হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সামাজিক অবক্ষয়ের উৎস কোথায়

স্বপ্না রেজা

সামাজিক অবক্ষয় রোধে আমরা কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছি, প্রশ্নটা এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সরকার, সমাজবিজ্ঞানী, সুশীল সমাজইবা এই বিষয়ে কতটা সচেতন, সেই প্রশ্নও উঠছে। অনেকেই কথায় কথায় বলেন, সামাজিক অবক্ষয়ে ছেয়ে গেছে সমাজ, গোটা দেশ। সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা না গেলে দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁরা মিথ্যা বলেন না। কিন্তু তাঁরা কতটুকু আন্তরিকতার সঙ্গে কথাগুলো বলেন, প্রশ্ন কিন্তু সেখানেও। কিংবা সামাজিক অবক্ষয় বলতে তাঁরা কী বোঝাতে চান বা নিজেরা বুঝেন, সেটাও প্রশ্ন। প্রশ্ন জন্মে ও থেকে যায় সাধারণ মানুষের মধ্যে। প্রশ্নের উত্তর মেলে না।

সামাজিক অবক্ষয়ের আভিধানিক অর্থ ও উৎস সমাজবিজ্ঞানীরা হয়তো যেভাবে দিতে পছন্দ করেন বা করবেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় তা হয়তো এতটা গ্রহণযোগ্যতা পায় না। কারণ, রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর শিক্ষা, চিন্তা ও বিবেকের ওপর নির্ভরশীল। যেখানে সমাজের চেয়ে, দেশের চেয়ে দল বড় হয়ে থেকেছে যুগে যুগে। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের জন্য যা বড় দুর্ভাগ্য হয়েছে। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক চর্চার ফলাফলই যে সামাজিক অবক্ষয় তথা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সংকটের কারণ হয়, সেটা পরীক্ষিত সত্য। যাহোক, সাধারণ মানুষ কিন্তু সামাজিক অবক্ষয়ের উৎস ভালো বলতে পারেন, কারণ তাঁরা এই পরিস্থিতির কঠিন ও একমাত্র শিকার হন।

কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাসী, ধর্ষক, খুনি এই অবস্থাগুলো রাষ্ট্রে সুশাসনের অভাবে যেমন জন্ম নেয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেও জন্ম হয়। বাংলাদেশে প্রচলিত রাজনীতির অস্তিত্ব টেকাতে মেধা ও জ্ঞানের চেয়ে দলগুলো পেশিশক্তিকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে, দিয়ে আসছে। এমন সত্য সম্পর্কে সবাই অবগত। দৃশ্যমান তো বটেই। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তার দৃষ্টান্ত। আর এমন কর্মকাণ্ডে তারা ‘অপরাধ’কে অবলম্বন করে এবং নতুন নতুন অপরাধের জন্ম দেয়। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে এ পর্যন্ত যত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার নেপথ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায়ী রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক চর্চা, যার প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায়। এটা না বললেই নয় যে একজন নির্দলীয় সাধারণ মানুষ কখনোই কোনো রাজনৈতিক সরকারকে তার সমস্যা সমাধানে নিজের সরকার মনে করতে পারেনি, পারে না। তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পায় বা পেয়ে আসছে দলীয় লোকজন। এমন রাজনৈতিক মনোভাব বা সংস্কৃতি সমাজে স্থিতিশীলতা আনতে পারে না, পারেনিও।

রাজনৈতিক দলগুলো সব সময় সাধারণ জনগণ, বিশেষত যারা শিক্ষার সুযোগ থেকে দূরে কিংবা আর্থিক অসচ্ছলতায় জীবনযাপন করতে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন, দিশেহারা, বিপর্যস্ত এমন শ্রেণিকে বেছে নেয়, অবলম্বন করে স্বার্থ হাসিলে। যদি দাবি করে বলা যায় যে বাংলাদেশে যত সন্ত্রাসী, মাস্তান রয়েছে তার সৃষ্টির নেপথ্যের গল্প সঠিক ও সততার সঙ্গে অনুসন্ধান করলে কিংবা খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে তাদের জন্য কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের আশ্রয়, প্রশ্রয় রয়েছে। তারা দুর্ধর্ষ, কারণ তাদের পক্ষে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক সরকারের সমর্থন রয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের দলের স্বার্থে যত অপরাধ ও অপরাধীর জন্ম দিয়েছে, দেশের ও জনগণের স্বার্থে সেই অপরাধ ও অপরাধীকে নির্মূলের বিষয়ে ততটাই উদাসীন থেকেছে। ফলে এই ধরনের অপরাধীরা সব সময়ই বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে থেকে গেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন, বিচার বিভাগ সবাই মূলত বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকে।

সামাজিক অবক্ষয়ের নির্মম শিকার হন দেশের তরুণসমাজ। চিন্তা-চেতনার বিকাশ সঠিকভাবে হয় না। তারা সমাজে যা অবলোকন করে, ভালো-মন্দ বিচার না করে সেটাই ধারণ করে, সত্য বলে বিশ্বাস করে। সত্য ও মিথ্যা কিংবা ন্যায় ও অন্যায় বোঝার বোধশক্তি তৈরি হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনৈতিক আগ্রাসনে তাদের কেউ কেউ ধরা পড়ে। আমি এমন অনেকের সাক্ষাৎ পেয়েছি যাঁরা পড়ালেখা ও কাজের অভিজ্ঞতা ছাড়াই রাতারাতি বিত্তবান হতে চান। এমন তরুণদের সংখ্যা কমছে না, বরং দিন দিন বাড়ছে।

যেনতেন শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা শিক্ষার অব্যবস্থাপনা সামাজিক অবক্ষয়ের আরেকটি অন্যতম প্রধান কারণ। কী শিখছে তরুণ শিক্ষার্থীরা, কীভাবে শিখছে তারা, কারা তাদের শিক্ষা প্রদান করছেন—সবকিছু মিলিয়ে যথাযথ জ্ঞান অর্জন করতে পারছে কি না, যা দেশ ও জাতির কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ—এসব নিশ্চিত করার দায়িত্ব কারইবা আছে, কে সোচ্চার বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে? এমন সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সবকিছুর মধ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবটাই দৃশ্যমান হয়।

সত্যি বলতে কি—জাতি হিসেবে আমাদের বড় ব্যর্থতা হলো স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক করতে পারিনি, যা নৈতিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করে, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে এবং দেশের স্বার্থে সবার মধ্যে ঐক্য গড়ে। যেনতেনভাবে এবং কঠিন অবহেলায় শিক্ষাব্যবস্থাকে সাজানো হয়েছে এবং কাজটি হয়েছে যে যখন ক্ষমতায় এসেছে তখনই তাদের দ্বারা তাদের মতো করেই। শিক্ষাব্যবস্থাকে দলীয়করণ করার বেপরোয়া প্রচেষ্টা সব সরকারের আমলেই পরিলক্ষিত হয়েছে। শিক্ষাকে জাতির কল্যাণে, দেশের উন্নয়নে, বিশেষ করে ব্যক্তিকে সুনাগরিক করে গড়ে তোলার প্রত্যয় দেখা যায়নি কখনো। বরং শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের একটা কৌশল প্রায় সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে থাকতে দেখা গেছে। অস্ত্রের চেয়েও যেন বেশি শক্তিশালী শিক্ষার্থীরা। যাহোক, রাষ্ট্রের অন্যান্য সেক্টরে যতটুকু মনোনিবেশ ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া হয় বা হয়েছে, শিক্ষাব্যবস্থায় তা দেওয়া হয়নি বলে অনেকেই মনে করেন।

ছাত্র আন্দোলনের প্রভাবে দেশের পরিবর্তন আমরা লক্ষ করেছি অতীতে। বিশেষ করে ১৯৬০, ৭০ ও ৮০-এর দশকে দেখা গেছে একটি দেশের মধ্যকার বৈষম্য, দুর্নীতি, অনিয়ম ও অধিকার বঞ্চনার জন্য ছাত্র আন্দোলন ছিল দেশ ও জাতির স্বার্থ রক্ষায় আপসহীন ও গণতান্ত্রিক। ধীরে ধীরে ছাত্র আন্দোলন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়। ফলে ছাত্রদের ছাত্রত্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। এরা রাজনীতিক হয় ঠিকই; দক্ষ ও বিবেকবান নাগরিক হয় না।

দুর্নীতি ও অনিয়মের মধ্যেও থাকে রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রশ্রয়। এটা পরীক্ষিত ও প্রমাণিত। শিশুরা যখন এমন এক পরিস্থিতিতে বেড়ে ওঠে, তখন তাদের কাছ থেকে উত্তম কিছু আশা করা যায় না। শিক্ষায় বৈষম্যের বিরোধিতার আন্দোলন পরবর্তী সময়ে কী করে ছাত্রদের শিক্ষা গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখল বা রাখছে, তা নিয়ে কাউকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে দেখা যায়নি। গণিতের সঙ্গে জীবনের বড় মিলটা হলো, সূত্র সঠিকভাবে প্রয়োগ ও ব্যবহার না হলে ফলাফল সঠিক হয় না। সামাজিক অবক্ষয় রোধ করতে হলে অবশ্যই এর নেপথ্যের কারণ জানতে হবে এবং সেগুলোকে স্বীকার করতে হবে।

জলাবদ্ধ নগরে জবাবদিহির খরা

প্রাকৃতিক দুর্যোগে শিক্ষার ক্ষতি

হরমুজে লুকিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির চাবি

মিয়ানমারে কেন থামছে না জটিল সংঘাত

ছাত্রদের কাজকর্ম

ফেদেরিকো ফাজিনের ভাবনায় মানুষের ভবিষ্যৎ

মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কতটা যৌক্তিক

পোলট্রিতে ফাতেমার নীরব বিপ্লব

সমর্থক ও খেলার সৌন্দর্য

এমপিদের জন্য বরাদ্দ প্রদান সংবিধান পরিপন্থী