হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

অভ্যন্তরীণ উপাচার্য নিয়োগ কেন দরকার

ড. মো. শফিকুল ইসলাম

ড. মো. শফিকুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ভবন, বিভাগ, পরীক্ষা কিংবা প্রশাসনিক দপ্তরের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি চিন্তাশীল সমাজ, যেখানে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, নেতৃত্ব, মানবিক মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন একসঙ্গে বিকশিত হয়। আর এই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থাকেন উপাচার্য। তাই উপাচার্য পদটি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক পদ নয়; এটি একদিকে একাডেমিক নেতৃত্বের প্রতীক, অন্যদিকে নৈতিকতা, দূরদর্শিতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও মানবিক বিচক্ষণতার সম্মিলিত পরীক্ষা। একটি বিশ্ববিদ্যালয় এগোবে নাকি স্থবির হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে উপাচার্যের চিন্তা, সিদ্ধান্ত, সততা ও নেতৃত্বের ওপর।

এই প্রেক্ষাপটে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যন্তরীণ অধ্যাপকের মধ্য থেকে উপাচার্য নিয়োগের দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়োপযোগী। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্টদের বড় একটি অংশ মনে করেন, নিজ প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা, ইতিহাস, সংকট, সম্ভাবনা ও সাংগঠনিক সংস্কৃতি সবচেয়ে ভালো জানেন সেই প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শিক্ষকেরা। বাইরের একজন উপাচার্য নিঃসন্দেহে যোগ্য হতে পারেন; কিন্তু নতুন পরিবেশ, প্রশাসনিক কাঠামো, স্থানীয় সমস্যা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, কর্মচারী ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক বাস্তবতা বুঝতে তাঁর অনেক সময় লেগে যায়। এই সময়ের মধ্যেই প্রশাসনিক দূরত্ব, ভুল-বোঝাবুঝি ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর প্রভাব তৈরির ঝুঁকি বাড়ে।

আশির দশকের সূচনা পর্ব পেরিয়ে ২০০১ সালের ১২ জুলাই এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এই দীর্ঘ পথচলায় বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, দক্ষিণাঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠানে উপাচার্য হিসেবে এমন একজন ব্যক্তিকে প্রয়োজন, যিনি শুধু প্রশাসনিকভাবে দক্ষ নন, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটি, মানুষ, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনাকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন।

অভ্যন্তরীণ উপাচার্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পরিচিতি ও দায়বদ্ধতা। তিনি জানেন কোন বিভাগে কী সমস্যা, কোন গবেষণাগারে কী ঘাটতি, কোন অনুষদে কী সম্ভাবনা, শিক্ষার্থীদের প্রধান সংকট কোথায়, প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা কী এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের বাস্তব চিত্র কেমন। একজন অভ্যন্তরীণ অধ্যাপক দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাঁর প্রতি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাভাবিক আস্থা তৈরি হয়। এই আস্থা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আইনগত ক্ষমতা দিয়ে প্রশাসন চালানো যায়, কিন্তু আস্থা ছাড়া নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আমাদের আরও একবার ভাবতে বাধ্য করছে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যকে ঘিরে আন্দোলন, পরীক্ষা বর্জন, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত অবস্থান প্রমাণ করে যে উপাচার্য নিয়োগ শুধু একটি প্রজ্ঞাপনের বিষয় নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন শত শত শিক্ষার্থী পরীক্ষা বর্জন করে আন্দোলনে যুক্ত হয়, যখন শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে একসঙ্গে দাঁড়ান, তখন বুঝতে হবে নেতৃত্বের সংকট শুধু ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক।

এ ধরনের সংকট শুধু পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতাও আমাদের সামনে সতর্কবার্তা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। গত ১৫ বছরে সেখানে আটজন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে চারজনই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তন, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং ধারাবাহিক পরিকল্পনার অভাব শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মনে রাখা উচিত—একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কোনো স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প নয়; এর জন্য দরকার ধারাবাহিক নেতৃত্ব, দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক পরিকল্পনা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।

ডুয়েটের সাম্প্রতিক ঘটনাও একই বাস্তবতাকে সামনে আনে। একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের একাংশ আন্দোলনে নেমেছেন। তাঁদের যুক্তি হলো, বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তা, গবেষণার চরিত্র এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বুঝতে হলে সেই প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের মধ্য থেকেই উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া অধিকতর যুক্তিযুক্ত। এই দাবি আবেগনির্ভর নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার দাবি।

তবে অভ্যন্তরীণ উপাচার্য নিয়োগ মানে যেকোনো অভ্যন্তরীণ শিক্ষককে নিয়োগ দিতে হবে। এখানে যোগ্যতা, সততা, গবেষণা-অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং নৈতিক অবস্থান—সবকিছু গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে। একজন উপাচার্যকে শুধু ভালো শিক্ষক হলেই চলবে না; তাঁকে হতে হবে সৎ, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, গবেষণামনস্ক, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহসী এবং সকল পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে চলার মতো উদার নেতৃত্বের অধিকারী। তাঁর আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, শিক্ষক সমাজে গ্রহণযোগ্যতা, শিক্ষার্থীদের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা জরুরি।

উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সততা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হওয়া উচিত। একাডেমিক যোগ্যতা অনেকের থাকতে পারে, বিদেশি ডিগ্রিও থাকতে পারে, উচ্চমানের প্রকাশনাও থাকতে পারে; কিন্তু সততা, আত্মসম্মান ও নৈতিক সাহস না থাকলে সেই যোগ্যতা প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে ব্যবহৃত হয় না। একজন অসৎ বা দুর্বল নৈতিকতার উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়কে দল-উপদলে বিভক্ত করতে পারেন, বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে পারেন, প্রশাসনকে পক্ষপাতদুষ্ট করতে পারেন এবং শিক্ষার পরিবেশকে নষ্ট করতে পারেন। অন্যদিকে একজন সৎ উপাচার্য সীমিত সম্পদ নিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে পারেন।

অভ্যন্তরীণ উপাচার্যের আরেকটি বড় দিক হলো তাঁর ভবিষ্যৎ জবাবদিহি। তিনি যদি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন, তাহলে মেয়াদ শেষে তাঁকে আবার সেই ক্যাম্পাসেই ফিরে আসতে হবে, সহকর্মীদের সামনে দাঁড়াতে হবে, শিক্ষার্থীদের চোখের দিকে তাকাতে হবে। এই নৈতিক জবাবদিহি অনেক সময় আনুষ্ঠানিক জবাবদিহির চেয়ে শক্তিশালী। বাইরে থেকে আসা কোনো উপাচার্য অনেক সময় চার বছরের দায়িত্বকে অস্থায়ী অধ্যায় হিসেবে দেখেন; কিন্তু অভ্যন্তরীণ উপাচার্যের কাছে প্রতিষ্ঠানটি নিজের ঘর, নিজের পরিচয়, নিজের উত্তরাধিকার।

বর্তমানে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে আগের এককেন্দ্রিক প্রবণতা কিছুটা পরিবর্তিত হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নিয়োগের বাইরে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন। এই পরিবর্তন ইতিবাচক হতে পারে, যদি তা সত্যিকার যোগ্যতা, সততা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রথমে একজন শিক্ষক, তারপর প্রশাসক। তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকা উচিত শিক্ষার্থী, গবেষণা, একাডেমিক মান, প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার। ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন একজন অভ্যন্তরীণ অধ্যাপককে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উচিত, যিনি সৎ, দক্ষ, গবেষণামনস্ক, প্রশাসনিকভাবে অভিজ্ঞ এবং গ্রহণযোগ্য।

বাংলাদেশের অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ

একজন প্রকৃত মানুষ

কৃষক কেন এখনো মহাজননির্ভর

দেশের চামড়াশিল্পে সম্ভাবনা ও সংকট

পরিকল্পনা কঠিন, বাস্তবায়ন আরও কঠিন

বাজেট হোক পরিবর্তনের দলিল

ধর্মীয় অনুশাসন থেকে জনকল্যাণের রাজনীতি

সুবিধাবঞ্চিতদের পুষ্টির উৎসব হোক কোরবানি

বদলে যাওয়া কোরবানির অর্থনীতির গল্প

দঙ্গলবাজির ব্যাক ফায়ার না ফ্রেন্ডলি ফায়ার