হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতনবৈষম্য

মো. আবু নোমান, শিক্ষক

ছবি: সংগৃ্হীত

একটি জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি হয় মূলত তার প্রাথমিক শিক্ষার মজবুত কাঠামোর ওপর। কাগজ-কলমে বাংলাদেশে শিক্ষার হার আগের চেয়ে বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ঠিকই রয়ে গেছে। আর এই সংকটের পেছনে রয়েছে এক নির্মম সত্য। মানুষ গড়ার কারিগর যারা, তারাই আজ অবহেলা, অবমূল্যায়ন এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার শিকার। ফলে বহুকাল ধরেই এই সেক্টরে আশানুরূপ সাফল্য আসছে না। শিক্ষক যদি তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হন, তবে তিনি কীভাবে প্রথম শ্রেণির নাগরিক তৈরি করবেন?

প্রাথমিক শিক্ষকদের অন্যতম প্রধান কষ্টের জায়গা হলো বর্তমান বেতনকাঠামো। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বর্তমানে ত্রয়োদশ গ্রেডে বেতন দেওয়া হয়, যার মূল বেতন মাত্র ১১ হাজার টাকা। অথচ একই শিক্ষাগত যোগ্যতায় (স্নাতক) অন্য সরকারি চাকরিতে রয়েছে দশম গ্রেড। সম্প্রতি প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেডে (দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা) উন্নীত করা হলেও সহকারী শিক্ষকেরা সেই ত্রয়োদশ গ্রেডেই পড়ে আছেন। একজন উচ্চশিক্ষিত শিক্ষক যখন দেখেন তাঁর মাসিক বেতন দিয়ে পরিবারের ১৫ দিনের খরচও চলে না, তখন তাঁর মধ্যে পেশাগত হতাশা আসাটাই স্বাভাবিক।

সমাজে একসময় শিক্ষকেরা ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র। কিন্তু বর্তমান সমাজে মর্যাদা নির্ধারণ হয় ক্ষমতা আর অর্থের মাপকাঠিতে। অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালী বা নিম্নস্তরের কর্মকর্তারাও শিক্ষকদের সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ করেন। এমন সামাজিক অবমূল্যায়ন মেধাবীদের এই পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত করছে।

বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একজন শিক্ষকের পক্ষে নিজের এবং পরিবারের চিকিৎসা এবং সন্তানের পড়াশোনার খরচসহ মৌলিক চাহিদা মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত এত আর্থিক অনিরাপত্তায় বাধ্য হয়ে অনেক শিক্ষক স্কুলের পর ক্লান্তি ভুলে টিউশনি বা ছোটখাটো ব্যবসায় সময় দিচ্ছেন। এতে করে শ্রেণিকক্ষে তাঁদের পূর্ণ মনোযোগ ব্যাহত হচ্ছে।

মেধাবী তরুণ শিক্ষকেরা প্রাথমিক শিক্ষকতাকে এখন কেবল একটি ‘অস্থায়ী ঠিকানা’ হিসেবে গ্রহণ করেন। বিসিএস বা ব্যাংকের চাকরি পেলেই তাঁরা শিক্ষকতা ছেড়ে দেন। ফলে প্রাথমিক শিক্ষা খাত একটি স্থায়ী মেধাবী জনবল তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি সব চাকরিতে পদোন্নতি থাকলেও প্রাথমিক সেক্টরে নেই কোনো পদোন্নতি। একজন শিক্ষক সহকারী শিক্ষক পদে প্রবেশ করে ২০-৩০ বছর সার্ভিস দিয়ে একই পদে থেকে অবসরে যাচ্ছেন।

প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন কেবল দালানকোঠা নির্মাণ বা নতুন বই ছাপানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এর জন্য প্রয়োজন মানুষ গড়ার কারিগরদের ভাগ্যোন্নয়ন। যোগ্যতা অনুযায়ী সহকারী শিক্ষকদের দশম গ্রেড বা দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা দেওয়া এখন সময়ের দাবি। এ ছাড়া ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং শিশুশুমারি ইত্যাদির মতো শিক্ষাবহির্ভূত কাজে শিক্ষকদের না জড়িয়ে কেবল পাঠদানে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা খাতের দুর্দশা থেকে উত্তরণ হওয়া সম্ভব।

শিক্ষাক্ষেত্রে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাইলে সবার আগে প্রাথমিক শিক্ষকদের সম্মানজনক জীবন ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন করে সেই শিক্ষক দিয়ে আলোকিত জাতি গঠন অসম্ভব। প্রাথমিক শিক্ষা হলো গাছের শিকড়ের মতো। শিকড়ে পানি না দিয়ে ডালপালার যত্ন করলে গাছ যেমন বাঁচে না, তেমনি শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়ন না করে শিক্ষার মানোন্নয়নও সম্ভব নয়।

আত্মবিনাশী উন্নয়নে হাওরের সর্বনাশ

মমতা কি সম্ভাবনা নাকি বিপদে রেখে গেলেন

মাদ্রাসায় যৌন সহিংসতা সিস্টেমের ব্যর্থতা: ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী

প্রাণ-প্রকৃতির প্রতিনিধি মায়েরা

ওপারে বিজেপির জয়ে এপারের ভাবনা

শিক্ষায় অশনিসংকেত

নীরবতার মূল্য: দেরিতে শনাক্ত হওয়া ওভারিয়ান ক্যানসার কীভাবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অনন্য স্কুল

হামে মৃত্যুর মিছিল আর কত দীর্ঘ হবে

ভারতে বাম রাজনীতি কি শেষ হওয়ার পথে