দেশে শিক্ষার বিস্তার কিছুতেই ঘটছে না। সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু শিক্ষার ব্যাপারে কারোই আগ্রহ দেখা যায় না, সত্যিকারের; বরং উল্টো মনোভাবের দৌরাত্ম্য হতাশাব্যঞ্জক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে; যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ছাত্ররা তো রক্তাক্ত হয়ই, নিরীহ শিক্ষকেরাও বলতে বাধ্য হন যে কাজটা ভালো হচ্ছে না।
দোষ অবশ্য নন্দ ঘোষেরই। ছাত্রদেরই। সিনেমা হলে বিনা টিকিটে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল কারা? অবশ্যই ছাত্ররা। বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়ে কারা? ছাত্র ছাড়া আবার কারা? ছিনতাই করে কে? ছাত্র নিশ্চয়ই। কে ছুড়ল ঢিল? ছাত্র। ছাত্র। ছাত্র। যত অন্যায় ঘটছে ত্রিভুবনে—ছাত্ররাই করে সব।
ছাত্ররা যে করে না, সেটা কে বলবে? অবশ্যই করে। কিন্তু সব ছাত্র করে না। তা ছাড়া অপরাধ শুধু ছাত্ররাই করে না, অন্যরাও করে। সমাজে দুর্বৃত্তের কোনো ঘাটতি পড়েনি এবং এদের সবাই ছাত্র নয় এবং এ-ও বলতে হবে, কোনো ছাত্র যখন অপরাধ করে, তখন তাকে ছাত্র নাম দেওয়ার দরকার নেই, কেননা তখন সে আর ছাত্র নয়, অপরাধী বটে। ঢাকা কলেজের ছাত্ররা একবার সিনেমা হলে গিয়েছিল, টিকিট না করেই সিনেমা দেখবে তারা, বাধা দেওয়ায় করেছে তুলকালাম কাণ্ড।
ভাঙচুরের কোনো অবধি রাখেনি—ওটা পুলিশের বর্ণনা। ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ বলেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা—ওই দুর্বৃত্তরা ঢাকা কলেজের কেউ নয়, অন্য কেউ, সাধারণ মাস্তান। এখন কার কথা বিশ্বাস করব? পুলিশের, নাকি কলেজের? পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলছে, ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; অধ্যক্ষ বলছেন, তাদের মধ্যে ছয়জন মাত্র ছাত্র; বাকি ৪৪ জনই অছাত্র। তাহলে ছাত্ররাই যে ভাঙচুর করল, তা প্রমাণিত হয় কী করে? প্রমাণিত হয় না বটে, কিন্তু পুলিশ কোনো প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করেনি, দৌড়ে গিয়ে ঢুকে পড়েছিল কলেজে। ক্লাসরুমে ঢুকে যাকে পেয়েছে পিটিয়েছে। শিক্ষকদের মানা শোনেনি। শুধু কলেজে নয়, দৌড়ে গেছে ছাত্রাবাসেও। সেখানেও পিটিয়েছে যাকে পেয়েছে তাকেই। কে অপরাধ করে, কে পিটুনি খায়!
এসব কথা অন্য কারও কাছ থেকে পাওয়া নয়। মনগড়া নয় কারও। কলেজের অধ্যক্ষই বলেছিলেন। শিক্ষকেরাও বলেছিলেন। শুধু সাংবাদিকদের বলেননি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গিয়েও বলেছিলেন। এবং তাঁরা ধর্মঘটও করেছেন। এদের—এই শিক্ষকদের—নিশ্চয় দুষ্কৃতকারী বলা যাবে না। এরা রীতিমতো সরকারি কর্মচারী। তাহলে? বোঝা যাচ্ছে, সব অপরাধ ছাত্ররা করে না। অন্যরাও করে।
গাবতলীর গরুর হাটে যেদিন লুটপাট হলো—ছাত্ররা করেনি। দুজন যুবক বোমা ফাটিয়ে ঢাকা কোর্ট এলাকা থেকে তিনজন আসামিকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তারা ছাত্র কি? মেঘনা ঘাটে আনসারের গুলিতে ড্রাইভার নিহত হয়েছিল। আনসারটি নিশ্চয় ছাত্র ছিল না। ডেন্টাল কলেজের ছাত্র ইস্রাফিল নিহত হয়েছিল। কাদের হাতে? যে যুবক ধরা পড়েছে, সে পুলিশেরই একজন এএসআইয়ের ছেলে এবং মোটেই ছাত্র নয়। এসব ক্ষেত্রে ছাত্রের নামগন্ধও নেই, তাই ছাত্রদের ওপর দোষ চাপানো যাচ্ছে না, নইলে নির্ঘাত তারাই দায়ী হতো এসব অপরাধের জন্য।
কেন এটা হয়? সব দোষ তাদের ওপর গিয়ে পড়ে কেন? এর প্রধান কারণ হতে পারে এই যে ছাত্ররাই হচ্ছে একমাত্র সংগঠিত সম্প্রদায়, যারা সরকারের সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকে। তারা বিরোধিতা করে। রুখে দাঁড়ায়। অন্য সবাই যখন আত্মসমর্পণ করে, কেমন করে নিজেদের সুবিধার ছালাটি ভর্তি করা যায়, সেই তালে থাকে, তখন ছাত্ররাই দেখা যায় শেষ পর্যন্ত সোজা রেখেছে মেরুদণ্ড। ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করবার হুমকিটা এমনি এমনি আসে না। ওটি বড়ই প্রয়োজনীয়—তাঁদের জন্য, যাঁরা সরকারে আছেন। তাই ছাত্রদের ওপর ক্রোধ বলুন, আক্রোশ বলুন, সেটা থাকবেই। সন্দেহ করবার খুবই অবকাশ আছে যে প্রায়ই উসকানি দেওয়া হয় ঝাঁপিয়ে পড়বার। অত্যন্ত নির্মম, নিষ্ঠুর সেই ঝাঁপিয়ে পড়াটা—প্রত্যক্ষদর্শীরা জানেন খবর—অন্যরা না জানলেও কিংবা বিশ্বাস করা কঠিন মনে করলেও। আর ছাত্ররা যেহেতু নিজেদেরকে অপরাধী মনে করে না, বরং ন্যায়ের পথিক মনে করে, তাই পালিয়ে যায় না, কিংবা আপস করে না—অপরাধীরা যেমন করে থাকে। সত্যিকারের অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্কটা ঘৃণা ও ভালোবাসার। শুধু আমাদের দেশ বলে নয়, সব পুঁজিবাদী দেশেই। ছাত্রদের ব্যাপারটা আলাদা। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে ভালোবাসা দেখা যায় না; ঢাকা কলেজের ঘটনা সাক্ষী, পুলিশ যদি মওকা পায়, তবে ছাড়ে না এবং একবার এগিয়ে গেলে সহজে পিছিয়ে যায় না।
ব্যাপার আরও একটা আছে। সেটা হচ্ছে শিক্ষার প্রতি সাধারণ অনীহা। শিক্ষার মূল্য সমাজে প্রতিনিয়ত কমছে। এবং সেই কমতিরই বহিঃপ্রকাশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি অবজ্ঞায় এবং ক্ষেত্রবিশেষে আক্রমণে। ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ বলেছিলেন, কলেজে সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। পরীক্ষা হয়ে গেছে। ক্লাস চলছে। এরই মধ্যে হঠাৎ করে অপ্রত্যাশিত, অপ্রয়োজনীয় ওই আক্রমণ। ফলে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেছে, পরিবেশ গেছে বিষিয়ে। তাঁর দুঃখ হয়তো কেউ কেউ বুঝবেন, বিশেষ করে তাঁরা বুঝবেন
যাঁরা অভিভাবক, কিন্তু অনেকে বুঝবেন না, বুঝলে ওই ঘটনা ঘটত না, ঘটতে দেওয়া হতো না কিছুতেই। উচ্চপর্যায়ের লোকেরা খুবই কম বুঝবেন, কেননা, আমরা শুনি এবং জানতেও পারি মাঝেমধ্যে যে উঁচুতে উঠলেই ছেলেমেয়েদের, বিশেষ করে ছেলেদের আর তাঁরা দেশে রাখেন না, বিদেশে পাঠিয়ে দেন। তাঁদের কি এল-গেল দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থাকলে কিংবা ভাঙলে? ‘দেশপ্রেম’ তাই অতি অনায়াসে গিয়ে হানা দেয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ভাঙচুর করে। যাকে পায় পিটায়।
ছাত্ররা যে উচ্ছৃঙ্খলতায় মত্ত হয় না, তা নয়; হয়। কিন্তু তারা অল্প কয়েকজন মাত্র। সেই অল্প কয়েকজনের জন্য সবার শাস্তিপ্রাপ্তি ঘটে। ছয়জনের উচ্ছৃঙ্খলতায় ৬০০ জন পিটুনি খায়। ৬ হাজার জনের বদনাম রটে যায়। আর ওই যে ছয়জন মাস্তানি করল, এরা কারা? তারা বিদেশ থেকে আসেনি। বিজাতীয় নয়। আপনার-আমারই সন্তান। তাদের অপরাধে উত্তেজিত, উল্লসিত কিংবা ক্রুদ্ধ হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। অপরাধের কারণ রয়েছে গোটা ব্যবস্থাটার ভেতরেই। সে ক্ষেত্রে লাঠি হাতে ছুটে গেলে ফল হবে না, বরং কী করে তাদের সংশোধন করা যায়, সেটা ভাবলেই প্রকৃত অভিভাবকের কাজ করা হবে। তা ছাড়া দুষ্টের দমন চাইলে শিষ্টের পালন অত্যাবশ্যকীয়। তবে ছাত্রদেরকে যাঁরা সমাজের শত্রুপক্ষ হিসেবে খাড়া করতে চান, তাঁদেরকে সমাজের মিত্র বলবার কোনো অবকাশ দেখি না। দুঃখিত।
দেশে শিক্ষার বিস্তার কিছুতেই ঘটছে না। সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু শিক্ষার ব্যাপারে কারোই আগ্রহ দেখা যায় না, সত্যিকারের; বরং উল্টো মনোভাবের দৌরাত্ম্য হতাশাব্যঞ্জক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে; যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ছাত্ররা তো রক্তাক্ত হয়ই, নিরীহ শিক্ষকেরাও বলতে বাধ্য হন যে কাজটা ভালো হচ্ছে না। শিক্ষকেরা আর কী করবেন? বড়জোর ধর্মঘট করবেন। ধর্মঘট অর্থ আরও একটা ছুটির দিন—সরকারি দৃষ্টিতে তো তাই-ই মনে হয়। নইলে সব কটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক এক দিন-দুই দিন নয়, টানা দেড় মাসের বেশি, দুই মাসের কাছাকাছি যে ধর্মঘট করেছিলেন, কই, সরকার তো তাতে তেমন একটা সাড়া দিল না; বরং মনে হলো স্বস্তিতেই আছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ওভাবে বন্ধ না হয়ে গেলে সরকারকেই হয়তো উদ্যোগ নিতে হতো বন্ধ রাখার।
অথচ টিভির শিল্পীরা যে ধর্মঘট করেছিলেন তাতে ধর্মঘটের আগেই কিছুটা সাড়া পাওয়া গিয়েছিল, বাকিটা পাওয়া গিয়েছিল ধর্মঘট শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, দুই দিনের মাথায় তাঁদের ১৩ দফা দাবি মেনে নেওয়া হয়েছিল। তাতে আমরা খুশি, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবির প্রতি ওই যে উপেক্ষা, তাতে আমরা চিন্তিত, শিক্ষকদের কথা ভেবে যতটা নয়, শিক্ষার কথা ভেবে তার চেয়ে বেশি। এরপরে কেন বিস্মিত হব এ কথা শুনলে যে, শিক্ষকতা দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাকে আজ আর আকর্ষণ করে না? অতীতেও আকর্ষণ করত কম, এখন আরও কমেছে।
ছাত্রদের বিরুদ্ধে আরেকটা অভিযোগ হলো যে তারা পড়ালেখা করে না, রাজনীতি করে। কোনটা রাজনীতি আর কোনটা নয়, সে অবশ্য বলা কঠিন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করাকেই সবচেয়ে ক্ষতিকর রাজনীতি মনে করা হয়ে থাকে। এবং এ কাজ যারা করতে যায়, তাদের ওপর নিকৃষ্টতম নির্যাতন নেমে আসে।
কিন্তু সব রাজনীতি বোধ করি সমান অপরাধ নয়। পোস্টার লাগানো ও লিফলেট বিতরণের দায়ে ছাত্র গ্রেপ্তারের খবর আমরা বহুবার পেয়েছি। ভবিষ্যতেও পেতে থাকব। কোনটা যে অপরাধ, কোনটা যে নয়, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। আর কিছু না হোক, ছাত্র, শিক্ষক ও শিক্ষাজীবনকে বিপদগ্রস্ত করে দেশের উপকার হবে, এটা যেন কেউ মনে না করেন। এবং যেন মনে না করাতে পারেন।