হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মন্ত্রীদের সতর্কতার সঙ্গে কথা বলা দরকার

স্বপ্না রেজা

মন্ত্রীদের বক্তব্য প্রদানে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের মন্ত্রীদের মনে রাখতে হবে যে তাঁরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত যদিও, তথাপি অধিকার সচেতনতার দিক দিয়ে এই জনগণ কিন্তু ২০ বছর আগের অবস্থানে এখন আর নেই। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার দলীয় জাঁতাকলে পড়ে জনগণ বৈষম্যের শিকার ও অধিকার বঞ্চিত হয়েছে এবং হতে হতে জনগণের পিঠ বহু আগেই দেয়ালে ঠেকে গেছে। দুঃশাসন, দুর্নীতি জনগণ কিন্তু ভালো বোঝে, ভালো গণনাও করতে পারে, যতই তাদের সামনে বড় বড় বুলি আউড়ানো হোক না কেন, আর স্বপ্ন, পরিকল্পনার কথা বলা হোক না কেন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাবার নেপথ্য হিসেবে অনেকের ধারণা, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। ফলে তাদের ভোট যুক্ত হয়েছে বিএনপির ভাগ্যে। আবার ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও নারীবিদ্বেষী কথাবার্তায় জনগণ বেশ বিরক্ত বোধ করেছে।

যে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের তুলনায় বেশি, সেখানে নারীদের ঘরে রেখে রাষ্ট্রীয় সম্মানী বা ভাতা দেওয়ার জামায়াতি চিন্তাকে জনগণ ভালোভাবে নেয়নি। এই না নেওয়াটা ব্যালট পেপারের মাধ্যমে তারা প্রকাশ করেছে। অনেকের মতে, এবারের নির্বাচন ছিল উৎসবমুখর। ভোট প্রয়োগের মাত্রাটাও খারাপ ছিল না। এককথায় জনগণ একটা নির্বাচিত সরকার চেয়েছে, যাদের কাছে প্রত্যাশার দাবি রাখা যায়। বিগত দেড় বছরে পরিবর্তন ও সংস্কারের অজুহাতে দেশে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও নিরাপদহীন মব অবস্থা বিরাজ করেছে, জনগণ চেয়েছে সেই অবস্থার অবসান হোক।

বিএনপি সরকারে নবীন-প্রবীণ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীর সংমিশ্রণ ঘটেছে। যদিও তারা নারী সংসদ সদস্য উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারেনি। লক্ষণীয় বিষয় হলো, সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন মন্ত্রীর কথায় আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। জনমনে তোলপাড় শুরু হয়েছে—বলে কী! সম্প্রতি মিডিয়ার মাধ্যমে দেখা গেল যে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ‘চাঁদা’ সম্পর্কে বক্তব্য দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ ‘চাঁদা’ শব্দটা সাধারণ মানুষের কাছে কাঙ্ক্ষিত শব্দ নয়, বরং আমাদের সমাজে এটা এক ভয়ংকর অস্ত্র, যার আঘাতে, অত্যাচারে জনজীবন বিপর্যস্ত, নিঃস্ব হয়। চাঁদাকে কেন্দ্র করে সমাজে অপহরণ, খুন হয়েছে বিস্তর। চাঁদাবাজির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য জনগণ সব সময়ই ব্যাকুল থেকেছে, নিরাপত্তা চেয়েছে বিগত সরকারের কাছ থেকে। সেই চাঁদা নিয়ে কথা বললেন সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। তিনি বলেছেন কোনটা চাঁদা আর কোনটা চাঁদা নয়।

তাঁর মতে, সমঝোতার ভিত্তিতে যা নেওয়া হয় সেটা চাঁদা নয়, জোর করে নেওয়াটা হলো চাঁদা। অনেকের প্রশ্ন, সমঝোতার মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্থ সংগ্রহকে কেন মন্ত্রী বৈধতা দিতে চাইছেন? এ ক্ষেত্রে তিনি যদিও পরিবহনশ্রমিক ও মালিকদের কল্যাণের বিষয়কে যুক্ত করে যা বোঝাতে চেয়েছেন, তা কোনোভাবেই সাধারণ জনগণের মনে ধরেছে বলে মনে হয় না। বরং তাঁর কথায় সমাজে এক অলিখিত অনিয়মের চর্চাটা জোরালো হবে। আর প্রশ্ন থেকে যায়, শ্রমিক, মালিকদের কল্যাণের জন্য সড়কে, পরিবহনে অর্থ সংগ্রহ কেন?

‘চাঁদা’ কোনো ইতিবাচক শব্দ হয়ে সমাজে বিচরণ করে না, করেনি, করছে না। বরং সামাজিক অবক্ষয়ের এক মস্ত অস্ত্র হয়ে থেকেছে। চাঁদার কোনো বিকল্প শব্দ কিংবা বিনীত শব্দ বা অর্থ আছে কি না জানা নেই। তবে কমিশন বলে আরেকটা শব্দের প্রচলন আছে, যা অবিকল চাঁদার আদলে নয়, ভাগ-বাঁটোয়ারায় হয়। ভিন্ন কায়দায় অনেকটা স্মার্টলি আর্থিক সুবিধার ঘটনা ঘটায়। তা ছাড়া, বৈধতা ছাড়া, নিয়মবহির্ভূতভাবে গ্রহণ করা যেকোনো টাকাই হলো কালোটাকা। কালোটাকার লেনদেন এবং সেটা দিয়ে কারোর কিংবা কোনো কিছুর কল্যাণ চিন্তা করা কতটা যৌক্তিক হবে বা হয়, তা ভেবে দেখতে মন্ত্রীকে অনুরোধ করছি। যে শব্দ, যে আচরণ জনজীবনকে অতিষ্ঠ করেছে বিভিন্ন সময়ে, এমনকি সমাজে নৃশংসতা, বিশৃঙ্খলতার কারণ হয়েছে, তাকে বৈধতা দেওয়ার, জায়গা দেওয়ার কারণ কী হতে পারে, ইতিমধ্যে

জনমনে সেই প্রশ্ন ও সংশয় জেগেছে। অতীতের অকল্যাণকর, অনিষ্ট কোনো কিছুই জনগণ আর দেখতে চায় না, শুনতেও না। বর্তমান নবনির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের বরং প্রত্যাশা, চাঁদা ও কমিশনের মতো অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ড নির্মূল হোক এবং এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিএনপি সরকারের অবস্থান হোক কঠোর।

এই রেশ কাটতে না কাটতে সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন নিউজ ক্লিপে দেখা গেল, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বলেছেন, ইন্ডিয়ায় যে লতা মঙ্গেশকর, সনু নিগম, নেহা কক্করের মতো শিল্পী আছেন, এই রকম শিল্পী তৈরি করতে চাইছেন যেন এক রাতে অনুষ্ঠান করে তাঁরা কোটি কোটি টাকা আয় করতে পারেন। এই মুহূর্তে এমন বক্তব্য জনমনে স্বস্তি দেয়নি, দেওয়ার কথাও নয়। বরং বিস্ময় তৈরি করেছে। মন্ত্রী মহোদয় যদি বলতেন, গত দেড় বছরে বাংলাদেশের সংস্কৃতি যেভাবে, যতটা ক্ষতিগ্রস্ত ও হুমকির সম্মুখীন হয়েছে, বাধাগ্রস্ত হয়েছে, সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে তাঁর ভূমিকা থাকবে বলিষ্ঠ এবং বাংলা সংস্কৃতির চর্চা অবাধে, নির্বিঘ্নে হতে তিনি আপসহীন অবস্থান নেবেন, তাহলে জনমনে স্বস্তি আসত, বাংলা সংস্কৃতি রক্ষা পাওয়ার পথ পেত বৈকি। সংস্কৃতিসেবীদের মনে সাহস জাগত। কারণ, গত দেড় বছরে বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর যে জুলুম, নিপীড়ন চলেছে, তা ছিল বাংলা ও বাঙালির অস্তিত্বকে বিনাশ করার শামিল।

বলা বাহুল্য যে বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যাঁরা যুগ যুগ ধরে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাঁরাই এখন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যের জায়গাজুড়ে অবস্থান করছেন। জাতীয় সংসদের তাঁরা একটা অংশ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংগীত শিক্ষক নিয়োগ বাতিল, সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতি অনেকটা নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া শিল্পীদের সাংস্কৃতিক আয়োজন স্থগিত করে দেওয়া, ছায়ানটে অগ্নিসংযোগ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা ইত্যাদির নেপথ্যে ছিল কথিত ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর আগ্রাসন। ফলে সংস্কৃতিবিরোধী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে মন্ত্রীর কঠিন বক্তব্য আশা করেছিল সবাই।

মিডিয়ার মাধ্যমে আবার জানা গেল স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, ডাক্তারের পেছনে রোগী ঘুরবেন না, রোগীর পেছনে ডাক্তার ঘুরবেন। তাঁর এই হালকাপাতলা কথায় মনে প্রশ্ন জেগেছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর ধারণা কতটুকু? বর্তমানে কতজন মানুষের জন্য কতজন ডাক্তার সক্রিয় আছেন, তাঁর কাছে সেই পরিসংখ্যান আছে কি না এবং যাঁরা আছেন তাঁরা কীভাবে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন? আশা করি তাঁর কাছে তথ্য, পরিসংখ্যান সবই আছে। চিকিৎসাসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় নিতে চিকিৎসাব্যবস্থাকে রাজনৈতিক মুক্ত করে জনমুখী ও জনবান্ধব করতে হবে।

দেশ ও জাতির কল্যাণে, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে, পরিকল্পনা গ্রহণ ও প্রণয়নে জনগণের মতামত অত্যন্ত জরুরি। দেশে যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি-গোষ্ঠীর উন্নয়নমূলক কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং যাদের অবস্থার পরিবর্তনে গৃহীত পদক্ষেপ, তাদের পাশ কাটিয়ে কোনো পরিকল্পনাই ভালো ফলাফল দেবে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে এবং সতর্কতার সঙ্গে কথা বলতে হবে।

আমাদের ভাষার সংগ্রাম ও বর্তমান সময়-২

ভারত-ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতার মূল ভিত্তি কী

ইরানে মার্কিন হস্তক্ষেপের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী

গ্লোবাল সাউথের উত্থান কী বার্তা দিচ্ছে

সড়কের নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজি

মাটির স্বাস্থ্য ও কৃষির ভবিষ্যৎ

সুন্দর সূচনায় সামান্য গোচোনা না দিলেই নয়

জাপানে বাংলা ভাষার অগ্রযাত্রা

যেকোনো চুক্তি করার এখতিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল না: ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া

রমজানে বইমেলা, আয়ের আশা নাকি নিশ্চিত ক্ষতি