নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ঘটেছে সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনা; যেটি আমাদের অন্তত দুটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। রাজপথে ডাকাতেরা কি সাহসী হয়ে উঠল? পুলিশ সদস্যরা কি তাঁদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছেন না?
৮ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা টোল প্লাজাসংলগ্ন এলাকায় এই ডাকাতির ঘটনা ঘটে। একেবারে টোল প্লাজার সামনে ডাকাতি! ভাবা যায়! ডাকাতদের হাতে ছিল দেশীয় অস্ত্র। তারা অনায়াসে টোল প্লাজার সামনে মাইক্রোবাস দাঁড় করিয়ে বাসের আরোহীদের নামিয়ে মারধর করে। তারপর স্বর্ণালংকার, আইফোন, টাকা নিয়ে সটকে পড়ে।
ঘটনাটি মোটেই সাধারণ নয়। একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে এমন ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া ঠিক হবে না। এটাকে শুধু একটি সাধারণ ডাকাতি হিসেবে না দেখে আমরা বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখার চেষ্টা করব।
দেশে অপরাধ বৃদ্ধি হচ্ছে কি হচ্ছে না, তা নিয়ে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সূত্রে খবর পাওয়া যায়। কিন্তু পরিসংখ্যানের ওপর বিশ্বাস রাখার চেয়ে বেশি প্রয়োজন সত্যিকার অর্থে অপরাধ ঘটতে না দেওয়া। কেন অপরাধ বাড়ে? এর একটি উত্তর হলো, ক্রমাগত অর্থনৈতিক চাপ মানুষকে এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ অকাজের দিকে ঠেলে দেয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং আয়বৈষম্য সামাজিক অনেক নিয়মকে ওলটপালট করে দেয়। তাতে অপরাধ বৃদ্ধির আশঙ্কা বাড়ে। কিন্তু অর্থনৈতিক কষ্ট মানুষকে অপরাধের দিকে নিয়ে যাবে—এটা কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হতে পারে না। সমাজ থেকে বেকারত্ব হটানোর পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও সরকারের জন্য একটি বড় কাজ।
সে কাজ ঠিকভাবে করা হচ্ছে কি না, সেটা দেখার বিষয়। এ রকম ডাকাতি হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতার প্রশ্নটিও উঠে আসবে। সেই যে জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশের নৈতিক বল কমে গিয়েছিল, সে নৈতিক বল কি এখনো নেতিয়ে আছে? তাদের কাজে কি ছন্দ ফেরেনি আর? তারা যদি ঠিকভাবে নজরদারি করতে পারে, তাহলে স্থানীয় অপরাধীরা কি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে? কোথায় কীভাবে অপরাধীরা সংগঠিত হচ্ছে, সে খবরও তো গুপ্তচর মারফত পুলিশের কাছে পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু পুলিশের সক্রিয়তা কেন বাড়ছে না, সেদিকে নজর দেওয়া দরকার।
টোল প্লাজার সামনে মাইক্রোবাস থামিয়ে ডাকাতি করা যায়—এই তথ্য সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা পৌঁছে দেবে। রাজপথে কেউ নিরাপদ নয়, সেটাই জনগণ ভাববে। তাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আস্থা কমবে। ডাকাতের দলও ‘নিরাপদে’ ডাকাতি চালিয়ে যেতে পারবে। এই দুঃসাহস ছড়িয়ে যাবে অন্য অপরাধীদের মধ্যে। তারাও ভাববে, অপরাধ করলে শাস্তি হবে না, সুতরাং অপরাধ করা দোষের নয়!
এই অস্বস্তিকর বাস্তবতা থেকে দেশের জনগণকে মুক্তি দিতে হবে। দিনরাত যেকোনো সময় মানুষ নিরাপদ থাকবে, এই নিশ্চয়তা দিতে না পারলে যে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, তা সামাল দেওয়া সহজ হবে না। তখন বাড়িতে বাড়িতে ঢুকেও ডাকাতি-মাস্তানি করার ঐতিহ্য শুরু হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। শাস্তি হোক এসব দুর্বৃত্তের।