হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

শিক্ষায় দুর্নীতি দমনে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত

বিমল সরকার

শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতি দমন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। ছবি: আজকের পত্রিকা

শিক্ষা তো বটেই; বিভিন্ন ক্ষেত্রে মাত্রাভেদে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অব্যবস্থা আগেও ছিল। তবে এসবের শাখা-প্রশাখা ও ডালপালা আজকালকার মতো এত সুবিস্তৃত ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের মানবতাবাদী নেতা মার্টিন লুথার কিং বলেছেন, ‘কোথাও অবিচার হলে তা সবখানের ন্যায়বিচারকে হুমকির মধ্যে ফেলে।’ গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতে, ‘ন্যায়বিচারের মধ্যেই সমাজের সুস্থিতি নির্ভরশীল।’

‘চেইন অব কমান্ড’ হলো কোনো প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা সংগঠনের উচ্চপর্যায় থেকে নিম্নপর্যায় পর্যন্ত কর্তৃত্ব এবং আদেশের একটি ধারাবাহিক ক্রম বা স্তরবিন্যাস, যার মাধ্যমে নির্দেশ ওপর থেকে নিচে নেমে আসে এবং জবাবদিহি নিচ থেকে ওপরে যায়। এটি কার অধীনে কে কাজ করবে, কার কাছ থেকে নির্দেশ আসবে এবং কাকে রিপোর্ট করতে হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেয়, যা কাজের দক্ষতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখে। রাষ্ট্র হলো সমাজের খুব গুরুত্বপূর্ণ বড় রাজনৈতিক সংগঠন। চেইন অব কমান্ড রাষ্ট্রপরিচালনার মূল ভিত্তি। কখনো কোনো কারণে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হলে সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হয়। সঠিক সময়ে গৃহীত সঠিক সিদ্ধান্ত ও কর্ম রাষ্ট্রনায়কদের যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখে।

সময় ও স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না, আপন গতিতে বয়ে চলে নিরবধি। কখনো কখনো এমন ঘটনা সংঘটিত হয়, যা মানুষের মনে দারুণ রেখাপাত করে এবং ভবিষ্যতের জন্য অনুসরণীয় উদাহরণ হয়ে থাকে। এমনই একটি ঘটনার কথা আজ মনে পড়ছে। ঘটনাটি খুবই চাঞ্চল্যকর। দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর আগে দেশব্যাপী বেশ তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল আলোচ্য এ ঘটনাটি।

১৯৭৬ সাল। তখন দেশে চারটি মাত্র শিক্ষা বোর্ড। সংবাদপত্রে খবর বের হয়, ঢাকার বাইরের একটি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান দায়িত্বরত অবস্থায় অত্যন্ত ‘গর্হিত পন্থায়’ তাঁর ছেলের এইচএসসি পরীক্ষার (১৯৭৬) ফল পরিবর্তনের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিভাগের স্থলে প্রথম বিভাগ ঘোষণা করেন। এ-টেবিল থেকে সে-টেবিল, এ-বিভাগ থেকে সে-বিভাগ, মন্ত্রণালয়—এভাবে জানাজানি হতে হতে একটি পর্যায়ে খোদ রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়ে পৌঁছে যায় খবরটি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এ তেমন আর কী; বোর্ডের ব্যাপার, অতএব যা করার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ই করবে, চূড়ান্ত ফয়সালা দেবে। এ সময় অধ্যাপক আবুল ফজল শিক্ষামন্ত্রী (১৯৭৫-১৯৭৭)। কিন্তু না, ঘটনার আদ্যোপান্ত অবহিত হওয়ার পর বেশ গুরুত্ব দেন এবং সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি এর রহস্য উদ্‌ঘাটন ও জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হন।

রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৯৭৬ সালের ৫ নভেম্বর সংস্থাপন বিভাগের জনৈক উপসচিবকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট ‘শিক্ষা বোর্ড তদন্ত কমিটি’ গঠন করে। তদন্ত কমিটিকে অভিযুক্ত বোর্ডের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কতিপয় অভিযোগ, এর মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবৈধভাবে নম্বর পরিবর্তনের মাধ্যমে অনুত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ ঘোষণা এবং নিম্নতর বিভাগে উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীকে উচ্চতর বিভাগে উত্তীর্ণ ঘোষণা ইত্যাদি সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়।

তদন্ত কমিটি দাখিল করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, জনৈক পরীক্ষার্থী তার আবেদনে (নাম, রোল নম্বর, পিতার নাম, পরিচয় উল্লেখসহ) প্রথমে দ্বিতীয় বিভাগে পাস করে এবং তার বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রের খাতা পুনর্নিরীক্ষার আবেদন করে। ওর বাংলা প্রথম পত্রের খাতাটি প্রথমে পরীক্ষা করেন মজিবুর রহমান মহিলা কলেজের অধ্যাপক নার্গিস বেগম এবং তাতে তিনি নম্বর দেন ৪৩। রাজশাহী কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল লতিফ চৌধুরীকে

দুই পত্রেরই (১ম ও ২য়) পুনর্নিরীক্ষক নিযুক্ত করা হয়। তিনি নির্দেশনা অনুযায়ী পুনর্নিরীক্ষা না করে ‘পুনঃপরীক্ষা’ করে বাংলা প্রথম পত্রে প্রাপ্ত মোটের ওপর সাড়ে ৭ নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেন। কিন্তু এই সুপারিশে কোন প্রশ্নের উত্তরে কত নম্বর বাড়ানো যায়, এর কোনো উল্লেখ ছিল না। লতিফ চৌধুরী অবশ্য তদন্ত কমিটির কাছে স্বীকার করেন যে তিনি খাতা পুনর্নিরীক্ষার পরিবর্তে পুনঃপরীক্ষা করেছেন।

শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদাধিকারবলে পরীক্ষা কমিটিরও চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি ওই সুপারিশ গ্রহণ করেন এবং উল্লিখিত পরীক্ষার্থীর (তাঁর ছেলে) ফলে বাংলা প্রথম পত্রে ৭ নম্বর যোগ করে ৫০ করে তাঁকে প্রথম বিভাগে পাস দেখিয়ে পুনর্বিজ্ঞপ্তি জারি করেন।

স্মরণযোগ্য যে পুনঃপরীক্ষার আগে ওই পরীক্ষার্থী দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেছিলেন। তদন্ত কমিটি বোর্ডের চেয়ারম্যানের এহেন কর্মটিকে অত্যন্ত গর্হিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও সুপারিশ করে। এ ছাড়া পুনঃপরীক্ষক আব্দুল লতিফ চৌধুরীকে ভবিষ্যতে যাতে পরীক্ষার কাজে নিযুক্ত করা না হয়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি।

ঘটনাটি তখন এমনই চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং প্রচারমাধ্যমে গুরুত্ব পায় যে একটি জাতীয় দৈনিকে পাঁচ কিস্তিতে (১৭ থেকে ২১ মার্চ, ১৯৭৯) তদন্ত কমিটির দীর্ঘ সুপারিশটি ছাপা হয়। সে সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী (১৯৭৮-১৯৭৯) আব্দুল বাতেন।

দেশে এ ধরনের দুর্নীতির মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বলতে গেলে নেই এর কোনো প্রতিকার-প্রতিবিধান।

যাঁদের ওপর প্রতিকারের দায়িত্ব অর্পিত, অনেকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা নিজেরাই জড়িয়ে পড়েন দুর্নীতিতে। শর্ষের মধ্যে ভূতের অবস্থান থাকলে এমন ভূত তাড়ানোর আর উপায় কী কিংবা সাধ্য কার? দুর্নীতিসহ নানাবিধ অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত একটি দেশ। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন গঠিত বর্তমান বিএনপি সরকারের কাছে অধিকতর ভালো ও ভিন্ন কিছু আমরা আশা করি।

বিমল সরকার, কলাম লেখক ও অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক

তাহলে গোলামিই আমাদের পছন্দ!

বিজেপি বাংলা ভাষা ও বাঙালি পরিচয়কেই ভাগ করতে চায়: স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য

পয়লা বৈশাখ: সংকোচনের বিপরীতে অসংকোচের শক্তি

বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নই অধিক জরুরি

হরমুজ সংকটে আমাদের করণীয়

পয়লা বৈশাখ ও কৃষক কার্ড

আইএমএফের সতর্কতায় কতটা ভয় পাওয়া উচিত

নেপালের জেন-জি আন্দোলন পরবর্তী: নির্বাচিত সরকারের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ছায়ানটের বর্ষবরণ: বাঙালির প্রতিবাদ ও প্রাণের স্পন্দন

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সামাজিক উৎসব: পাহাড়ি সংস্কৃতির অনন্য রূপ