হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা

ড. মো. শফিকুল ইসলাম

বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় জ্ঞান সৃষ্টি, মুক্তচিন্তা ও জাতীয় উন্নয়নের প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার বর্তমান চিত্র দেখলে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞান উৎপাদনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি শুধু ডিগ্রি প্রদানের কারখানায় পরিণত করেছি? দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৭১টি। এর মধ্যে ১৬৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চলমান। সংখ্যা হিসেবে এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু গবেষণা ব্যয়ের পরিসংখ্যান দেখলে এই অর্জনের ভেতরেই লুকিয়ে থাকা গভীর সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৩২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ব্যয় বছরে ২ কোটি টাকার নিচে। অর্থাৎ মোট ১৭১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৭৭ শতাংশই গবেষণায় ন্যূনতম শক্তিশালী বিনিয়োগ করতে পারছে না। আর কার্যক্রম চলমান ১৬৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে এই হার দাঁড়ায় প্রায় ৮১ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের প্রতি পাঁচটি কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চারটিই গবেষণা ব্যয়ে দুর্বল। এই পরিসংখ্যান শুধু অর্থের ঘাটতির কথা বলে না; এটি আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রাধিকার সংকটকেও সামনে আনে।

২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ৫৩টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় মোট ১২০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। অর্থাৎ প্রতি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গড় গবেষণা ব্যয় প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে বেসরকারি ১১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট গবেষণা ব্যয় ১৬৬ কোটি টাকা; গড় হিসাবে প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১ কোটি ৫১ লাখ টাকা। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট গবেষণা ব্যয় দাঁড়ায় ২৮৬ কোটি টাকা। কার্যক্রম চলমান ১৬৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের গড় গবেষণা ব্যয় মাত্র প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে বিশ্বমানের গবেষণা করার জন্য অবকাঠামো, ল্যাব, মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা সহকারী, সফটওয়্যার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও প্রকাশনা ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব।

গবেষণা ব্যয়ের আরেকটি বড় সমস্যা হলো এর অসম বণ্টন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শীর্ষ ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে গবেষণায় ব্যয় করেছে প্রায় ৭৩ কোটি টাকা, যা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট গবেষণা ব্যয়ের প্রায় ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ বাকি ৪৩টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে ব্যয় করেছে মাত্র ৩৯ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, গবেষণা কার্যক্রম কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংস্কৃতির মূলধারায় প্রবেশ করতে পারছে না।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈষম্য বিদ্যমান, বরং অনেক ক্ষেত্রে সংকট আরও প্রকট। ২০২৩ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট গবেষণা ব্যয় ছিল ১৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় একাই ব্যয় করেছে প্রায় ৬৪ কোটি টাকা, যা মোট বেসরকারি গবেষণা ব্যয়ের প্রায় ৩৯ শতাংশ। শীর্ষ তিনটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে ব্যয় করেছে প্রায় ১০৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৪ শতাংশ। আবার শীর্ষ আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ব্যয় প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা, যা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট গবেষণা ব্যয়ের প্রায় ৮৮ শতাংশ। অর্থাৎ বাকি শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ব্যয় অত্যন্ত সীমিত।

আরও উদ্বেগজনক হলো, ২০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় এক টাকাও ব্যয় করেনি। এটি ১১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৮ শতাংশ। ১ থেকে ৫ লাখ টাকার মধ্যে ব্যয় করেছে ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়, আর ৫ লাখের বেশি থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেছে আটটি বিশ্ববিদ্যালয়। অর্থাৎ ৫২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেছে বা কোনো ব্যয়ই করেনি। শতকরা হিসাবে এটি প্রায় ৪৭ শতাংশ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি বছরে ১০ লাখ টাকাও গবেষণায় ব্যয় না করে, তবে সেখানে গবেষণা সংস্কৃতি কীভাবে গড়ে উঠবে? এ প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগ নেই।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মিলিত গবেষণা ব্যয় যেখানে ২৮৬ কোটি টাকা, সেখানে ভারতের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স একাই বছরে গবেষণায় ব্যয় করে প্রায় ১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ভারতের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মিলিত গবেষণা ব্যয়ের প্রায় সাড়ে চার গুণ ব্যয় করে। আবার আইআইটি দিল্লির গবেষণা ব্যয় ৯০০ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের মোট বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ব্যয়ের তিন গুণের বেশি। এই তুলনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে হলে গবেষণায় অর্থ বরাদ্দের কোনো বিকল্প নেই।

দেশের শীর্ষ গবেষণা ব্যয়কারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৩ সালে গবেষণায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। কিন্তু এই পরিমাণ অর্থও ভারতীয় গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় খুবই সামান্য। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের ১ হাজার ২৯০ কোটি টাকার তুলনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ কোটি টাকা প্রায় ৮৬ গুণ কম। একইভাবে আইআইটি দিল্লির ৯০০ কোটি টাকার তুলনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ব্যয় ৬০ গুণ কম। ফলে আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিং, পেটেন্ট, উদ্ভাবন ও উচ্চমানের গবেষণা প্রকাশনায় আমাদের পিছিয়ে থাকা অস্বাভাবিক নয়।

তবে গবেষণা ব্যয়ের পরিমাণই একমাত্র বিষয় নয়; গবেষণার গুণগত মান এবং সামাজিক প্রভাবও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, গবেষণা হচ্ছে, কিন্তু তা মানুষের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত নয়। কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, উপকূলীয় দুর্যোগ, নগর বর্জ্য, স্বাস্থ্যঝুঁকি, বেকারত্ব, খাদ্যনিরাপত্তা, নদীভাঙন কিংবা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মতো জাতীয় সমস্যাগুলো নিয়ে পর্যাপ্ত প্রভাবশালী গবেষণা হচ্ছে না। অনেক গবেষণা কেবল পদোন্নতি, বায়োডাটা সমৃদ্ধ করা বা জার্নালে প্রকাশের সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে গবেষণাপত্র থাকে, কিন্তু সমাজে তার প্রভাব থাকে না।

তবু আশার জায়গা আছে। বাংলাদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও গবেষক বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, সুযোগ ও অর্থায়ন পেলে বাংলাদেশের গবেষকেরা বিশ্বমানের কাজ করতে সক্ষম। সমস্যা মেধার অভাব নয়; সমস্যা হলো গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত পরিবেশ, অর্থায়ন, জবাবদিহি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব।

এখন প্রয়োজন গবেষণাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় অ্যাজেন্ডা হিসেবে বিবেচনা করা। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে উচ্চশিক্ষার মান বাড়ানো যায় না। গবেষণা অনুদান বাড়াতে হবে, প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়ন চালু করতে হবে, সরকারি-বেসরকারি বিভাজন না করে যোগ্য গবেষক ও কার্যকর প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণার মান যাচাই, অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার, চৌর্যবৃত্তি প্রতিরোধ এবং গবেষণার সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।

যে দেশে গবেষণায় বিনিয়োগ কম, সে দেশ দীর্ঘ মেয়াদে অন্যের প্রযুক্তি, অন্যের জ্ঞান ও অন্যের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তাই বাংলাদেশ যদি সত্যিই জ্ঞানভিত্তিক, উদ্ভাবনী ও আত্মনির্ভর রাষ্ট্র হতে চায়, তবে গবেষণাকে আর প্রান্তিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

রাজপথের শৃঙ্খলা: জরুরি বিবেচনা

রাষ্ট্র কি মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে পারছে না

স্মৃতিতে শফী আহমেদ

সাংস্কৃতিক শিক্ষার গুরুত্ব এবং মন্ত্রিসভার অসম্মতি

ট্রাম্পের শুল্ক কৌশল ধাক্কা খেলেও বাংলাদেশের ওপর চাপ কমেনি

ইরান ‍চুক্তি কি সত্যিই স্বস্তি দিতে পারবে

আদালতে ট্রাম্পের শুল্ক কৌশল ধাক্কা খেলেও বাংলাদেশের ওপর চাপ কমেনি

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বিলম্বিত উত্তরণ: করণীয় কী

৪০ কিলোমিটারের রেলপথ, হাজার কোটি টাকার সম্ভাবনা

নিউমুরিং কি ভাগাভাগির ফেরে পড়ে গেল