হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

একাত্তরে পত্রিকাগুলো কী লিখছিল

সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান যুক্তি দিয়ে ১৯৭১ ও ২০২৪-কে গুলিয়ে না ফেলার যে আহ্বান রাখলেন, সেখান থেকেই আসলে শুরু করতে হবে। এরপর ফ্ল্যাশব্যাকে গিয়ে দেখতে হবে, জামায়াতে ইসলামী দলটি তাদের ভুলগুলোকে স্বীকার করে কি না।

জাহীদ রেজা নূর  

এবারের জাতীয় সংসদে অভিনব নানা ঘটনা ঘটেছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর যে সংসদটি গঠিত হলো, তাকে ‘আমরা আর মামুরা’ ধরনের সংসদ কি না, তা নিয়ে মুখরোচক আলাপ-আলোচনা হচ্ছে এখন। কেউ কেউ বলছেন, মাঝে মাঝে মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে সংসদকে উত্তপ্ত করার বিষয়টি লোকদেখানো। আসলে সবকিছুই চলছে প্ল্যানমাফিক। ইউনূস সরকারের অভিপ্রায় কী ছিল, তা দিন দিন খোলাসা হচ্ছে। গণ-আন্দোলনের ফসল কারা ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিচ্ছে, তা নিয়েও ভাবছে জনগণ। আর এরই মধ্যে সংসদে হঠাৎ মুক্তিযুদ্ধ ঘিরে নানা হাস্যকর কথা শোনা গেল। জামায়াতে ইসলামীর একজন সংসদ সদস্য নিজেকে শিশু মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবিও করলেন।

বাংলাদেশের মানুষের বড় সৌভাগ্য হলো, একাত্তরের ইতিহাস এমনভাবে লিপিবদ্ধ করা আছে যে কেউ চাইলেই সেই ইতিহাস ধ্বংস করতে পারবে না। প্রতিদিনের পত্রিকায় যে সংবাদগুলো প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর দিকে চোখ বোলালে সে সময়ের ঘটনাগুলো খোলাসা হয়ে যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে অনেকেই খণ্ডিত ইতিহাসকে তুলে এনে কিংবা অসত্য ইতিহাসের বর্ণনা করে ‘জাতে’ উঠতে চান। কিন্তু সে চেষ্টা সফল হওয়ার নয়।

তরুণ প্রজন্ম যেন বিভ্রান্ত না হয়, সে জন্য সেই সময়টির সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা জরুরি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী অপারেশন সার্চলাইট নামে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। এরপর ৪ এপ্রিল পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি নূরুল আমিনের নেতৃত্বে ১২ জনের একটি দল ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক লে. জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শান্তি কমিটি গঠনের সূত্রপাত করে। তারা সামরিক কার্যক্রমকে সমর্থন করেছিল। দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তারা সামরিক আইন প্রশাসনকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছিল। টিক্কা খান দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের নাম দিয়েছিল ‘দুষ্কৃতকারী ও সমাজবিরোধী’। ৯ এপ্রিল ১৪০ সদস্যবিশিষ্ট ঢাকা নাগরিক শান্তি কমিটি গঠিত হয়।

উগ্র ধর্মান্ধদের প্রত্যক্ষ সহায়তা ও তত্ত্বাবধানে রাজাকার বাহিনী গড়ে উঠেছিল। ১৯৭১ সালের মে মাসে খুলনার আনসার ক্যাম্পে ৯৬ জন কর্মী নিয়ে প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনী রাজাকারদের কী কাজে লাগিয়েছিল? পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের চলাচল নির্বিঘ্ন করার জন্য, মুক্তিযোদ্ধাদের গতিবিধি ও চলাচলে নজর রাখার জন্য রাজাকার বাহিনীকে কাজে লাগায়। জামায়াত নেতা এ কে এম ইউসুফ রাজাকার বাহিনী গঠনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন। রাজাকার বাহিনী শান্তি কমিটির প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ও নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।

এপ্রিল মাস থেকে কাজ শুরু করলেও আলবদর বাহিনী পরিপূর্ণভাবে গড়ে ওঠে সেপ্টেম্বর মাসে। এই বাহিনী মুক্তিকামী বাঙালি, বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। আইনগত ভিত্তি ছাড়াই সশস্ত্র এই সংগঠনটি গড়ে ওঠে। গভর্নরের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী খানের নোটে আলবদরের সহায়তার কথা উল্লেখ রয়েছে। রাজাকার, আলবদর বাহিনী গঠনের পরপরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইসলামী ছাত্র সংঘের দখলে চলে যায় এবং এগুলো প্রশিক্ষণ ও নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

১৪ আগস্ট ছিল পাকিস্তানের ‘আজাদি দিবস’। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংঘ ব্যাপক কর্মসূচি পালন করেছিল। সভাপতির ভাষণে ছাত্র সংঘের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান কোনো ভূখণ্ডের নাম নয়, একটি আদর্শের নাম। এই ইসলামি আদর্শের প্রেরণাই পাকিস্তান সৃষ্টি করেছে এবং এই আদর্শই পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম। ইসলামপ্রিয় ছাত্রসমাজ বেঁচে থাকলে পাকিস্তানের অস্তিত্ব টিকে থাকবে।’ ২২ এপ্রিল পাকিস্তানি সৈন্যরা জামালপুর দখল করলে তৎকালীন মোমেনশাহী ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি মুহাম্মদ আশরাফ হোসেনের নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী গঠিত হয়। তবে ঢাকায় এ বাহিনী গঠন করার পর সামরিক জান্তারা এই বাহিনীর প্রতি কৃপা দৃষ্টি বর্ষণ করে। ইতিহাস বলছে, জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্র সংঘের বাছাই করা কর্মীরা ছিলেন আলবদর বাহিনীর সদস্য। এরা কেউই শিশু-তরুণ-যুবক বা বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি।

২. ‘পাকিস্তান জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়া’ ইসলামি একাডেমি হলে আজাদি দিবসের যে আলোচনা অনুষ্ঠান করেছিল, সে অনুষ্ঠানে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক গোলাম আযম বলেছিলেন, ‘কোনো দেশ তার নিজের দেশের লোকজনের দ্বারা শাসিত হলেই আজাদ হবে—সাধারণ আজাদির এই সংজ্ঞা ইসলাম স্বীকার করে না। বাংলাদেশ বাঙালিদের দ্বারা শাসিত হবে—এ মতবাদ শেখ মুজিব বা শ্রী তাজউদ্দীনের।’ (দৈনিক সংগ্রাম, ১৬ আগস্ট, ১৯৭১)

কার্জন হলের সিম্পোজিয়ামে অংশ নিয়ে অধ্যাপক গোলাম আযম বলেছিলেন, ‘১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের দুশমন ছিল বাইরের। তাই ভারতীয় হামলা থেকে দেশ রক্ষার জন্য জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে হামলা মোকাবিলার জন্য তৈরি ছিল। কিন্তু এবার পাকিস্তানের ভেতরে হাজারো দুশমন সৃষ্টি হয়েছে। তাই এবারের সংকট কঠিন। কারণ বাইরের দুশমনের চেয়ে ঘরে ঘরে যেসব দুশমন রয়েছে, তারা অনেক বেশি বিপদজনক।’ (দৈনিক আজাদ, ১৬ আগস্ট, ১৯৭১)। ওই ভাষণেই তিনি সেনাবাহিনী ও শান্তি কমিটির মধ্যে যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘শান্তি কমিটি যদি দুনিয়াকে জানিয়ে না দিত যে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ দেশকে অখণ্ড রাখতে চায়, তবে পরিস্থিতি হয়তো অন্যদিকে মোড় নিত।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গণে ইসলামী ছাত্র সংঘ আয়োজিত ছাত্র সমাবেশ নিয়ে ১৬ আগস্ট দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে লেখা হয়েছে, ‘নিখিল পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি জনাব মতিউর রহমান নিজামী বলেন, ইসলামী ছাত্র সংঘের কর্মীরা দেশের প্রতি ইঞ্চি পরিমাণ জমিন রক্ষা করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এমনকি তাহারা পাকিস্তানের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হিন্দুস্থানের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানিতে প্রস্তুত। তাহাদের এই সুযোগদানের জন্য তিনি আবেদন জানান। তিনি বলেন, আজ হইতে আমরা হিন্দুস্থানের অস্তিত্ব স্বীকার করিতে প্রস্তুত নহে। তিনি বলেন যে, পাকিস্তানের আদর্শের প্রশ্নে কোন আপোষ নাই।’

৩. ১৯৭১ সালের শুধু ১৬ আগস্ট প্রকাশিত কয়েকটি খবর এখানে তুলে ধরা হয়েছে। এই অল্প কয়েকটি খবরেই জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্র সংঘের অবস্থান পরিষ্কার হওয়া গেছে। প্রশ্ন হলো, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানকে সমর্থন করেছে বলেই কি জামায়াতে ইসলামীকে মানবতাবিরোধী দল বলা হচ্ছে? আরও সরল করে বললে বলতে হয়, জামায়াতে ইসলামী কি মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছিল? ওপরে তৎকালীন জামায়াত ও ছাত্র সংঘ নেতার ভাষণেই এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে। ১৯৭১ সালে সারা বাংলাদেশে চষে বেড়িয়ে এ কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করেছেন তাঁরা। এবং আলবদর বাহিনী রাও ফরমান আলীর সঙ্গে মিলে বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছিল। স্বাধীনতাবিরোধী যে অংশটি মানবহত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাদেরকেই মানবতাবিরোধী বলা হচ্ছে। আশা করি, তরুণ প্রজন্মকে সে কথা বুঝিয়ে বলতে হবে না।

সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান যুক্তি দিয়ে ১৯৭১ ও ২০২৪-কে গুলিয়ে না ফেলার যে আহ্বান রাখলেন, সেখান থেকেই আসলে শুরু করতে হবে। এরপর ফ্ল্যাশব্যাকে গিয়ে দেখতে হবে, জামায়াতে ইসলামী দলটি তাদের ভুলগুলোকে স্বীকার করে কি না। মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে তাদের রহস্যময় আচরণ বিষয়ে তরুণ প্রজন্ম কী ভাবছে, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আগামী দিনের ইতিহাস লিখবে তারাই। তাদের হাত ধরেই জাতি ঘুরে দাঁড়াবে।

৪. এই দেশ মূলত দ্বিদলীয় রাজনীতি দেখেই অভ্যস্ত। রাজনীতির মাঠে মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপিই পাকা খেলোয়াড়। বাকি সব দলই নড়বড়ে অবস্থানে রয়েছে। তাই নির্বাচনে এই দুই দলের লড়াই হলেই কেবল বোঝা যায়, বাকি দলগুলোর প্রতি জনসমর্থন কতটা। ইনক্লুসিভ নির্বাচনের নাম করে ইউনূস সরকার যেভাবে নির্বাচন করেছে, তাতে জাতি আরও বিভক্ত হয়ে গেছে। সেই জায়গা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে রাজনীতির মাঠে উদারতা দেখাতে হবে। গণতন্ত্রে সব দল নির্বাচনে অংশ নেবে, এটাই সংগত। সেই পরিবেশ তৈরি করা না হলে ‘নিষিদ্ধ’ করার রাজনীতির কোরবানি কে যে কখন হবে, তা বলা মুশকিল। আর এ ধরনের রহস্যময়তার আড়ালে শিশু মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা যে বাড়তে থাকবে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

লেখক: উপসম্পাদক, আজকের পত্রিকা

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রথম পরীক্ষা: পদ্মা চুক্তির নবায়ন

পৃথিবীটা কি সত্যিই বদলে গেছে

শুধু অর্থনীতিবাদী আন্দোলন করে শ্রমজীবীর মুক্তি নেই

শ্রমিকদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে

ইরান যুদ্ধ কি রাশিয়ার জন্য শাপে বর

মব সংঘটিত হওয়ার নানা পরিপ্রেক্ষিত

বন্দী বিশ্বশান্তি

বাঙালির বাঁচার উপায়

স্ক্রিনে নিমজ্জিত প্রজন্ম: বুদ্ধিবৃত্তিক রূপান্তর নাকি বিপর্যয়

পুলিশ বাহিনীকে ধ্বংস করা যাবে না