ইসলাম সম্পর্কে যাঁদের কিছুমাত্র জ্ঞান আছে, তাঁরা জানেন বেহেশতের টিকিট বিক্রি করা যায় না। কেউ বলতে পারেন না, তা তিনি যতই আলেম হোন না কেন, পরকালে কার কী পরিণতি হবে। তাহলে যাঁরা এমন পারলৌকিক লোভ দেখান, তাঁদের চিন্তাটা কী? তাঁরা কি দেশের মানুষকে নিতান্তই মূর্খ মনে করেন?
নির্বাচনে জিততে রাজনৈতিক দলগুলো কতটা বেপরোয়া হতে পারে, তার প্রমাণ মেলে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির দিকে তাকালেই। কেবল এবারই নয়, আগের প্রতিটি নির্বাচনেই নানা ধরনের লোভনীয় প্রতিশ্রুতির ডালা সাজিয়ে রাখা হয়েছে জনগণের সামনে। নির্বাচন শেষে বিজয়ী দল সবচেয়ে আগে ভুলে গেছে সেসব প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকারের কথা। আগে যাঁরা বলেছেন ব্যবসা-বাণিজ্যকে চাঁদামুক্ত করার কথা, নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর চাঁদাবাজিকে তাঁরা তাঁদের দলীয় কর্মকাণ্ডে পরিণত করে নিয়েছেন। এমন ব্যবস্থা করেছেন, যেন চাঁদাবাজি করার একক অধিকার কেবল তাঁদের দলের নেতা-কর্মীদেরই থাকে! মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলার পর দেখা গেছে মাদকের গডফাদারকে পাশে বসিয়ে মন্ত্রী-এমপিরা বড় বড় অনুষ্ঠানে হাজির হচ্ছেন।
এ রকম অনেক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর রয়েছে দারুণ দক্ষতা। তারা পারে, অবলীলায় সব ভুলে যেতে পারে। ভুলে গিয়ে তারা লজ্জাও পায় না। জনগণও কেন যেন অসহায়ের মতো সব মেনে নেয়। ‘যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা বাস্তবায়ন করেননি’—এমন কথা নেতাদের সামনে উচ্চারণও করে না। এসব যেন অনেকটা নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে এ দেশে। অথচ এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন যে একেবারেই অসম্ভব, তা কিন্তু নয়। চাঁদাবাজি, অর্থ পাচার, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড—এসব বন্ধ করা অসম্ভব কিছু নয়। সরকার চাইলেই পারে। কিন্তু রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকে টিকিয়ে রাখতে তারা ওই পথে যায় না। বরং গতানুগতিক গড্ডলিকা প্রবাহেই গা ভাসায়।
এবারের নির্বাচনে প্রতিশ্রুতির নতুন একটা ধারা দেখা যাচ্ছে। কিছু অবাস্তব কিংবা অলৌকিক প্রতিশ্রুতির কথা শোনা যাচ্ছে। প্রথম খুব আলোচনায় এল ‘বেহেশতের টিকিট’ প্রদানের বিষয়টি। কিছু লোক বললেন, এবারের নির্বাচনে জামায়াতকে ভোট দিলে বেহেশতে যাওয়া সহজ হবে, মিলবে বেহেশতের টিকিট! জনগণের সামনে উপস্থাপনটা এ রকম—আপনারা কি বেহেশতে যেতে চান? তাহলে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিন। ইহকাল এবং পরকাল—দুই জায়গাতেই আসবে সাফল্য!
এসব নিয়ে এরই মধ্যে অনেক কথা হয়েছে। বেহেশতের গ্যারান্টি দুনিয়ার কেউ যে দিতে পারে না, সেটা বারবার বলা হয়েছে। জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেখলাম এক জনসভায় এ নিয়ে ডিটেইলে বললেন। দর্শকদের মধ্য থেকে একজন বয়স্ক ভদ্রলোককে মঞ্চে ডেকে এনে তাঁর কথা থেকেই প্রমাণ করে দিলেন—বেহেশতের গ্যারান্টি পৃথিবীর কেউ দিতে পারে না। আসলে এ প্রমাণের কোনোই দরকার ছিল না। ইসলাম সম্পর্কে যাঁদের কিছুমাত্র জ্ঞান আছে, তাঁরা জানেন বেহেশতের টিকিট বিক্রি করা যায় না। কেউ বলতে পারেন না, তা তিনি যতই আলেম হোন না কেন, পরকালে কার কী পরিণতি হবে। তাহলে যাঁরা এমন পারলৌকিক লোভ দেখান, তাঁদের চিন্তাটা কী? তাঁরা কি দেশের মানুষকে নিতান্তই মূর্খ মনে করেন? মনে করেন এ ধরনের কথা বলে ভোটারদেরকে লোভী করে তোলা যাবে? নাকি তাঁরা নিজেরাই একজন আরেকজনের চেয়ে বড় মূর্খ? জামায়াতের এমন সব কথাবার্তা নিয়ে এরই মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের হাস্যরস করতে দেখা গেছে অনেককে।
এর বিপরীতে বিএনপির পক্ষ থেকেও নানা প্রতিশ্রুতির কথা শোনা যাচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া, দুর্নীতি বন্ধ করা, বস্তিবাসীদের জন্য ফ্ল্যাট তৈরি করে দেওয়া—এ রকম অনেক কথাই বলা হয়েছে। ক্ষমতায় গেলে এর কতগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, তা বলা মুশকিল। তবে এটি ঠিক, যথাযথভাবে চেষ্টা করলে এবং নিয়ত ঠিক থাকলে এসব করা সম্ভব।
কিন্তু এর মধ্যে বিএনপির আরেকটি প্রতিশ্রুতির কথা শুনে আমি কিছুটা বিস্মিত হয়েছি। দুই দিন আগে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বললেন, ক্ষমতায় গেলে বিএনপি নাকি সারা দেশে বিনা মূল্যে ইন্টারনেট দেবে। প্রথমে শিরোনামটি দেখে আমার বিশ্বাস হয়নি। আমি একাধিক পত্রিকা দেখলাম। একেকজন একেক ধরনের শিরোনাম করেছে। কেউ লিখেছে সকলকেই ফ্রি ইন্টারনেট দেওয়া হবে, আবার কেউবা বিষয়টিকে একটু সহজ করে লিখেছে—বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হবে, তাও আবার ধাপে ধাপে। ব্যাপারটি আমার কাছে বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হলো। একটু খোঁজ করতেই এ-সংক্রান্ত ভিডিওটি পেয়ে গেলাম। মাহদী আমিনের বক্তব্যটি শুনলাম। কী বলেছেন তিনি? পাঠকদের জন্য বরং পুরো বক্তব্যটিই এখানে শেয়ার করা যাক।
মাহদী আমিন বলেছেন, ‘তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, সবার জন্য আমরা ইন্টারনেটকে ফ্রি করতে চাই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। বিএনপি ইনশা আল্লাহ সরকার পরিচালনায় এলে বাংলাদেশের সব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, গ্রামীণ ডিজিটাল সেন্টার, হাসপাতাল, রেলস্টেশন এবং এয়ারপোর্টসহ যেসব জনবহুল স্থান রয়েছে, সেগুলোকে ধাপে ধাপে বিনা মূল্যে ইন্টারনেট সুবিধার ভেতরে আনতে চাইবে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য দেশের মানুষ যেন সহজে তথ্য এবং আধুনিক সেবা পেতে পারে। যাঁরা বিভিন্ন ধরনের কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িত, নিজেরা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠেছেন, তাঁরা যেন ফ্রি ইন্টারনেটটুকু পেয়ে যাঁর যাঁর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও শাণিত করতে পারেন। সুতরাং আগামীর বাংলাদেশে ইনশা আল্লাহ ইন্টারনেট হবে সবার—এটিই বিএনপির অঙ্গীকার।’
এ কথার পর তিনি আরও জানিয়েছেন, কীভাবে তাঁরা ইন্টারনেটভিত্তিক কর্মসংস্থানকে এগিয়ে নিতে চান। এটিও বলেছেন, এ খাতে তাঁরা ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চান।
এ প্রতিশ্রুতিটা খুবই ভালো। শুনতে ভালো লাগে। এটা বাস্তবায়িত হলে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য কর্ম ও জীবনযাপন অনেক সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি সম্ভব? সবাইকে ফ্রি ইন্টারনেট দেওয়ার পরিকল্পনা কি আসলেই বাস্তবায়নযোগ্য? সবার জন্য ফ্রি ইন্টারনেট যে পৃথিবীর কোনো দেশেই নেই; তা কিন্তু নয়। যত দূর জানি এ মুহূর্তে এস্তোনিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুরসহ সাত-আটটি দেশ তো রয়েছেই, যেখানে বিনা খরচে মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন। দেশের যেকোনো জায়গায় মানুষ কোনো অর্থ ব্যয় ছাড়াই ইন্টারনেট সেবা পেয়ে থাকেন। কেবল সেসব দেশের নাগরিকেরাই নন, সেখানে যাওয়া পর্যটকেরা পর্যন্ত পান ফ্রি ইন্টারনেটের সুবিধা।
এই যে দেশগুলোর কথা বললাম, তাদের সঙ্গে আমাদের দেশের রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। ওই দেশগুলোর অধিকাংশেই জনসংখ্যা খুবই কম। অনেকটা নগররাষ্ট্রের মতো। এস্তোনিয়ার জনসংখ্যা ১৫ থেকে ২০ লাখ, সিঙ্গাপুরে ৬০-৭০ লাখ। তাই আমাদের বাস্তবতাটা পুরোপুরিই আলাদা। পুরো দেশের কথা বাদ দিন, এক ঢাকা শহরেই এটা বাস্তবায়ন করা রীতিমতো অসম্ভব ব্যাপার।
এরই মধ্যে মাহদী আমিনের বক্তব্যের নানামুখী ব্যাখ্যা আসতে শুরু করেছে। কেউ কেউ বলছেন, তিনি তো সবার জন্য ফ্রি ইন্টারনেটের কথা বলেননি। বলেছেন নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাস-রেলস্টেশনের কথা, বিমানবন্দরের কথা। পাঠকদের বলব, সে ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্যটা আরেকবার খেয়াল করুন। সেখানে অফিস, উদ্যোক্তাদের কর্মসংস্থানে সহায়তা—এসব বলে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
আমি কিন্তু মাহদী আমিনের সমালোচনা করছি না; বরং আশাবাদী হতে চাইছি। ফ্রি ইন্টারনেট পেলে আমিও দারুণ খুশি হব। কিন্তু আমি বুঝতে চাইছি, তাঁদের এ পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবায়নযোগ্য? তাঁরা কি পারবেন? কতটুকু পারবেন? আবার বলেছেন, ধাপে ধাপে করবেন। এর অর্থ কী? তাহলে এ মেয়াদে সামান্য কিছু, তারপর বাকিটুকু বাস্তবায়নের জন্য আবারও ভোট চাইবেন? এভাবেই চলতে থাকবে?
আমাদের মতো জনবহুল দেশে ফ্রি ইন্টারনেটের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কতটুকু সম্ভব, তার একটা উদাহরণ আমরা দেখতে পাই ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে। ২০১৯ সালে সেখানে তৎকালীন সরকার নয়াদিল্লি শহরকে ফ্রি ইন্টারনেটের আওতায় আনার চেষ্টা করেছিল। এটা তাদের পূর্ববর্তী নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল। তারা কিছুটা করেও ছিল। কিন্তু ব্যয় সংকুলান করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি বাতিল করেছিল।
কেবল বিপুল ব্যয়ই নয়, এ ক্ষেত্রে বর্তমানে যাঁরা ইন্টারনেট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাঁরাও কিন্তু এ ধরনের সেবামূলক পরিকল্পনার বিরোধিতা করে থাকেন। আমাদের দেশে তো এর সঙ্গে জড়িয়ে যাবে মোবাইল কোম্পানিগুলোও। কারণ, তারাও এখন ইন্টারনেট প্রোভাইডারের ভূমিকায় নেমে গেছে। সব মিলিয়ে আমি নিশ্চিত, বিএনপির এই পরিকল্পনাটি মোটেই বাস্তবায়নযোগ্য নয়। এ বিষয়টি আমি বুঝি, তাঁরা বোঝেন না? আমার তা মনে হয় না। তাঁরা আরও অনেক ভালো বোঝেন। তাঁরাও জানেন এটি কখনোই বাস্তবায়ন করা যাবে না। তাহলে বলেন কেন? হয়তো এ কারণে বলেন, জামায়াত বেহেশতের টিকিট দিতে পারলে আমরা ফ্রি ইন্টারনেট কেন দিতে পারব না? কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বেহেশতের টিকিট কাজে লাগল কি লাগল না, সেটা জীবিত অবস্থায় কেউ প্রমাণ করতে পারবে না; কিন্তু ইন্টারনেটের বিষয়টি পারবে!
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক