হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

‘সাইলেজ’ প্রাণিখাদ্যের একটি সম্ভাবনাময় খাত

শাইখ সিরাজ

উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান আজিম ও মনিরুল ইসলাম মানিকের সঙ্গে কথা বলছেন লেখক। ছবি: হৃদয়ে মাটি ও মানুষ

মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার বালাশুর গ্রামের একটি সাধারণ খামার। খামারি জি এম খালিদ পরম মমতায় তাঁর গবাদিপশুগুলোর পরিচর্যা করছেন। শখের বশে শুরু করা এই খামারটি আজ তাঁর জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘশ্বাস, গোখাদ্যের আকাশচুম্বী দাম এবং সংকটের দুশ্চিন্তা। খালিদের মতো আজ বাংলাদেশের ১৫ লাখ প্রান্তিক খামারি, যাঁরা দু-তিনটি পশু পালন করে স্বপ্ন বোনেন সচ্ছলতার। কিন্তু সেই স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে পুষ্টিকর প্রাণিখাদ্যের অভাব।

বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাত আজ আর কেবল গ্রামীণ অর্থনীতির অংশ নয়, এটি একটি জাতীয় উন্নয়নমুখী শিল্পে পরিণত হয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে প্রায় ৮ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারি গবাদিপশু লালনপালন করেন। এই বিপুল সম্ভাবনার পথে সবচেয়ে বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাণিখাদ্যের নিরবচ্ছিন্ন জোগান। এই সংকটের সমাধান করতে এবং কৃষি অর্থনীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার করতে আশীর্বাদ হতে পারে ‘সাইলেজ’ পদ্ধতি।

উন্নত বিশ্বের ডেইরি ও ফ্যাটেনিং খামারগুলোতে সাইলেজ অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম। বিশেষ করে শীতপ্রধান দেশগুলোতে যখন চারণভূমি তুষারে ঢেকে যায়, তখন তারা পুরোপুরি সাইলেজের ওপর নির্ভর করে। সহজ কথায়, সাইলেজ হলো বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সংরক্ষিত সবুজ ঘাস বা ভুট্টাগাছ, যা ল্যাকটিক অ্যাসিড ফারমেন্টেশন বা গাঁজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করা হয়।

আমাদের দেশে প্রথাগতভাবে খড় বা শুকনো ঘাস খাওয়ানো হয়। কিন্তু খড়ে পুষ্টিগুণ অত্যন্ত কম থাকে। অন্যদিকে, সাইলেজ ঘাসে প্রাকৃতিক পুষ্টি, ভিটামিন ও এনজাইম অক্ষুণ্ন থাকে। এটি কেবল পশুর পেট ভরায় না, বরং দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধি এবং দুধের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে।

বাংলাদেশের বেকারত্ব দূরীকরণে কৃষি যে একটি বিশাল ক্ষেত্র হতে পারে, তার জাজ্বল্যমান উদাহরণ মেহেদী হাসান আজিম। তরুণ আজিম মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে উচ্চশিক্ষা শেষ করে নামকরা প্রতিষ্ঠানের আইটি বিভাগে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। কিন্তু মাটির টান আর গবাদিপশুর প্রতি ভালোবাসা তাঁকে ফিরিয়ে এনেছে শিকড়ে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল খামার করলেই হবে না, খামারিদের প্রধান সমস্যা, খাদ্যসংকটের বাণিজ্যিক সমাধান করা প্রয়োজন।

আজিম তাঁর মতো আরও দুই অংশীজনকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘সাইলেজ’ তৈরির কারখানা। তাঁর মতো উচ্চশিক্ষিত তরুণদের এই খাতে আসা প্রমাণ করে, কৃষিকাজ এখন আর কেবল লাঙল-জোয়ালের গল্প নয়, এটি এখন আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও লাভজনক ব্যবসা।

একদিন কথা হয় তাঁর সঙ্গে। কথার শুরুতেই জানালেন, এই পথচলার শুরুটা ছিল একান্তই প্রয়োজন থেকে। গাজীপুরে তাঁর নিজস্ব খামার, সেখানে সব সময়ই সবুজ ঘাসের অভাব। সেই সংকটই তাঁকে ভাবতে শিখিয়েছে, ‘নিজেরাই যদি পশুখাদ্য তৈরি করি’! আর সেই ভাবনা থেকেই পদ্মার এই চরে শুরু হয় সাইলেজ প্রকল্প।

এ বছর তিনি ১১০০ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন। শুধু নিজের জমি নয়, কৃষকদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক চাষ মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার বিঘা জমির ভুট্টা এখন সাইলেজে রূপ নিচ্ছে।

ভুট্টার একটি কাঁচা শিষ হাতে নিয়ে মেহেদী দেখালেন, সাইলেজ তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞান ‘মিল্কিং স্টেজ’। আঙুলের চাপ দিতেই ভেতর থেকে সাদা দুধের মতো তরল বেরিয়ে এল। এই সময়টিই নাকি সাইলেজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। তিনি বললেন, এই সময় গাছ কাটলে ময়েশ্চার ঠিক থাকে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ। এর পরে কাটলে ভেতরে পানি বেড়ে যায়, আর সাইলেজের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়।

সমাজের প্রচলিত ধারণা ভেঙে, একটি ভিন্ন পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত সব সময়ই কিছু প্রশ্ন তৈরি করে। মেহেদী হেসে বললেন, তাঁর শাশুড়ি নাকি আক্ষেপ করেই বলতেন, ‘ইঞ্জিনিয়ার জামাই দেখে মেয়ে বিয়ে দিলাম, আর সে কিনা গরু পালে!’

করোনার সময় যখন চারপাশ থমকে গিয়েছিল, তখনই মেহেদীর মতো অনেকেই নতুন করে ভাবার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি সেই সময়টাকেই কাজে লাগিয়েছেন। বাজারের কথাও বললেন তিনি। বর্তমানে তাঁরা প্রতি কেজি সাইলেজ বিক্রি করছেন ৮ থেকে ১০ টাকা ৫০ পয়সার মধ্যে। ৫০ কেজির একটি বস্তা বিক্রি হয় প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায়। কিন্তু এই সংখ্যার চেয়েও বড় যে বিষয়টি উঠে আসে, তা হলো চাহিদা। দেশে চারণভূমি দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে পশুখাদ্যের সংকট বাড়ছে। এই বাস্তবতায় সাইলেজ হয়ে উঠেছে পশুদের অন্যতম খাদ্য।

মেহেদীর হিসাব মতে, বাংলাদেশে বছরে আড়াই থেকে তিন লাখ টন সাইলেজের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সব কোম্পানি মিলে তার অর্ধেকও পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাৎ সম্ভাবনার জায়গাটা এখনো বিশাল।

মনিরুল ইসলাম মানিক আজিমের সাইলেজ বাণিজ্যের অন্যতম অংশীজন। নিজের খামার গড়তে গিয়ে যখন দেখলেন, গোখাদ্যের সংকট খামারিদের লাভবান হতে দিচ্ছে না, তখন নিজেই শুরু করেছিলেন সাইলেজ তৈরির কাজ। আর এখন সেটি কেবল একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়, বরং এটি কয়েক শ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। শিক্ষিত তরুণেরা যদি এভাবে সাইলেজ উৎপাদনের মতো আধুনিক কৃষিতে যুক্ত হয়, তবে দেশের বেকারত্ব সমস্যা সমাধানে তা যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।

সাইলেজ তৈরি একটি সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া, যেখানে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ না করলে গুণমান বজায় রাখা সম্ভব নয়। সাইলেজের সবচেয়ে উপযুক্ত উপাদান হলো ভুট্টাগাছ। ভুট্টার দানায় যখন ‘মিল্ক লাইন’ স্টেজ বা আধা শক্ত ও আধা দুধালো অবস্থা বিরাজ করে, তখনই ফসল কাটার উপযুক্ত সময়। এই সময়ে গাছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ শুষ্ক উপাদান থাকে, যা মানসম্মত সাইলেজের জন্য অপরিহার্য।

খেত থেকে সংগ্রহের পর ভুট্টাগাছগুলোকে চপার মেশিনের সাহায্যে ছোট ছোট টুকরা (প্রায় ১-২ ইঞ্চি) করে কেটে নেওয়া হয়। ছোট টুকরা হলে তা সহজে স্তরে স্তরে সাজানো যায়। কাটা অংশগুলোকে যেখানে সংরক্ষণ করা হয়, তাকে বলা হয় ‘সাইলো’। এটি মাটির নিচে গর্ত করে বা মাটির ওপরে পলিথিন দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে। প্রতিটি স্তর বিছানোর পর ট্রাক্টর বা ভারী রোলার দিয়ে খুব ভালো করে চেপে দিতে হয়। মূল লক্ষ্য হলো ভেতরে যেন কোনো বাতাস বা অক্সিজেন না থাকে। অক্সিজেন থাকলে পচন ধরার ভয় থাকে। ভালো গাঁজনের জন্য কাটা ঘাসের সঙ্গে চিটাগুড় বা মোলাসেস মেশানো হয়। এটি ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং পশুখাদ্যকে দীর্ঘকাল সংরক্ষণের উপযোগী করে তোলে।

সাইলেজের জন্য ভুট্টা চাষ বদলে দিয়েছে পদ্মার চরের মানচিত্র। মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর ও ফরিদপুরের বিশাল চরাঞ্চল, যা একসময় অনাবাদি পড়ে থাকত, আজ সেখানে সবুজের সমারোহ। কেবল ভাগ্যকুল ইউনিয়নের পদ্মার চরেই প্রায় ৫০০ বিঘা জমিতে ভুট্টার চাষ হচ্ছে।

এই চাষাবাদ চরাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। আগে চরের কৃষকেরা কেবল দানাদার ভুট্টার জন্য অপেক্ষা করতেন, যা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার ছিল। এখন সাইলেজ তৈরির জন্য আস্ত গাছ বিক্রি হওয়ায় তাঁরা দ্রুত নগদ টাকা পাচ্ছেন। এ ছাড়া পরিবহন, চপিং এবং সাইলো ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় কয়েক শ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। চরের অনাবাদি জমি এখন অর্থকরী ফসলের চারণভূমি, যা সামগ্রিকভাবে দেশের জিডিপিতে অবদান রাখছে।

বাংলাদেশকে যদি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রোটিনসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে প্রাণিসম্পদ খাতের আধুনিকায়ন অপরিহার্য। আজিম বা মানিকের মতো উদ্যোক্তারা পথ দেখাচ্ছেন, কিন্তু এই পথকে আরও মসৃণ করতে প্রয়োজন সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা।

লেখক: পরিচালক ও বার্তাপ্রধান চ্যানেল আই

বিনিয়োগ ও কর নিয়ে পুরোনো বাগাড়ম্বর

একাত্তরে পত্রিকাগুলো কী লিখছিল

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রথম পরীক্ষা: পদ্মা চুক্তির নবায়ন

পৃথিবীটা কি সত্যিই বদলে গেছে

শুধু অর্থনীতিবাদী আন্দোলন করে শ্রমজীবীর মুক্তি নেই

শ্রমিকদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে

ইরান যুদ্ধ কি রাশিয়ার জন্য শাপে বর

মব সংঘটিত হওয়ার নানা পরিপ্রেক্ষিত

বন্দী বিশ্বশান্তি

বাঙালির বাঁচার উপায়