সাক্ষাৎকার

ইরানে স্থল অভিযানের আশঙ্কা খুবই কম: ওবায়দুল হক

ওবায়দুল হক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। তিনি কর্মরত আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে। সম্প্রতি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা, ইসরায়েলের উদ্দেশ্য, ইরানের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার মিত্রতা ইত্যাদি নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার আসল কারণ কী?

আসল কারণ নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। কারণ, হামলা শুরু হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসন এই যুদ্ধের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একাধিকবার তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি নানা ধরনের ষড়যন্ত্রতত্ত্বও আলোচনায় এসেছে।

তবে সামগ্রিকভাবে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করা বা পরিবর্তনের চেষ্টা, অর্থাৎ ‘রেজিম চেঞ্জ’ এই সামরিক পদক্ষেপের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হয়ে থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতিও এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতিদের ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা বেড়েছে। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই মনে করে যে এই গোষ্ঠীগুলোর পেছনে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন রয়েছে। ফলে ইরানকে তারা তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রধান কৌশলগত হুমকি হিসেবে দেখে। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিতসাগর ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে তেলবাহী জাহাজ চলাচলের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এই পথগুলো পশ্চিমা দেশ এবং ইসরায়েলের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই বাস্তবতায় ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করে আসছিল। কিন্তু আগের কোনো মার্কিন প্রশাসন সরাসরি যুদ্ধের পথে যেতে আগ্রহ দেখায়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় সেই অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইসরায়েলের কৌশলগত চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক স্বার্থ—এই দুইয়ের সমন্বয়েই শেষ পর্যন্ত এই সামরিক সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে।

তবে অনেক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের মতে, এটি ছিল অপ্রয়োজনীয় এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি যুদ্ধ, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পড়তে পারে।

ইরানের ওপর দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কেন শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধের পথে হাঁটল?

এটি বোঝার জন্য প্রথমেই একটি বিষয় স্বীকার করতে হবে—অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানকে প্রত্যাশিতভাবে দুর্বল করতে পারেনি। বিশ্বের অনেক দেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও ইরানের ক্ষেত্রে তার প্রভাব সীমিত ছিল।

এর অন্যতম কারণ ইরানের দক্ষ ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক কৌশল। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান চীন, ভারতসহ কয়েকটি বড় অর্থনীতির সঙ্গে বিকল্প উপায়ে তেল-বাণিজ্য চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে ফেললেও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে পারেনি।

নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের সাধারণ জনগণ অবশ্যই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতির মধ্যে থাকার ফলে একধরনের অভিযোজন ক্ষমতা তৈরি করেছে। তারা নিষেধাজ্ঞার প্রভাবকে আংশিকভাবে মোকাবিলা করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রও খুব দ্রুত উপলব্ধি করে যে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দুর্বল করা সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি একটি বিকল্প কূটনৈতিক সমাধান হিসেবে সামনে আসে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসে।

ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, এমন দাবি মার্কিন রাজনৈতিক মহলে প্রায়ই শোনা যায়। তবে অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের মতে, এই দাবি পুরোপুরি প্রমাণিত নয়। ইরান এখন পর্যন্ত কোনো পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করেনি। তবে আরেকটি বাস্তবতা হলো, পারমাণবিক চুক্তি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে সীমিত করতে পারেনি। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ইসরায়েল এবং এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্বার্থের জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ কাঙ্ক্ষিত ফল না দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত সামরিক বিকল্পের দিকে ঝুঁকেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

আপনি বলেছেন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের চাপে পড়ে যুদ্ধে শামিল হয়েছে। তবে ইসরায়েল কি ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকেও ইরানের ওপর হামলা করছে?

‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণাটি অবশ্যই কিছু রাজনৈতিক ও আদর্শিক গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে। তবে বাস্তব আন্তর্জাতিক রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এখনো খুব কেন্দ্রীয় লক্ষ্য নয়। ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার নিরাপত্তা পরিবেশ। মধ্যপ্রাচ্যে বহু আরব দেশ ইসরায়েলকে ঘিরে থাকলেও বর্তমানে তাদের অনেকের সঙ্গেই ইসরায়েলের সম্পর্ক আগের তুলনায় কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। কিন্তু ইরানের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব এখনো গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী। ইসরায়েল মনে করে, ইরান সরাসরি না হলেও আঞ্চলিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে একধরনের ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতাকে দুর্বল করা তাদের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য।

এই কারণে ইসরায়েল বহু বছর ধরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি বাস্তব রাজনীতিতে আপাতত গৌণ। ইসরায়েলের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তার আশপাশের নিরাপত্তা হুমকিগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা।

ইরানের অভ্যন্তরে বর্তমান সরকার ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ভবিষ্যৎ কী? তারা কি এই প্রবল চাপ কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?

এটি অনেকটাই নির্ভর করবে যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হয়, তার ওপর। যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ইরানের অভ্যন্তরে ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হতে পারে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইসরায়েল হয়তো চাইবে যুদ্ধটি দীর্ঘস্থায়ী হোক, যাতে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তুলনামূলক দ্রুত এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কি শেষ পর্যন্ত ইরাক যুদ্ধের মতো স্থল অভিযান শুরু করবে? অর্থাৎ তারা কি ইরানে সরাসরি সেনা পাঠাবে? এই মুহূর্তে সেই আশঙ্কা খুবই কম। শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা খুব সহজ নয়। অতীত অভিজ্ঞতাও সেটাই বলে।

ইরানের রাজনৈতিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক দশকে দেশটি একটি নির্দিষ্ট ধরনের রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়েছে। ফলে হঠাৎ করে সেই কাঠামোর পরিবর্তন ঘটানো সহজ নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, প্রবল চাপ থাকা সত্ত্বেও ইরানের বর্তমান সরকার এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর টিকে থাকার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এই যুদ্ধে রাশিয়া ও চীনের নীরবতাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

রাশিয়া ও চীনের তুলনামূলক নীরবতা আমাকে খুব বেশি বিস্মিত করেনি। বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে তারা সরাসরি এই যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়। তারা কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে এবং ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে, কিন্তু সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করেনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সংঘাত মূলত তিনটি রাষ্ট্রের সংঘাতে পরিণত হয়েছে—ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল। ইরানকে অনেকটাই এককভাবে এই সামরিক চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, বিশেষ করে স্যাটেলাইট নজরদারি। শত্রুপক্ষের অবস্থান নির্ধারণ এবং সামরিক কৌশল নির্ধারণে উন্নত স্যাটেলাইট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের সেই সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। তাত্ত্বিকভাবে ইরান চীনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চাইতে পারে। কিন্তু যদি পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে বৃহৎ শক্তিগুলোর সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে রাশিয়া বা চীন খুব সতর্ক অবস্থান নেবে বলেই মনে হয়।

সবশেষে একটি বিষয় বলা যায়, এই সংঘাত এককভাবে মার্কিন আধিপত্যকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে, এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। বরং যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় বা যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার বৈশ্বিক নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আজকের পত্রিকা ও আপনাকেও ধন্যবাদ।

কাগজ, বনকাগজ, বই ও পরিবেশ ভাবনা

নারীকে লড়াই করেই বাঁচতে হবে

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে দেশে বড় সংকটের শঙ্কা

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ জাতির উজ্জ্বলতম দিন

নারীর জন্য নিরাপদ সমাজ

সহযোগিতার নতুন যুগে বাংলাদেশ ও চীন

ফ্যামিলি কার্ড: কিছু বিবেচ্য বিষয়

ট্রাম্প খেলিছে এ বিশ্ব লয়ে

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত: দক্ষিণ এশিয়ায় এর প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ: এ সংকট দ্রুত কাটবে, এমন আশা করা কঠিন