হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বামদের রাজনীতি কি মুমূর্ষু

মনির হোসেন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বামপন্থীদের জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের ১৫৩ জনের সবাই বিপুল পরিসরে পরাজিত হয়েছেন। কিন্তু রাজনীতির মাঠে ভোট টানতে বামপন্থা আদর্শের আলোড়ন কমবেশি সবার মধ্যে দেখা যায়। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, শ্রেণিবৈষম্য রোধ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেকারত্ব দূরীকরণসহ বিভিন্ন স্লোগান দেন তাঁরা। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১/১১ থেকে চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের পরও এমন অবস্থা কারণ কী!

আলোচনা হতে পারে নানাবিধ। কিন্তু বামপন্থীদের সমস্যার মূলে সম্ভবত ঐক্যহীনতা, লেজুড়বৃত্তি ও নিজেদের মধ্যে আদর্শিক, মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে জর্জরিত এবং সময়ের সঙ্গে নিজেদের রাজনীতি যুগোপযোগী না করা।

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ ভোটার শাকিরুল বলছিলেন, ‘বামেরা ভালো ভালো কথা বলে, যুক্তির আলোকে ন্যায্য দাবি তোলে, কিন্তু মানুষ ভোট দেয় না। দেবেই-বা কীভাবে? ১৫ জন লোকের ভাগাভাগিতে কমপক্ষে ২০টা দল। নিজেরাই যেখানে এক না, সেখানে মানুষকে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ করবেন কীভাবে!’

ষাটের দশকের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দানে বামের অবস্থা করুণ। বিশেষত পঁয়ষট্টির রুশ-চীন বিতর্কের পর মতাদর্শিক প্রভাব এ দেশের বাম রাজনীতিকে বিভক্ত করেছে। নব্বইয়ের পর তাদের মধ্যে বিভক্তি এতটাই প্রকট হয়েছে যে রাজনীতির ময়দানে কে সঠিক আর কে বেঠিক, তা একধরনের কুয়াশাচ্ছন্ন।

এককালের চীনপন্থী ধারার মধ্যে দ্বন্দ্ব এতটাই প্রকট যে এ পথের সব কটি দলই নির্বাচনবিরোধী তত্ত্ব প্রচার করে। পক্ষান্তরে রুশপন্থীরা নির্বাচনে সংসদীয় পন্থার দিকে ঝুঁকলেও জনসমর্থন নেই। তাঁদের মধ্যেও আছে তীব্র দ্বিধা, তিক্ততা আর বিচ্যুতি।

কিন্তু এবারের নির্বাচনে দুই পক্ষের দলগুলো নিয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্টের কেউ জামানত রক্ষা করতে পারেননি। যদিও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাঁচটি আসন জিতেছিল, যা ছিল সংসদীয় নির্বাচনে বামদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। এরপর বামদের সাফল্য দিনে দিনে শূন্যের কোঠায় নেমেছে। যদিও জনমুখী দাবিদাওয়া, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁদের সব সময় স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল, আছে এবং বলা যায়, ভবিষ্যতেও থাকবে।

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি নারী ও সংখ্যালঘু প্রার্থী ছিল বামদের। বরিশালে ডা. মনীষা চক্রবর্তী আলোচনার শীর্ষে থাকলেও তিনি পরাজিত হয়েছেন। কোনো কোনো কেন্দ্রে এ জোটের নারী-পুরুষ উভয় প্রার্থীর ভোট ছিল শূন্য। নির্বাচনের হলফনামায় নিজেদের দেখিয়েছেন দরিদ্র, আয় হিসেবে টিউশন। প্রশ্ন হতে পারে, দরিদ্র দেশে নিজেকে দরিদ্র প্রমাণ করা, সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি না করা, নিজেরা ঐক্যহীন থাকা ভোটের মাঠের হিসাবে কতটা প্রভাব ফেলা যায়?

ড. আহমদ শরীফ ১৯৯১ সালে লিখেছিলেন, ‘বাঙালি হিন্দু, সাংখ্য, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, জৈন, মুসলমান সব মতই গ্রহণ করেছে জীবন চলার পথে, কিন্তু কোনো অবিভক্ত মতে সে স্থির থাকেনি। সব সময় ঐক্যে বাঙালি জীবনের আয়োজন খুঁজে নিয়েছে। রাজনৈতিক ময়দানেও বাঙালি ঐক্যবদ্ধ দল খোঁজে। যা তার জীবনবাদী প্রবণতা। (গ্রন্থ: বাঙলা, বাঙালী ও বাঙালীত্ব)।’

এক আদর্শে হরেক রকমের প্যাকেজের দল মেহনতি, শ্রমজীবী মানুষের কাছে বামদের শ্রেণিহীনের পরিবর্তে শ্রেণিচ্যুত হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। তৈরি করেছে সাংস্কৃতিক দূরত্ব। ফলে এ দেশে বাম রাজনীতি দিনে দিনে রুগ্‌ণ হয়েছে, হয়েছে মুমূর্ষু।

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় কোনো শ্রেণিই বিকশিত না। অবিকশিত এখানকার কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি শ্রেণি। কোনো শ্রেণিই এখানে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠেনি, যা তাদের সাংস্কৃতিক ঐক্যকে মজবুত করবে। বামপন্থীরা সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অবিকশিত এই সামাজিক শ্রেণি, শহর-নগরগুলোর মাঝারি শিল্প ও তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকশ্রেণির ওপর ভর করে সমগ্র নিম্নবর্গের রাজনীতি করতে যতটা না আগ্রহী, তার চেয়ে বেশি অনাগ্রহী কৃষক, মজুর, মেহনতি মানুষের স্বার্থে গ্রামে ফিরে যেতে।

সমস্যার ছাপ আরও গভীরে। গুটিকয়েক শ্রমিক অঞ্চলগুলোয়ও দল, উপদলের বিভক্তির ছাপ সুস্পষ্ট। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শুধু রংপুর-৩, বরিশাল-৫, কিশোরগঞ্জ-১ আসনে বামদের যুক্তফ্রন্ট জোট থেকে একে অপরের বিরোধিতা করে দাঁড়িয়েছেন একাধিক প্রার্থী। এ রকম আরও উদাহরণ আছে সারা দেশে। এমন প্রবণতা তাঁদের জনবিচ্ছিন্ন করেছে দিনে দিনে।

উত্তরের জনপদ রংপুর অঞ্চলের দারিদ্র্যের হার দেশের মোট দারিদ্র্যের ১৭ শতাংশ (পরিসংখ্যান ব্যুরো-২৪)। এককালের মঙ্গা এখন আর না থাকলেও দশকের পর দশক ধরে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ছোঁয়া না লাগা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া এবং শিক্ষিত বেকারত্বের শীর্ষে থাকা রংপুরে জাতীয় পার্টির দুর্গে জামায়াত জোট একচ্ছত্র জয় পেয়েছে। এককালের ব্রিটিশবিরোধী ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, ইলা মিত্র, কৃষকনেতা নূরলদীনের রংপুর, গাইবান্ধায় এবার বামদের সব প্রার্থী এমন করুণভাবে পরাজিত হয়েছেন যে ভরাডুবি বললেও কম হবে।

হাতে কাঁচি নিয়ে ধান কাটতে যাওয়া ভূমিহীন কৃষক নিয়ামত আলী ভোটের প্রশ্নের জবাবে বলছিলেন, ‘হামরা এগলা কম বুঝি। কাঁচি, মই মার্কা নিয়া দুইজন লোক আছিলো। ওগো ভোট দেয় নাই। এক ঘরত দুজন নাকিও দাঁড়াইছত। লোক-মাইষত তাগো কম।’ সারা দেশেই বামদের এই অবস্থা।

লেখক: মনির হোসেন, প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

নতুন পরীক্ষার সামনে পুরো জাতি

ব্যতিক্রম এক নির্বাচনের কথা

বন্ধুর পথ তবু সময় এখন এগিয়ে যাওয়ার

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির দোলাচলে সংসদ নির্বাচন

নতুনের প্রত্যাশা

নির্বাচনে নারীবিষয়ক প্রচারণা ও প্রভাব

গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা সুষ্ঠু নির্বাচন

পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে এর গুরুত্ব

নতুন শুরুর অপেক্ষায়

দ্বন্দ্ব ছিল, দ্বন্দ্ব থাকবেই