দাঁড়াতে পারবে না।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুদক একটা অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে চলছিল। ফলে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, মন্ত্রী, এমপি, ঋণখেলাপি থেকে শুরু করে দেশের বড় রাঘববোয়ালরা সীমাহীন দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হতে পেরেছিল। আর দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা অবলীলায় বিদেশে পাচার হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সম্পদ এভাবে বিদেশে পাচার প্রতিরোধ করার জন্য দুদকের সক্রিয় ভূমিকা পালন করার কথা থাকলেও শুধু দলীয় ও আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার কারণে দুদক ব্যর্থ হয়েছিল। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুদককে আমরা সক্রিয় হিসেবে দেখতে পাই। যদিও সন্দেহ থেকে যায়—সে সময় দুদক শুধু আওয়ামী লীগের মদদপুষ্ট লোকজনের বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। সেই সূত্রে বলা যায়, দুদক কখনোই স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে পারেনি।
তারপরও সে সময়ে গঠিত দুদক সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলো যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো, তাহলে এ প্রতিষ্ঠানটি একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সে প্রত্যাশাও হোঁচট খেয়েছে।
আইনের নতুন খসড়াটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুদককে শক্তিশালী করার চেয়ে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচ্ছন্ন প্রয়াস এখানে স্পষ্ট। সংস্কার কমিশন দুদকের সদস্যসংখ্যা তিন থেকে বাড়িয়ে পাঁচজন করা, নারী ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করা এবং একে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার যে বৈপ্লবিক প্রস্তাব করেছিল, তা খসড়ায় উপেক্ষা করা হয়েছে। এমনকি কমিশনার নিয়োগে সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার বাধ্যবাধকতা এবং নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট গঠনের মতো বনিয়াদি সংস্কারগুলোকেও আমলে নেওয়া হয়নি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কমিশনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমস্যা দেখা দিলে, তা নিরসনে সচিবকে মহাপরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে বিশেষ ক্ষমতার প্রস্তাব করা হয়েছে, তা কার্যত একটি স্বাধীন ও স্বশাসিত কমিশনের অস্তিত্বকে বিপন্ন করবে। যৌথ সিদ্ধান্তের ক্ষমতা এককভাবে একজন আমলার হাতে অর্পণ করার এই চক্রান্ত দুদককে আমলাতান্ত্রিক মোড়কেই বন্দী করে ফেলবে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, সরকারি কর্মকর্তা বা বিচারকদের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমতি নেওয়ার বৈষম্যমূলক ‘৩২ ক’ ধারাটি বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু শুধু এই একটি সংস্কার দিয়ে পুরো প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অসম্ভব।
দুদককে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে খসড়া আইনের এই আমলাতান্ত্রিক ফাঁদগুলো অবিলম্বে দূর করতে হবে। সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, এটিকে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দিতে হবে, যাতে কোনো সরকারই চাইলে একে নিজের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে।