হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বিলম্বিত উত্তরণ: করণীয় কী

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের জন‍্য অনুকূল অর্থনৈতিক বাস্তবতা দেশে বিরাজ করছে না। বিদ‍্যুৎ ও গ‍্যাস-সংকটের কারণে নির্ভরযোগ‍্য জ্বালানি সরবরাহ নেই। এর অভাবে পোশাক বা ওষুধশিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলো বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে না।

সেলিম জাহান 

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে নানান আলোচনা, বিতর্ক, সিদ্ধান্ত চলে আসছে। কিছুদিন আগে জাতিসংঘের কাছেও সেই প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ আবেদনও করেছে। সে ব‍্যাপারে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রথম ধাপ হিসেবে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক পর্ষদ বাংলাদেশের আবেদনের সপক্ষে সুপারিশ করেছে। এরপর বিষয়টি অনুমোদনের জন্য ২২ জুলাই জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পর্ষদের কাছে যাবে। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন‍্য বিষয়টি সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কাছে যাবে। উল্লেখ‍্য, তখন বাংলাদেশ সাধারণ পরিষদের সভাপতির ভূমিকা পালন করবে।

বাংলাদেশ ২০১৮ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের তিনটি সূচকেই সক্ষমতা অর্জন করেছিল। ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নেও এই অর্জন অক্ষুণ্ন ছিল। তখন ভাবা হয়েছিল, ২০২৪ সালেই বাংলাদেশের উত্তরণ সুপারিশকৃত হবে। কিন্তু সে সময়ে কোভিড-১৯-এর কারণে উত্তরণ সুপারিশটি দুই বছর পিছিয়ে ২০২৬ সালের নভেম্বরে করা হবে বলে নির্ধারিত হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উত্তরণের সময়সীমা বিলম্বিত করার পেছনে পাঁচটি মোটাদাগের যুক্তি দেখানো হয়। এক. বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নানান যে সংকট এবং অন্তরায় সৃষ্টি হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটলে স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধাসমূহ বাংলাদেশ হারাবে। সে অবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা বাংলাদেশের জন‍্য সম্ভব হবে না।

দুই. বাংলাদেশের শিল্প খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানিতে বৈচিত্র‍্য আনা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন‍্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা, গুণগত মানসম্পন্ন প্রত‍্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, সুশাসন জোরদার করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলার জন‍্য বাংলাদেশের সক্ষমতা তৈরি করতে সময়ের প্রয়োজন।

তিন. উত্তরণের পরে রপ্তানিতে ভর্তুকি এবং মেধাস্বত্বের চুক্তি বাস্তবায়নে শিথিলতার মতো বিশ্ব বাণিজ‍্য সংস্থার বিশেষ সুবিধা আর থাকবে না। যেমন স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০৩২ সাল পর্যন্ত স্বত্বছাড়ের সুবিধা পাচ্ছে। আগামী বছরে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটলে এই ছাড় আর থাকবে না। তখন ওষুধশিল্প পূর্ণ স্বত্ব আইনের অধীনে আসবে। ফলে ওষুধের দাম অত‍্যধিক বেড়ে যাবে।

চার. স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের জন‍্য অনুকূল অর্থনৈতিক বাস্তবতা দেশে বিরাজ করছে না। বিদ‍্যুৎ ও গ‍্যাস-সংকটের কারণে নির্ভরযোগ‍্য জ্বালানি সরবরাহ নেই। এর অভাবে পোশাক বা ওষুধশিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলো বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে না। বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধি এবং অভ‍্যন্তরীণ খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। এই অবস্থায় বিদ‍্যুৎ-গ‍্যাস সংকটের সমাধান, আর্থিক খাতের সংস্কার, বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা—এসব বিষয়ের জন‍্য উত্তরণ সময়সীমা বাড়ানো প্রয়োজন।

পাঁচ. এর আগেও জাতিসংঘের শর্ত পূরণ করলেও রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণে নানান দেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া পিছিয়ে গেছে। বিশেষ করে যেসব দেশ অভ‍্যন্তরীণ রাজনৈতিক বা বহিস্থ ধাক্কার মুখে পড়ে, কিংবা যেসব দেশের উত্তরণের জন‍্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের ঘাটতি থাকে কিংবা যাদের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়, তাদের জন‍্য উত্তরণের সময় বাড়ানো অস্বাভাবিক কিছু নয়।

বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ উন্নয়নবিষয়ক পর্ষদ মন্তব‍্য করেছেন যে উত্তরণ-নির্ণায়কের সব কটি শর্তই বাংলাদেশ পূরণ করেছে এবং তার কোনোটিতেই স্খলনের আশঙ্কা নেই। তবে ৯টি বৈশ্বিক এবং দেশজ সংকট বাংলাদেশকে সময়সীমা বাড়ানোর জন‍্য বাধ‍্য করেছে। এগুলো হচ্ছে কোভিড-পরবর্তী নেতিবাচক প্রভাব, ইউক্রেন যুদ্ধ, লোহিতসাগর সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, দেশজ ব‍্যাংকিং খাতে অনিয়ম এবং জুলাই-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময়কালে উত্তরণের জন‍্য বাংলাদেশের করণীয় কী?

এ ব‍্যাপারে পাঁচটি বিষয়ের দিকে বাংলাদেশকে নজর দিতে হবে।

প্রথমত, ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন‍্য যে ‘নিপাট উত্তরণ কৌশল প্রণয়ন করেছিল, তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ কৌশলে সময়-নির্ধারিত ১৫৭টি ব‍্যবস্থা রয়েছে। মনে রাখতে হবে, এ পর্যন্ত এসব ব্যবস্থার অগ্রগতি সুষম ছিল না।

দ্বিতীয়ত, আগামীতে গৃহীতব‍্য ব‍্যবস্থাগুলোকে সময়-সুবিন‍্যস্ত করতে হবে। যেমন ৩ বছরের স্বল্পমেয়াদি ব‍্যবস্থা; ৩ থেকে ৫ বছরের মধ‍্যমেয়াদি ব‍্যবস্থা এবং ৫ বছরের ওপরের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা। এতে ব‍্যবস্থাগুলোকে যেমন প্রাসঙ্গিক অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে, একইভাবে সেগুলোর যৌক্তিকীকরণ করা যাবে।

তৃতীয়ত. স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বিলম্বীকরণের ব‍্যাপারে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ ছিল বাংলাদেশের পোশাকশিল্প খাত। এ বছরে উত্তরণ ঘটলে এবং স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধাসমূহ হারালে তারা শেষ হয়ে যাবে, এমনটা অভিমত ব‍্যক্ত করেছিল তারা। শিল্প খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানিতে বৈচিত্র‍্য আনা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন‍্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা—ইত‍্যাদির জন‍্য আরও সময় চেয়েছিল তারা। সুতরাং এই প্রক্রিয়া যদি বিলম্বিত হয়, তাহলে এই খাতকে এসব অন্তরায়ের সমাধান করতে হবে। এটা তাদের দায় এবং দায়িত্ব।

চতুর্থত, দেওয়া সময়ের মধ‍্যে সরকারকেও অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের নানান বিষয়ে সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও সরকার ইতিমধ‍্যে জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সুবিধাজনক বাণিজ‍্য চুক্তি করেছে। অন‍্যান‍্য দেশের সঙ্গেও এর সম্প্রসারণ দরকার, যাতে উত্তরণ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছন্দ হয়।

পঞ্চমত, প্রস্তুতিপর্বে এবং উত্তরণ-পরবর্তী পর্বে বাংলাদেশের নানান বৈশ্বিক সাহায‍্য প্রয়োজন হবে। যেমন রেয়াত দেওয়া ঋণ, প্রায়োগিক সহায়তা, বর্ধিত বাণিজ‍্য সঞ্চালনা সক্ষমতা এবং স্বল্পোন্নত দেশ-সম্পৃক্ত সুবিধা ইত‍্যাদি। আন্তর্জাতিক কাঠামোকে এটা নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যক্তিগত একটি কথা দিয়ে শেষ করি। গত বছর নিউইয়র্কে কফিতে বসেছিলাম আমার দীর্ঘদিনের সুহৃদ ও সহকর্মী হেসে আন্তনিও ওকাম্পোর সঙ্গে। জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস‍্য ছিলেন তিনি। সেই সঙ্গে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি আমার কনিষ্ঠ কন‍্যার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। তিনি জাতিসংঘ উন্নয়ন নীতিবিষয়ক পর্ষদের সভাপতিও। স্বল্পোন্নত

দেশ থেকে নানান দেশের উত্তরণের বিষয়টিও সামনে এসেছিল। কথা প্রসঙ্গে ওকাম্পো বলেছিলেন যে আলসেমি করার বা বসে থাকার বিলাসিতা বাংলাদেশের নেই। চূড়ান্ত বিচারে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়ায় এটাই হয়তো মোক্ষম কথা।

লেখক: অর্থনীতিবিদ

গোলান মালভূমিসহ যেকোনো ভূখণ্ডের জবরদখলই দস্যুতা

পর্যটনকেন্দ্রে মৃত্যুফাঁদ, দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বদলে নতুন করে স্বাক্ষরের চিন্তা আত্মঘাতী

সাফারি পার্কে পশুপাখি মারা যাচ্ছে কেন

সংস্কৃতির সংকট, জাতীয় স্বার্থ ও বন্দর রক্ষা

তাজমিনের হত্যা নিয়ে কতিপয় প্রশ্ন

কৃষণ চন্দর, ঘৃণা ও দুধকলা দিয়ে পোষা কালসাপ

মানসম্মত হাসপাতালের জন্য প্রয়োজন দক্ষ নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী

শহরের বাইরেই হোক সচিবালয়

চেতনা: বিজ্ঞান ও দর্শনের নতুন সংশয়