হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মিয়ানমারে কেন থামছে না জটিল সংঘাত

আব্দুর রহমান

২০১৭ সালে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

মিয়ানমারের বর্তমান সংকটকে কেবল গৃহযুদ্ধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলে এর প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে না। এটি বিশ্বের সবচেয়ে জটিল, দীর্ঘস্থায়ী এবং বহুমাত্রিক সংঘাতগুলোর একটি, যেখানে একই সময়ে সামরিক জান্তা, গণতন্ত্রপন্থী প্রতিরোধ বাহিনী, বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন, আন্তর্জাতিক শক্তি, অস্ত্র ব্যবসায়ী, মাদক কারবারি চক্র এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে রাষ্ট্রের অর্থনীতি, প্রশাসন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা এবং সামাজিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির হিসাবে, অভ্যুত্থানের পর থেকে ১ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং বর্তমানে দেশজুড়ে ১২০০টির বেশি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয়। এ কারণেই সংস্থাটি মিয়ানমারকে বিশ্বের সবচেয়ে খণ্ডিত সংঘাতের ক্ষেত্র এবং সবচেয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করে।

মিয়ানমারের বর্তমান সংকটের শিকড় ২০২১ সালের অভ্যুত্থানেরও অনেক আগে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই কেন্দ্রের বামার নেতৃত্ব ও বিভিন্ন জাতিগত জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইনের সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নেয়, আর কাচিন, কারেন, শান, চিন, রাখাইনসহ বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার দাবিতে দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে।

১৯৯০ সালের নির্বাচনে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন এনএলডি জয়ী হলেও সামরিক জান্তা ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। পরে ২০০৮ সালের সংবিধানের মাধ্যমে সংসদের ২৫ শতাংশ আসন, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও সংবিধান সংশোধনের ওপর ভেটো ক্ষমতা নিজেদের হাতে রেখে তারা ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করে। এরপর ২০১১ সাল থেকে রাজনৈতিক সংস্কার শুরু হলে অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। এই সময়ে এনএলডি ২০১৫ ও ২০২০ সালের নির্বাচনে জয়ী হয় এবং অং সান সু চি স্টেট কাউন্সিলর হিসেবে কার্যত দেশের নেতৃত্ব দেন।

তবে ২০১৬-১৭ সালে রাখাইনে রোহিঙ্গা সংকটে সেনাবাহিনীর অভিযানে অন্তত ৬৭০০ মানুষ নিহত হয় এবং ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। সেনাবাহিনীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সু চি পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থনের বড় অংশ হারান।

২০২০ সালের নির্বাচনে এনএলডির আরেকটি নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সেনাবাহিনী ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা দখল করে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের পর আন্দোলন সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নেয়। ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি), পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ) এবং বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন জান্তার বিরুদ্ধে যৌথ লড়াই শুরু করে।

২০২৩ সালের ‘অপারেশন ১০২৭ ’-এ থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স শতাধিক সামরিক ঘাঁটি এবং বাণিজ্যিক শহর লাশিও দখল করে এবং ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ প্রতিরোধ বাহিনী দেশের প্রায় অর্ধেক এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মান্দালয়ের ১৪ মাইলের মধ্যে পৌঁছে যায়। কিন্তু বেলারুশের রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা, রাশিয়ার হেলিকপ্টার, ইরানের জ্বালানি এবং চীনের প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের সহায়তায় জান্তা ২০২৫-২৬ সালে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে লাশিও ও চীনমুখী গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক পুনর্দখল করে এবং একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাধ্যমে মিন অং হ্লাইংকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

তবে মিয়ানমারের সংঘাত এত দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে শুধু বিদেশি সহায়তাই দায়ী নয়। এর পেছনে রয়েছে অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত কারণ। প্রথমত, জান্তা বাহিনীর সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। তারা অনেক এলাকা হারালেও বড় শহর, প্রধান যোগাযোগপথ, বিমানবাহিনী এবং ভারী অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ এখনো ধরে রেখেছে। সীমান্ত অঞ্চলে বিদ্রোহীরা অগ্রগতি অর্জন করলেও জান্তা এখনো আকাশপথ এবং দূরপাল্লার কামানের মাধ্যমে পাল্টা হামলা চালাতে সক্ষম। ফলে বিদ্রোহীরা নির্দিষ্ট এলাকা দখল করলেও যুদ্ধের চূড়ান্ত ফল নির্ধারিত হচ্ছে না।

দ্বিতীয়ত, জান্তা বাহিনী কৌশলগতভাবে নিজেদের যুদ্ধপদ্ধতি পরিবর্তন করেছে। ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর তারা বিমান হামলা, ভারী গোলাবর্ষণ, জোরপূর্বক সেনা নিয়োগ এবং বেসামরিক সহায়তা নেটওয়ার্ক ধ্বংসের ওপর জোর দেয়। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জান্তা বাহিনীর বিস্ফোরক অস্ত্রের ব্যবহার ১১৪ শতাংশ বেড়েছে। এই কৌশল যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার পরিবর্তে সমাজকে আরও ভেঙে দেয় এবং সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।

তৃতীয়ত, বিদ্রোহী পক্ষের মধ্যে কোনো একক নেতৃত্ব বা অভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্য নেই। বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের যুদ্ধকে কেবল ‘জান্তা বনাম বাকি সবাই’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। বাস্তবে এটি অনেকাংশে ‘অনেকের বিরুদ্ধে অনেকের’ সংঘাত। কারণ ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট, পিডিএফ এবং বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনের চূড়ান্ত লক্ষ্য এক নয়। কেউ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পুনর্গঠন চায়, কেউ ফেডারেল স্বায়ত্তশাসন চায়, আবার কেউ নিজ নিজ অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে চায়। এই লক্ষ্যগত বিভাজন স্থানীয় পর্যায়ে সামরিক সাফল্য এনে দিলেও একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় বিকল্প সরকার গঠনকে কঠিন করে তুলেছে।

সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বাইরের শক্তিগুলোর দ্বৈত অবস্থান। প্রতিবেশী দেশগুলো জান্তার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে, কারণ তারা পুরো ব্যবস্থার পতনের ঝুঁকি নিতে চায় না এবং নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। একই সঙ্গে যুদ্ধ ও শান্তি উভয় পরিস্থিতিতেই মিয়ানমারের জান্তা সরকার ক্রমেই চীন ও রাশিয়ার ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এই নির্ভরতা জান্তাকে সামরিক সহায়তার পাশাপাশি কূটনৈতিক অক্সিজেনও জোগাচ্ছে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে চাপ বাড়লেও শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে না।

রাজনৈতিক সমাধানও একইভাবে অচলাবস্থায় রয়েছে। এর প্রধান কারণ পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে মৌলিক মতপার্থক্য। সেনাবাহিনী প্রথমে বিদ্রোহীদের নিরস্ত্রীকরণ চায়, আর বিদ্রোহীরা চায় আগে ফেডারেল কাঠামোর ভিত্তিতে রাষ্ট্র পুনর্গঠন নিশ্চিত হোক। এই অবস্থানগত ব্যবধান এতটাই গভীর যে সামরিক সাফল্যও রাজনৈতিক সমঝোতায় রূপ নিতে পারছে না। সর্বশেষ পর্যবেক্ষণগুলোও দেখাচ্ছে, সংঘাতের ফ্রন্টলাইন ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা আরও দূরে সরে যাচ্ছে।

এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। ২০২১ সালের পর মিয়ানমারের জিডিপি প্রায় ১৮ শতাংশ সংকুচিত হয় এবং অর্থনীতি আর উল্লেখযোগ্যভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ২০২৩ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৪৯.৭ শতাংশে পৌঁছে এক দশকের উন্নয়ন কার্যত মুছে যায়। প্রায় ১ কোটি ৫২ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, রাখাইন দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে, ৩৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং অভ্যুত্থানের পর থেকে ৩৩০টির বেশি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধ অর্থনীতিও নজিরবিহীনভাবে বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৩ সালে মিয়ানমার আফগানিস্তানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম আফিম উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়। দেশটিতে প্রায় ১ হাজার ৮০ টন আফিম উৎপাদিত হয়, যার সম্ভাব্য মূল্য ২.৪ বিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে এটি বিশ্বের বৃহত্তম মেথঅ্যামফেটামিন উৎপাদন কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে। শুধু থাইল্যান্ডই ২০২৪ সালে রেকর্ড ১০০ কোটি মেথ ট্যাবলেট জব্দ করেছে, যার অধিকাংশই এসেছে মিয়ানমার থেকে। পাশাপাশি পাচার হওয়া শ্রমিকদের দিয়ে পরিচালিত সাইবার প্রতারণা কেন্দ্রগুলো বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করছে।

সংঘাত মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকাও ছিল সীমিত। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর আসিয়ান পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও জান্তা মাত্র দুই দিনের মধ্যেই তা কার্যত প্রত্যাখ্যান করে। অন্যদিকে জাতিসংঘের ২০২৫ সালের ১.১৪ বিলিয়ন ডলারের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাত্র ১২ শতাংশ অর্থায়ন পায় এবং বছর শেষেও পূর্ণ অর্থ সংগ্রহ করতে পারেনি।

একই সময়ে দীর্ঘদিনের গণতন্ত্রপন্থী মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও ট্রাম্প প্রশাসনের সময় নীতিগত পরিবর্তনের দিকে এগোয়। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ জান্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। এই সুযোগে জান্তা সরকার ট্রাম্পঘনিষ্ঠ ডিসিআই গ্রুপকে ৩০ লাখ ডলারের চুক্তিতে লবিস্ট হিসেবে নিয়োগ দেয় এবং রজার স্টোনকে মাসে ৫০ হাজার ডলার পারিশ্রমিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা শুরু করে।

সব মিলিয়ে মিয়ানমার এখন শুধু একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র নয়; এটি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে গণতন্ত্রের পতন, দীর্ঘদিনের জাতিগত সংঘাত, আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, যুদ্ধাপরাধ, মানবিক সংকট এবং অপরাধ অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে মিশে দীর্ঘস্থায়ী জাতীয় বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। যে দেশটি একসময় গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাসের পথে এগোচ্ছিল, আজ সেটি পৃথিবীর সবচেয়ে রক্তাক্ত ও জটিল সংঘাতগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে শিক্ষার ক্ষতি

হরমুজে লুকিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির চাবি

ছাত্রদের কাজকর্ম

ফেদেরিকো ফাজিনের ভাবনায় মানুষের ভবিষ্যৎ

মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কতটা যৌক্তিক

পোলট্রিতে ফাতেমার নীরব বিপ্লব

সমর্থক ও খেলার সৌন্দর্য

এমপিদের জন্য বরাদ্দ প্রদান সংবিধান পরিপন্থী

ইচ্ছে হলেই কি শতবর্ষী গাছ কাটা যায়

সমস্যা ধরে চাই কার্যকর উদ্যোগ