বর্তমান নির্বাচিত সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিকে বয়ে বেড়াচ্ছে কেন? চুক্তিটা যে মন্দ, আমাদের দেশের স্বার্থবিরোধী, সেই কথাগুলো পর্যন্ত বিএনপি সরকার উচ্চারণ করছে না কেন? এই যে এখন জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলছে, সেখানে এক দিনের জন্যও এই প্রসঙ্গটি উঠল না, আলোচনা হলো না! কেন?
গত দুই দিন ধরে আমি খুব সিরিয়াসলি যে কাজটি করার চেষ্টা করছি, সেটা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের দাম বিশ্লেষণ। এ ধরনের বিশ্লেষণ বছর কয়েক আগে আমার এক ব্যবসায়ী বন্ধুকে করতে দেখতাম। তিনি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নানা ধরনের কৃষিপণ্য রপ্তানি করতেন। সেখানকার কোন স্টেটে কোন পণ্যের কেমন দাম, সেটা দেখে সিদ্ধান্ত নিতেন। আমার অবশ্য সে রকম কোনো পরিকল্পনা নেই। আমি বরং উল্টা চিন্তা থেকে সেখানকার দাম দেখার চেষ্টা করছি। ভাবছি—ওখান থেকে যদি আলু, টমেটো, গাজর এসব আমরা আমদানি করি, আমি কিনতে পারব কি না।
এই দুই দিনে যেসব তথ্য ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করতে পারলাম, তা দেখে আমার মাথা ঘুরে গেল। যুক্তরাষ্ট্রের এক এক স্টেটে এই সব পণ্যের দামে বেশ পার্থক্য আছে। তারপরও গড় করলে যা দাঁড়ায় তা দেখে রীতিমতো হতবাক হয়ে গেলাম। ওদের হিসাব ডলারে, সেটাকে কেজিতে কনভার্ট করে দেখলাম—আলু প্রতি কেজির দাম ১.১০ ডলার থেকে ১.৫০ ডলার পর্যন্ত। অর্থাৎ আমাদের মুদ্রায় ১৩৪ টাকা থেকে ১৮০ টাকার মতো। টমেটো প্রতি কেজি ৫৩৪ টাকা (৪.৩৪ ডলার), গাজর ৩৬৩ টাকা (২.৯৫ ডলার), লাল বাঁধাকপি প্রতি কেজি ৩২৯ টাকা (২.৬৭ ডলার), পেঁয়াজ ১১৫ টাকা (০.৯৩ ডলার)! কিনতে পারব আমরা? ওরা কিনতে পারে, ওরা ডলারে আয় করে ডলারে ব্যয় করে। আমরা টাকায় আয় করে ওই দামে কীভাবে কিনব?
এসব হিসাব কিন্তু এমনি এমনি করছিলাম না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুল আলোচিত বাণিজ্য চুক্তির যে কিছু কিছু তথ্য বের হয়ে এসেছে, তা দেখেই এই কৌতূহল অনুভব করেছি। এরই মধ্যে এই চুক্তিকে ‘দেশবিরোধী এবং দাসত্বমূলক’ বলে দেশের অনেক অর্থনীতিবিদ আখ্যায়িত করেছেন। অনেকের মতে, দেশের দৃশ্যমান প্রধান সমস্যা যে জ্বালানি সংকট, তার চেয়েও ভয়াবহ এই গোলামি চুক্তি। এমনকি বহুল নিন্দিত ভারতের সঙ্গে ‘২৫ বছরের গোলামি চুক্তি’র চেয়েও এটা ভয়াবহ। এই চুক্তির একটা ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে প্রতিবছর ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হবে! এই কৃষিপণ্য আমদানি করে আমরা করবটা কী? কৃষিপণ্য বলতে আলু, গাজর, টমেটো, বাঁধাকপি, ব্রকলি—এসবই তো। সেগুলো ওখানকার দামে কিনে আমরা কী করব? কোথায় বেচব? আমাদের বাজারে আলু এখন ২৫ থেকে ৩০ টাকা। সেটা রেখে ১৫০ টাকায় আমেরিকান আলু কেউ কিনবে? কেন কিনবে? শুনি গুলশানের কিছু কিছু সুপার মার্কেটে নাকি বিদেশি কৃষিপণ্য পাওয়া যায়। সেখানে বিদেশি গাজর বিক্রি হয় হাজার টাকা কেজি দরে, এক কেজি অস্ট্রেলিয়ান বিফের দাম ৬ হাজার টাকার বেশি! হয়তো বিদেশি দূতাবাসের কেউ কেউ নিজেদের মতো করে সেসব কিনে থাকেন। কিন্তু সেই বাজারটা নিশ্চয়ই খুবই ছোট, হাতে গোনা যাবে। ৩৫০ কোটি ডলারে কত টাকা হয়? ৪৩ হাজার ১০৫ কোটি টাকার মতো। এত টাকার কৃষিপণ্য আমদানি করে আমরা তা নিয়ে কী করব? আমাদের কি অত দরকার আছে? অথবা সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশের কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যেরই বা কী হবে?
বাণিজ্য চুক্তিটি কতটা ভয়াবহ, কতটা গোলামি মনোভাবাপন্ন, সেটা বুঝতে খুব বেশি গভীরে যেতে হয় না। এই কদিন আগে একটা খবর বিভিন্ন মিডিয়াতে দেখা গেল—রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কিনতে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের আরও দুই মাসের জন্য অনুমতি দিয়েছে। খবরটা একটু ডিটেইলে পড়ে জানা গেল, এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ১২ মার্চ থেকে ৩০ দিনের জন্য আমাদের একটা অনুমতি দিয়েছিল। সেটার মেয়াদ শেষ হয় গেছে ১১ এপ্রিল। এরপর আবার ৬০ দিনের জন্য অনুমতি দিয়েছে। অর্থাৎ ৯ জুন পর্যন্ত আমরা রাশিয়া থেকে তেল কিনতে পারব। এরপর আবার কিনতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নতুন করে অনুমতি পেতে হবে। এমন একটা খবর কি আমাদের লজ্জিত করেনি? ক্রেতা বাংলাদেশ আর বিক্রেতা রাশিয়া, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি কেন লাগবে? এমন প্রশ্ন হয়তো আপনার মনেও জাগতে পারে। কিন্তু তার কোনো সদুত্তর আপনি কারও কাছ থেকেই পাবেন না। আপনি লজ্জিত হচ্ছেন, আমি লজ্জিত হচ্ছি, কিন্তু সরকার লজ্জিত হচ্ছে না। কারণ, তারা এমন একটা চুক্তিই তো করেছে।
এই চুক্তিটি হয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার অতি আগ্রহের সঙ্গে চুক্তিটি সম্পাদন করেছে। নির্বাচনের তিন দিন আগে, মানে চুক্তিটি করার সময়ই তারা জানত—এটি বাস্তবায়নের দায় তাদের নেই। নতুন যে সরকার আসবে, তাদের এই বিশাল সমস্যা বয়ে নিতে হবে। ড. ইউনূস সরকার এমন একটা অপকর্ম যে করেছে, সেটা নিয়ে আমার মধ্যে কোনো বিস্ময় নেই। তারা করতেই পারে। তারা তো ক্ষমতায় বসেই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সমুন্নত রাখার জন্য। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সেখানকার নাগরিকদের জিয়াফত করে নিয়ে এসেছিল এই জাতিকে রাষ্ট্র, শাসনপদ্ধতি, সংস্কার—এসব শেখানোর জন্য। কাজেই তারা এ কাজ করতেই পারে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান নির্বাচিত সরকার সেই গোলামি চুক্তিকে বয়ে বেড়াচ্ছে কেন? চুক্তিটা যে মন্দ, আমাদের দেশের স্বার্থবিরোধী, সেই কথাগুলো পর্যন্ত বিএনপি সরকার উচ্চারণ করছে না কেন? এই যে এখন জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলছে, সেখানে এক দিনের জন্যও এই প্রসঙ্গটি উঠল না, আলোচনা হলো না! কেন?
বিশাল বিজয়ের পর বিএনপি যখন তাদের ক্যাবিনেট গঠন করল, যে প্রশ্নটি সবার মনেই এসেছে—মন্ত্রিসভায় ড. খলিলুর রহমান কেন? কেন এমন একজন লোককে বিএনপি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বানাল? ড. খলিল ছিলেন ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা। সেই সঙ্গে ছিলেন রোহিঙ্গাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেনটেটিভ। ওই সরকারে থাকাকালীন তাঁর সাফল্যের দিকে তাকালে একটা বিশাল শূন্য ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। তারপরও এমন একজন লোককে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বসিয়ে দেওয়ার পেছনের কারণটি কী হতে পারে? সন্দেহ নেই এই বিষয়টি বিএনপি সরকারের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। এর আগে এ রকম নির্বাচন পরিচালনাকারী নির্দলীয় সরকারের কোনো উপদেষ্টাকে নির্বাচিত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানোর উদাহরণ নেই। এ রকম করলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। মানুষ মনে করতে পারে, এই উপদেষ্টা নির্বাচনের সময় ক্ষমতা খাটিয়ে বিজয়ী দলের পক্ষে ভূমিকা রেখেছেন। বিষয়টা বিএনপির নেতৃত্ব বোঝেন না, এমনটা আমি মনে করি না। সব জেনে-বুঝেই তারা খলিলকে আত্তীকরণ করেছে। কিন্তু কেন? কেন জেনেশুনে এই বিষ পান?
ঠিক এখানেই চলে আসে আমেরিকা কানেকশনের বিষয়টি। কেউ কেউ এখনে লন্ডন বৈঠকের বিষয়টিও উচ্চারণ করেন। আমি অত দূর যাচ্ছি না। তবে অন্য একটা সন্দেহ করতেই পারি। চুক্তিটা ছিল বাণিজ্য চুক্তি। সেখানে বাণিজ্য উপদেষ্টা থাকলেই হয়ে যায়। নিরাপত্তা উপদেষ্টার সেখানে কী কাজ? তারপরও তিনি ছিলেন। কেন ছিলেন? তাহলে কিন্তু শর্তগুলো এ রকমই ছিল—চুক্তি করো, চুক্তিটি যাতে ঠিকঠাকমতো বাস্তবায়িত হয় তার জন্য তোমাদের নতুন সরকারে আমাদের একজন লোককে রাখতে হবে। তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে দেখবেন আমাদের স্বার্থগুলো ঠিকঠাকমতো বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না। সংসদে এই চুক্তিটি নিয়ে কোনো আলোচনা না হওয়ার এটাই কি কারণ?
এখানে আর একটি বিষয় স্মরণ করা যেতে পারে। চুক্তিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ড. খলিল একবার মিডিয়াকে বলেছিলেন, চুক্তির শর্তগুলো নিয়ে নাকি বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে তাঁদের আগেই কথা হয়েছিল। ওনার এমন দাবির বিষয়ে বিএনপি একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। তাহলে কি তারা আগেই জানত? সে জন্যই তারা এত দিন ধরে নিশ্চুপ থাকছে? জামায়াতের আমির অবশ্য দাবি করেছে তাদের সঙ্গে এসব নিয়ে কোনোই কথা হয়নি। আমির ডা. শফিকের কথা সত্য হলে ভাবতে হবে ড. খলিল মিথ্যা বলেছেন। কিন্তু তখন আবার প্রশ্ন জাগে, জামায়াত তাহলে বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে কোনো প্রশ্ন করছে না কেন? আলোচিত এই চুক্তির মধ্যে এটি কীভাবে বাতিল করার যাবে, সেটাও বলে দেওয়া আছে। সেই পথেই বা কেউ হাঁটছে না কেন? তাহলে কি গোলামিই আমাদের পছন্দ?
ঠিক এ জন্যই এই বাণিজ্য চুক্তিটি করার সময় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হয়েও চুক্তি সম্পাদনের সময় ড. খলিল যুক্তরাষ্ট্রে হাজির ছিলেন।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক