পৃথিবীটা বদলে গেছে। আমরা এই পৃথিবীটার পরিবর্তন চেয়েছিলাম। আমরা শুধু নই, সারা বিশ্বের মানুষ, বিশেষ করে নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল সমাজের, রাষ্ট্রের এবং মানুষের। কিন্তু পরিবর্তনটা কি হলো? অনেক লড়াই-সংগ্রামের পর মে দিবস হয়েছিল, ফরাসি বিপ্লব হয়েছিল, প্যারি কমিউন হয়েছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল। তারপর শ্রমিক শ্রেণির একটি রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করেছিল অনেক ত্যাগের বিনিময়ে।
এ তো গেল পশ্চিমা বিশ্বের কথা। আমাদের প্রাচ্যেও শ্রমিক-কৃষকের একটি রাষ্ট্র হয়েছিল চীন দেশে। চীনের মানুষ নিপীড়ন সহ্য করতে করতে জাপানের বিরুদ্ধে লড়েছে, দেশীয় শ্রেণিশত্রুদের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে রক্ত ঝরিয়েছে। সে দেশেও ১৯৪৮ সালে একটি বিপ্লব হয়েছিল। মানুষ ভয়াবহ দারিদ্র্য থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ফিরে পেয়েছিল।
এর মধ্যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হয়েছে। ব্রিটিশের সীমাহীন লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর আত্মত্যাগ যখন চরমে, তখন ভারতের জন্য এক প্রতারণার স্বাধীনতা এল। তার আগে ৪২-এর দুর্ভিক্ষে লাখো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। স্বাধীনতা এল লাখ লাখ মানুষের দেশত্যাগ এবং ভ্রাতৃঘাতী এক দাঙ্গার পটভূমিতে। কী ভয়াবহ সে দিনগুলো! ব্রিটিশ উপহার দিয়ে গেল এক বিকৃত রাষ্ট্রের—পাকিস্তান। আর পূর্বাঞ্চলীয় মানুষের দুঃখ-দুর্দশা শুধু যে বাড়ল তা নয়, ভাষার ওপর আঘাত হানল এই বিকৃত রাষ্ট্রের দুষ্কৃতকারীরা। ধর্মকে পুঁজি করে এক নিষ্ঠুর শাসন চালাল ২৪ বছর। তথাকথিত পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ এর বিরুদ্ধে লড়াই করল। লড়াইয়ে সমবেত হলো মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত, শ্রমিক—সবাই। অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহের দেশ হিসেবে পরিচিত গাঙ্গেয় অববাহিকায় ঝরল এক নদী রক্ত। একটা সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে এক রক্তাক্ত শিশু জন্ম নিল, যার নাম বাংলাদেশ।
ইতিহাসে এই প্রথম একটি আত্মশাসনের সুযোগ পেল বাঙালি। কিন্তু স্বাধীনতার বিনিময়ে মুক্তি এল না মানুষের। দেশি-বিদেশি শত্রুদের ক্রমাগত ষড়যন্ত্রে পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থারই আবার পুনরাবৃত্তি হলো। এল সেনাশাসন। এল ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা। এখানেও বাংলাদেশের মানুষ এর বিরুদ্ধে লড়াই করল ক্রমাগত। একসময় সেনাশাসন চলে গেলেও মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হলো না।
মে দিবসের মৌল আদর্শের মধ্যে কর্মসংস্কৃতি, শ্রমিক শ্রেণির সম্মানজনক জীবনযাপন ও মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক জীবনের কোনো পরিবর্তন এল না। এরই মধ্যে স্বপ্নের সোভিয়েত বিপ্লব একটা সময়ে এসে ধসে পড়ল আপসে এবং পুঁজিবাদের উত্তরণে। সোভিয়েত ইউনিয়নের কড়া সমালোচক চীন নিজেও পাল্টাতে শুরু করল নিজের অবস্থান। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেখানে সাম্যবাদের উত্তরণের কথা ছিল, সেখান থেকে ছিটকে গেল ক্ষুদ্র এবং বৃহৎ পুঁজির অন্বেষণে। দ্রুতই কর্মক্ষম এই রাষ্ট্র সারা বিশ্বের এক উদাহরণ হয়ে দাঁড়াল পুঁজিবাদী উল্লম্ফনে। সারা বিশ্বের নির্যাতিত মানুষ যখন তাকিয়ে আছে চীন এবং সোভিয়েতের দিকে, তখন তারা প্রতারিত। সারা বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক স্বপ্ন নিয়ে যারা দশকের পর দশক লড়াই করছে, অপমৃত্যুর শিকার হচ্ছে, রক্ত ঝরাচ্ছে, জেলে পচে মরছে, তাদের জন্য সাহায্যের হাত ক্রমেই সংকুচিত হয়ে গেল। এই অসহায় পরিস্থিতিতে সংগ্রামরত দলগুলোর মধ্যে এল ভাঙন। বিভক্ত এই দলগুলো নিজেদের শুদ্ধতার প্রশ্নে একের পর এক পারস্পরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলো। একটা পর্যায়ে এসে জাতীয়তাবাদী দলগুলোই দেশের মুখ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। এই দলগুলোর মধ্যেও জাতীয়তাবাদের দেউলিয়াপনা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে গেল এবং প্রতিবেশী বড় শক্তি এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে তাদের অবনত না হওয়ার কোনো সুযোগ থাকল না।
আজকের দিনে সার্বভৌমত্ব একটা প্রহসনে পরিণত হয়েছে। পরাশক্তি এখন সিদ্ধান্ত নেয় রাষ্ট্রক্ষমতায় কে থাকবে। বিন্দুমাত্র স্বাধীনতাপ্রিয় কোনো একনায়ককেও পরাশক্তির হাতে পরাজিত হতে দেখা গেছে। যেমন সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফিসহ অনেকে। সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে এসেছে ভেনেজুয়েলার নিকোলা মাদুরো। একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর বিচারের জন্য। খণ্ডিত রাশিয়া লড়াই করছে তারই প্রতিবেশী এবং একদা একই অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির দেশ ইউক্রেনের সঙ্গে। এখন শ্রমিক শ্রেণির ঝান্ডা হাতে নিয়ে কিউবাকে ক্রমাগত অবরোধের মধ্যেও ধিকিধিকি বিপ্লবের আগুন নিয়ে লড়াই করতে হচ্ছে।
আফ্রিকার দেশগুলোতেও ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ চলছে অবিরাম। এই পরিস্থিতিতে পৃথিবীর মানচিত্রে একটা ক্ষুদ্র দেশ বাংলাদেশ। তার সম্পদইবা কতটুকু? সেই সম্পদটাকেও নিজের মতো করে সে ব্যবহার করতে পারছে না। তার বন্দর, তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ এবং সমুদ্র বারবার আক্রান্ত হচ্ছে। কারও আশীর্বাদ ছাড়া রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। তার মানে এক অদ্ভুত আঁধার এসেছে পৃথিবীতে।
আমরা একটা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যেই নিহিত ছিল সেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। আমরা চেয়েছিলাম গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সার্বভৌমত্ব। সেভাবেই নির্মিত হয়েছিল আমাদের সংস্কৃতি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমরা পাকিস্তানের ২৪ বছরের দিনগুলোতে যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলাম, সেই শক্তিগুলো ক্রমাগতভাবে আমাদের এইসব আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়তই লড়ে গেছে। সংবিধান বারবার স্থগিত হয়েছে, কর্তিত হয়েছে এবং বারবার হুমকি এসেছে সংবিধানের বিরুদ্ধে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সংসদকে কার্যকর করার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু বারবার আমরা হতাশ হয়েছি। একটি শক্তি তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টিকে উপেক্ষা করে সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টিকে উসকে দিল। সেই ’৪৬, ’৪৭-এর পথ ধরে দেশে ব্যাপক অভিবাসনের ষড়যন্ত্র হয়েছিল। সংখ্যালঘুর সম্পদকে লুণ্ঠন করার উদ্দেশ্যে নানা ফন্দিফিকির এখনো করে চলেছে।
হঠাৎ করেই আশীর্বাদের মতো আমাদের দেশে এসেছিল পোশাক কারখানা। সেই কারখানাগুলোতে লাখ লাখ নারী গৃহস্থালি দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে আত্মনির্ভরশীল হলো। তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারও সুনিশ্চিত হতে পারত। কিন্তু মুনাফালোভী কতিপয় মালিকের অদূরদর্শিতায় নিজেদের জন্য গড়ে তুলল বিশাল পুঁজি। এবং এই পুঁজি তারা দেশে রাখল না। পাঠিয়ে দিল উন্নত দেশগুলোতে। সেখানে তারা শুধু বাড়িঘর, ভোগবিলাস—এসবের জন্যই আবাসভূমি তৈরি করে চলল।
আর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অপকৌশলের কারণে দেশে এমন নৈরাজ্যের সৃষ্টি হলো যে, কলকারখানাগুলোর একটা বড় অংশ রুগ্ণ হয়ে গেল। বেকারত্বের এক মহা উৎসব তৈরি হয়ে গেল আমাদের দেশে। নিজেদের দ্বন্দ্বের কারণে এবং তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকারের সীমাহীন অদক্ষতা এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের ফলে এই পরিস্থিতি প্রলম্বিত হতে শুরু করল। কলকারখানার মালিকদের মধ্যে যাঁরা দেশীয় পুঁজিকে সংরক্ষণ করতে চাইলেন, তাঁরা চরম হতাশায় এবং একাকিত্বে এখনো দিনযাপন করছেন। হায় অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান! তিনি শুধু সুদের টাকা গুনলেন না, দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামোটাকেও ধ্বংস করে দিলেন। সেই সঙ্গে নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করলেন। দেশের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী এবং এনজিও কর্মকর্তারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সুবিধাপ্রাপ্ত হয়ে এর পক্ষে জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ করতে লাগলেন। তাঁদের সঙ্গে জুটে গেল যারা বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সময়ে এই রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছিল, তারাও।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের এই যে অভিযান, তাতে রাষ্ট্রের অর্থনীতি পর্যুদস্ত, শিল্প উন্নয়ন ধ্বংসের মুখে এবং সব অশুভ শক্তি রাষ্ট্রবিরোধী। আজকে একটাই আশার আলো—মানুষ আজ বুঝতে পারছে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি এরা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু একটাই নিরাশার কথা—আমাদের শ্রমিক সংগঠনগুলো বা কৃষকের যে সংগ্রামের ঐতিহ্য আছে, তারা সেটা পুষতে পেরে নতুন করে আন্দোলনের সূচনা করবে। দুর্নীতিপরায়ণ রাষ্ট্রের শাসক এবং আমলাদের বিরুদ্ধে তারা লড়াইয়ে নামবে। লড়াইয়ের ক্ষেত্রটা যথেষ্টই প্রস্তুত হয়েছে। যদিও বহুদিন ধরে শিক্ষাব্যবস্থাটাকে দুর্বল করে দিয়ে সব আন্দোলনের স্পৃহাকে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ খুব সুখে আছে যে পৃথিবীতে আর কোনো পরিবর্তনের সূচনা হবে না। কিন্তু সেটা কোনো সঠিক চিন্তা নয়। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু নিজেই বুঝতে পারছে সে পরাজিত হয়ে আছে। কাজেই দেশে দেশে এই শক্তিরও পরাজয় ঘটবে। কারণ, অনেক সময় ধরেই শ্রমিক শ্রেণি এই যুদ্ধকে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে।
আমরা টিনের তলোয়ার নিয়ে লড়াই করি। আমাদের হাতে কোনো মারণাস্ত্র নেই। কিন্তু এই নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের হাতে টিনের তলোয়ারই একেকটা বড় ধরনের অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হবে।
লেখক: নাট্যব্যক্তিত্ব