জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধর করার ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করার পর চট্টগ্রামের খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঘটনার গুরুত্ব বুঝে ত্বরিত এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কর্তৃপক্ষকে সাধুবাদ জানানো যেতেই পারে।
নাঈমকে নিয়ে চট্টগ্রামে যে ঘটনা ঘটেছে, তাতে যেমন আমাদের লজ্জায় মাথা নত হয়, তেমনি এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে ব্যাপারে সজাগ হওয়ার প্রয়োজনীয়তাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয়। নাঈম জাতীয় দলের ক্রিকেটার বলে হয়তো দোষীদের ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কিন্তু নাঈমের জায়গায় যদি কোনো সাধারণ মানুষ এই অবস্থায় পড়তেন, তাহলে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হতো কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
শুক্রবার সাভারের বিকেএসপিতে প্রাইম ব্যাংকের হয়ে ম্যাচ খেলে নাঈম রাতের ফ্লাইটে চট্টগ্রাম ফেরেন। ফ্লাইট ছিল রাত ১০টা ২০ মিনিটে। বিমানবন্দর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তিনি তাঁর বাড়ি ফিরছিলেন। পথে লালখান বাজার এলাকায় পুলিশের একটি গাড়ি তাঁকে বহনকারী অটোরিকশার গতিরোধ করে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, নাঈম জাতীয় দলের খেলোয়াড় হিসেবে পরিচয় দিলেও পুলিশ তাতে কান দেয়নি। বরং তাঁকে মারধরও করে। ‘আসামি’ হিসেবে তাঁকে খুলশী থানায় নেওয়া হয়। সেরের ওপর সোয়া সের হয়ে ওসি সাহেবও নাঈমের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। পরে যখন ওসি একটি ফোনকল পান, তখন থেকে তিনি কিছুটা ভদ্রস্থ আচরণ করেন।
এখানে এসেই আমাদের থামতে হবে। দেশের সাধারণ মানুষের জন্য কোথা থেকে ‘ফোনকল’ আসবে? নাঈমের পরিচিতির কারণে না হয় এ যাত্রা তিনি পুলিশের ছত্রিশ ঘা থেকে বেঁচে গেলেন। তাঁর যদি এই পরিচয় না থাকত, তাহলে ঘটনা কোন দিকে মোড় নিত?
পুলিশ জনগণের বন্ধু—এ রকম একটি প্রচারণা রয়েছে। সাধারণ নাগরিকেরা কিন্তু এই প্রচারণার দিকে সংশয়ী দৃষ্টিতে তাকান। পুলিশের মধ্যে নিয়মনীতি মানা সদস্য একেবারেই নেই, এমন নয়। অনেক পুলিশ সদস্যই জনগণের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করেন। কিন্তু অনেকেই আছেন, যাঁরা জনগণকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে আনন্দ পান। দৈনন্দিন জীবনে পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের মোলাকাত সব সময় সুখকর হয় না। তাই পুলিশকে বন্ধু ভাবা খুব সহজ নয়।
পুলিশ সদস্যদের নীতি-নৈতিকতা শেখানো হয় নিশ্চয়ই। কিন্তু বাস্তবজীবনে তা পালন করার বাধ্যবাধকতা কি তাঁদের নেই? শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যই তো পুলিশ রয়েছে। তাহলে জনগণের বন্ধু হওয়ার ব্যাপারে বাধা কোত্থেকে আসে? এ প্রশ্নের উত্তরও যে খুব কঠিন, এমন নয়। পুলিশ যে কাজগুলো করে, সে কাজের জন্য যাদের কাছে জবাবদিহি করে, সেগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বেপরোয়া পুলিশি আচরণের কারণ বোঝা যাবে।
শুধু নাঈমের জন্য নয়, যেকোনো সাধারণ মানুষের জন্য যেকোনো জায়গায় মুক্তভাবে চলাচল নিরাপদ করতে না পারলে বড় বড় আপ্তবাক্যতেই পুলিশের তৎপরতা আটকে থাকবে। দোষী আর নির্দোষ যদি পুলিশি মনস্তত্ত্বে একই জায়গায় থাকে, তাহলে জাতির বিপদ আছে।