এক কারারক্ষীর কাণ্ডটা দেখুন—নিজে তো মাদক সেবন করেনই, কারাগারের ভেতরেও মাদকের কারবার করেন। এমন অভিযোগ উঠেছে গাজীপুরের কাশিমপুর কারা কমপ্লেক্সের কারারক্ষী মো. মশিউরের বিরুদ্ধে। তিনি নাকি কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের কারারক্ষী; যেখানে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবলয় থাকার কথা! অবশ্য তিনি যেহেতু নিরাপত্তাকর্মী, তাই তাঁর কাছে সেখানে মাদক সেবন কিংবা মাদকের কারবার পরিচালনা নিশ্চয়ই নিরাপদ।
৬ জুন আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, মশিউর কারাগারের বাইরে হরিণাচালা এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মাদক সেবন করেন। আশপাশের এলাকার মাদক কারবারিদের সঙ্গে তাঁর বেশ খাতির রয়েছে। ফলে তাঁদের কাছ থেকে মাদক নিয়ে কারাগারের ভেতর বন্দীদের কাছে সরবরাহ করতে পারেন। গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে মশিউরের মাদক সেবনের দৃশ্য। এমন শক্ত প্রমাণ থাকার পরও তাঁর বিরুদ্ধে এই সম্পাদকীয় লেখা পর্যন্ত কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তিনি নিজেও বলেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নাকি প্রথমবার শুনলেন।
যদিও অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে শুধু কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছে কারা কর্তৃপক্ষ; তবু তাঁকে হাতেনাতে ধরার অপেক্ষায় আছে তারা। তাঁর বিরুদ্ধে নয়টি বিভাগীয় মামলার একটি চলমান এবং এর আগে নানা অভিযোগে তাঁর লঘু শাস্তি হলেও তিনি বিপথেই রয়ে গেছেন। যদি একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এতটাই বিশ্বাসযোগ্য হয় যে তাঁকে কর্মস্থলে ঢুকতে দেওয়া যায় না, তাহলে তাঁর চাকরি বহাল থাকে কীভাবে? অথচ এমন অবস্থায় তিনি সগৌরবে দায়িত্ব পালন করছেন, হোক তা কারাগারের বাইরের ফটকে।
কারাগারকে আমরা সাধারণত এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কল্পনা করি, যেখানে অপরাধ দমন করা হয়, আইন ভঙ্গকারীদের সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয় এবং সমাজকে নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু যখন অভিযোগ ওঠে যে কারাগারের ভেতরেই চলছে মাদক কারবার ও সেবন, আর সেই কাজে জড়িত খোদ কারারক্ষী, তখন মনে প্রশ্ন জাগে—এটি কি সত্যিই কারাগার, নাকি অপরাধের একটি নিরাপদ আশ্রয়?
আমাদের প্রশাসনে ‘দ্রুত’ শব্দটির একটি বিশেষ অর্থ আছে বলে মনে হয়। কারণ যেকোনো সংকটে কর্তৃপক্ষ ‘দ্রুত’ সমাধানের আশ্বাস দিয়ে থাকে। সিনিয়র জেল সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনও বলেছেন মশিউরের বিরুদ্ধে ‘দ্রুত’ ব্যবস্থা নেবেন। সেই ‘দ্রুত’ সময় কখন আসবে, তা একমাত্র কারা কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে, যদিও তাদের কারও কাছে নিশ্চয়ই কোনো জবাবদিহি করতে হবে না। জবাবদিহির সংস্কৃতির চর্চা কি আর এই দেশে সহজে হয়?
কারাগারকে মাদকমুক্ত করতে হবে, মশিউরদের থামাতে হবে। নইলে একটি জেলখানা যে সংশোধনের স্থান, সেই ধারণাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষ প্রমাণিত হলে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই। এই সংকটের সমাধান না হলে হয়তো মেনে নিতে হবে—কারাগারের দেয়াল উঁচু হয়েছে, কিন্তু শৃঙ্খলার ভিত্তি ভেঙে পড়েছে।