কেমন আছেন আমাদের শ্রমিক ভাইবোনেরা?
এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার গভীরে প্রবেশ করতে হবে। সেই সঙ্গে বুঝতে হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়টি। সব সময় মে দিবসটিতে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার, মর্যাদা ও সম্মানসূচক বিষয়াদি নিয়ে আনুষ্ঠানিক তৎপরতা দেখা যায়। তাদের অবদানের কথা স্বীকার করা হয়। দিবসটির সূর্য অস্ত যেতেই সব ম্লান হয়ে যায়। অবদান, অধিকার শব্দগুলো হারিয়ে যায়। একটি দেশের ভাগ্যোন্নয়নে তারা যে কতটা অপরিহার্য, এমন উপলব্ধি কোথাও আর মেলে না।
বলছিলাম, একটি দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার গভীরে যেতে হবে বাংলাদেশের শ্রমিকদের অবস্থা বুঝতে হলে। যার মধ্যে আছে রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা, সম্পদের বণ্টন, আইনি অধিকার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও আইন প্রয়োগ, দুর্নীতি, রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা ইত্যাদি অসংখ্য বিষয় বিশ্লেষণ করে দেখা যাবে সব বিষয়ে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থান বেশ নাজুক। এককথায়, শ্রমিক শ্রেণির মানুষেরা সকল পর্যায়ের অধিকার থেকে নানা কৌশল ও পন্থায় বঞ্চিত। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শ্রমিকদের কথা শুরুতে বলা হলেও কার্যত তাঁরা অরক্ষিত ও নিরাপত্তাহীনতায় থেকেই যাচ্ছেন, সেটা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।
বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে শ্রমিকদের জীবনের কোনো আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন আসেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের নেপথ্যে এই শ্রেণির মানুষের মর্যাদাকর অবস্থান ও অধিকারের বিষয়টি সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও পরবর্তী সময়ে এই ক্ষেত্রে মনোযোগ ও গুরুত্বের ঘাটতি রয়েই গেছে। এর কারণ হিসেবে অনেকেই মনে করেন যে বাংলাদেশে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক চর্চার আধিপত্য ও তার বিস্তার। বাজারব্যবস্থা যখন জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন কিন্তু শ্রমিকেরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। আবার একটি দেশের দুর্নীতি যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায় এবং কোটিপতিদের সংখ্যা বেড়ে যায়, তখন অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন তাঁরা। সব অনিয়ম, অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের ফলে সমাজে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, বৈষম্য ও বিভাজন বিরাজ করে, তার জন্য চরম মূল্য দিতে হয় সাধারণ জনগণকে, যার মধ্যে শ্রমিক শ্রেণি একটা উল্লেখযোগ্য বড় অংশ।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের যে কঠিন সংকট, সেখানেও শ্রমিকদের অবস্থান অত্যন্ত মানবেতর। কারণ, দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে যে বিভিন্ন পরিকল্পনা, উদ্যোগ ও কৌশল প্রণয়ন ও গ্রহণ করা হয়, সেখানে কিন্তু শ্রমিকদের জীবনযাপনকে সহজতর করার বিষয় সেই অর্থে থাকে না। এই বিষয়ে গবেষণামূলক কোনো তথ্য-উপাত্তও নেই, রাখার প্রয়োজন বোধও নেই। আবার দেখা যায়, সব ধরনের পদক্ষেপ, উদ্যোগ রাজনৈতিক দলীয় স্বার্থে হিসাব কষে করা হয়, যেখানে রাজনৈতিক দলের লাভটাই থাকে মুখ্য ক্ষমতায় আসীন থাকার প্রশ্নে। নিত্যপণ্যের দামের সঙ্গে তাল দিয়ে তাই শ্রমিকদের মজুরি বাড়ে না। ফলে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে শ্রমিকদের কেউ কেউ ভিন্ন পথে পা বাড়ান। সেই পথ হতে পারে আরও কঠিন কিংবা সহজ। কঠিন বলছি এ কারণে যে তাঁকে হয়তো বর্তমান কাজের পাশাপাশি আরেকটা কাজ বেছে নিতে হচ্ছে অথবা ভিন্ন পেশায় নিজেকে সম্পৃক্ত করে বা করছে, যা হয়তো সমাজে কাম্য নয়; যে কাজের স্বীকৃতি নেই সমাজে।
বাংলাদেশেই যে শ্রমিকেরা বিভিন্ন ধরনের কাজ করছেন তা নয়। আর্থিক সচ্ছলতা, উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষায় তাঁরা পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে। তাঁরা বাংলাদেশে যে অর্থ পাঠান, তাতে দেশের রেমিট্যান্স বাড়ে। সেই রেমিট্যান্সে দেশের অর্থনীতি সচল হয়। যাঁরা সঠিক পথে দেশের বাইরে যেতে পারেন, তাঁরা মোটামুটি ভালো অবস্থানে থাকে। কিন্তু অবৈধ পথে দালালের খপ্পরে পড়ে যাঁরা বাইরে যাচ্ছেন, তাঁদের বিপন্ন জীবনের ছবি আমরা প্রায়ই দেখছি। মানব পাচারের চক্রে পড়ে শেষ পর্যন্ত তাঁদের জীবনই দিতে হয়। এদের অধিকাংশই তরুণ। জমিজমা বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা খরচ করে স্বপ্নে বিভোর হয়ে এরা পাড়ি জমান বিদেশে। তারপর যে করুণ পরিণতি হয় তা কেবল সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পায়, সমাপ্তি ঘটে না।
আমাদের একটা পররাষ্ট্রনীতিনীতি আছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আছে, শ্রমনীতি ও শ্রম মন্ত্রণালয় আছে, আইন মন্ত্রণালয় আছে; যেখানে বিজ্ঞ ব্যক্তিরা আছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিদেশগামী শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে যথাযথ পদক্ষেপ নেই, পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেই। বড় অসহায় এই পরিবারগুলো। এরা সন্তান হারিয়ে কেবল লাশটাই ফেরত চায়।
যাঁরা শ্রমের বিনিময়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত—সেই অর্থে আমরা সবাই শ্রমিক। যিনি সরকার পরিচালনা করেন, রাষ্ট্র শাসন করেন, বিচারকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করেন, রায় দেন, নীতিনির্ধারণে ব্যস্ত থাকেন, ছাত্র পড়ান, সেলাই মেশিন চালান, পরিবহন চালান—সবাই বেতনভুক্ত। শ্রম দিয়ে তাঁরা পারিশ্রমিক পান।
শ্রম ছাড়া যেমন সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে না, ঠিক যিনি বা যাঁরা শ্রম দিচ্ছেন, ভবিষ্যতে দেবেন, তিনি ও তাঁরা যদি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী না হন বা হতে না পারেন, তাহলে অর্জিত ফলাফল কখনোই গুণগত মানসম্পন্ন হবে না। অর্থনৈতিক, সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে। আমাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কখনোই সাধারণ মানুষের কল্যাণকে সুরক্ষিত করতে পারেনি। যতটা পেরেছে নিজের দল বা সংগঠনকে শক্তিশালী ও মজবুত করতে।
একটা বিশেষ দিনের জন্য নয়, সব দিনেই যেন আমরা শ্রমজীবী মানুষের সম্মান, তাঁদের ন্যায্য পাওনা, অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারি, সেই প্রত্যাশা করি।