স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের হাসপাতাল পরিদর্শন বেশ কাজে দিচ্ছে। মন্ত্রী হাসপাতাল পরিদর্শনে আসবেন, তা আগাম জানতে পারলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হয় ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। তিনি পৌঁছানোর আগেই নোংরা হাসপাতালকে আদর্শ হাসপাতালে রূপান্তরের কাজ চলতে থাকে দ্রুত। এ যেন এক ম্যাজিক কারবার।
এবার মন্ত্রী গিয়েছিলেন কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে। এই হাসপাতালটি নাকি দুর্গন্ধ, অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা পরিবেশের কারণে সমালোচিত। কিন্তু মন্ত্রীর আগমন সংবাদে পোকায় খাওয়া জামাকাপড়ের হাসপাতালটি যেন রাজার পোশাকে সজ্জিত হয়। দীর্ঘদিন টয়লেট ছিল অপরিচ্ছন্ন, রান্নাঘর ছিল অপরিষ্কার, করিডর আর ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাত না, কিন্তু এ যেন আলাদিনের জাদুর চেরাগ হাতে নিয়ে হাজির হয়েছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মন্ত্রীর ভয়ে তারা যে তৎপরতা দেখাল, তাতে মন্ত্রীও খুশি হলেন। সত্যিই তো, ঝকঝকে, তকতকে ভবনে স্বাস্থ্যসেবা হচ্ছে, সেটা দেখতে কার না ভালো লাগে! আহা! হাসপাতালের এই বদলানো রূপের কারণে তাজ্জব বনে যান রোগী আর দর্শনার্থীরা! নিশ্চয়ই তাঁদের কারও কারও মনে এই ভাবনার উদয় হয়েছিল—ইশ্! মন্ত্রী কেন প্রতিদিন আসেন না!
মন্ত্রী যদি প্রতিদিন আসতেন, তাহলে প্রতিদিনই হাসপাতালটিকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হতো। দুঃখের বিষয় হলো, হাসপাতাল শব্দটির সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা শব্দের যে আত্মীয়তা রয়েছে, তা আমাদের সরকারি হাসপাতালগুলো স্বীকার করতে চায় না। মন্ত্রীর আগমন ছাড়া পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ভাবনাটি নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামান না সরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তারা। হাসপাতালে তো শুধু চিকিৎসক আর নার্সরাই চাকরি পান না, নানা কাজ করার জন্য কত ধরনের কর্মচারী রয়েছেন। সেই কর্মচারীরা আসলে কী করেন তাহলে? যাঁদের কাজ পরিচ্ছন্ন রাখা, তাঁরা কী করে সময় কাটান? তাঁরা যে ঠিকভাবে কাজ করছেন না, সেটা দেখারও কি কেউ নেই? হাসপাতালের রান্নাবান্না আর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের রান্নাবান্না নিয়ে কত ধরনের কথাই না ছড়িয়ে আছে। যে ডাল পরিবেশন করা হয়, তাতে পানি আর হলুদ থাকে ঠিকই, কিন্তু তাতে ডাল খুঁজে নিতে হলে দুরবিন দিয়ে ডালটা পর্যবেক্ষণ করতে হয়। রোগীপ্রতি যে খাবার বরাদ্দ থাকে, তা কোন পরিমাণে দেওয়া হয়, তা নিয়েও কত না খবর প্রকাশিত হয়েছে। সরকারি চাকরিতে কার কাছে কে দায়বদ্ধ, সেটা নিয়ে ভাবলে কোনো কূলকিনারা পাওয়া যাবে না।
সমস্যা হলো, কুষ্টিয়ার এই হাসপাতাল একদিন ঝকঝকে তকতকে হয়েছে, এটা কোনো কাজের কথা নয়। মন্ত্রী চলে গেলে পরদিন থেকে এখানে কোন ব্যবস্থা চালু হবে, সেটা দেখা জরুরি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতাল পরিদর্শনের পর যদি তাঁর লোকদের দিয়ে কিছুদিন পরপর রুটিন চেকআপ করান এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে হাসপাতালগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনেন, তাহলে হয়তো পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। নইলে ‘সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল’ যে প্রবাদ রয়েছে, সেটাই উচ্চকিত হয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দেবে।
হাসপাতালগুলো মন্ত্রীর ভয়ে নয়, নিজ গরজেই পরিচ্ছন্ন হোক, এই হোক কামনা।