হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

আত্মহত্যা প্রতিরোধে জরুরি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ

ড. মো. শফিকুল ইসলাম

মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং থানার নথিতে ‘আত্মহত্যা’ একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে আত্মহত্যা করেছে ১৩,৪৯১ জন। মানে গড়ে দিনে ৪১ জন। একই সঙ্গে জাতীয় জরিপভিত্তিক আরেক তথ্যমতে, ২০২৩ সালে দেশে আত্মহত্যা করেছে ২০,৫০৫ জন। আবার পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আত্মহত্যা করেছে ১৩,৯২০ জন। এই দুই ধরনের উৎসের সংখ্যায় পার্থক্য আমাদের আরেকটি বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে দেশে আত্মহত্যাসংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য, একীভূত ও নিয়মিত নজরদারি এখনো দুর্বল। সংখ্যা কমবেশি যাই হোক, প্রবণতাটি ক্রমেই বাড়ছে। আত্মহত্যা এখন বাংলাদেশের জন্য একটি জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার সংকট হিসেবে হাজির হয়েছে।

সমস্যার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, এই সংকটের বড় অংশ জড়িয়ে আছে তরুণদের সঙ্গে, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। একটি গবেষণামতে, ২০২১ সালে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন; এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীই হলেন ৬২ জন। একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু মানে শুধু একটি প্রাণহানি নয়, বরং রাষ্ট্রের মানবসম্পদ তৈরির দীর্ঘ বিনিয়োগও ভেঙে পড়া। কেন তরুণেরা এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাচ্ছে, তার কারণ একমাত্রিক নয়। শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার মূল অনুঘটক হিসেবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতির কারণে ২৪.৭৫ শতাংশ ও পারিবারিক সমস্যার কারণে ১৯.৮০ শতাংশ। পাশাপাশি মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ১৫.৮৪, পড়াশোনার চাপে ১০.৮৯, আর্থিক সমস্যার কারণে ৪.৯৫ শতাংশ মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

কেউ সাধারণত একটি কারণে আত্মহত্যা করে না। একাধিক কারণে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে এ পথ বেছে নেয়। তবে শুধু এক দিনের দিবস পালনের মাধ্যমে সেটা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য দরকার কাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক, মানবিক হস্তক্ষেপ ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ।

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে সরকারকে। কারণ, এই সংকট দিন দিন আরও বড় হবে। সংকট বড় হলেও চিকিৎসার সুযোগ সীমিত। তাই কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নিলেই হবে না, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে কার্যকরী। কেবল শিক্ষার্থী নয়, সমাজের সব স্তরেই মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পেছনেও পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য সংকট, আর্থিক ও সামাজিক চাপ, মানসিক জটিলতা ও বিষণ্নতার কথা উঠে এসেছে এবং অনেকেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হননি। অথচ মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির বড় ছবি আরও উদ্বেগজনক। ২০১৮-১৯ সালের মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নানা ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত; ১০০ জনে ৭ জন বিষণ্নতায় ভোগে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে ৯২ শতাংশ মানুষ চিকিৎসার বাইরে। শিশুদের ক্ষেত্রেও চিত্র আরও ভয়াবহ। ১৩.৬ শতাংশ শিশু মানসিক রোগে ভুগছে; তাদের মধ্যে ৯৪ শতাংশ কোনো চিকিৎসা পায় না।

এই বাস্তবতায় আত্মহত্যাকে কেবল নৈতিক বিচ্যুতি বা ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখলে আমরা সমস্যার মূলেই আঘাত করতে পারব না। আত্মহত্যা প্রতিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সহমর্মিতা, সময়মতো সহায়তা এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে একলা না হতে দেওয়া। সমাজবিজ্ঞানীর ভাষায়, সংকটে মানুষ একা হয়ে পড়ে; সামাজিক অসহযোগিতা ও ন্যূনতম জীবনমানের অনিশ্চয়তা গভীর হতাশা তৈরি করে, যা দুর্বলদের ক্ষেত্রে আত্মহননের পথে ঠেলে দিতে পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র‍্যাগিং, অপমান, বুলিং এসব চিরতরে বন্ধ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানে নিরাপদ বিকাশের স্থান হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে উল্টো। র‍্যাগিংয়ের নামে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন একপর্যায়ে শিক্ষার্থীকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে, এমন বাস্তব উদাহরণও সামনে এসেছে এবং র‍্যাগিংবিরোধী আইন প্রণয়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে শরীরের গঠন, পোশাক, কথা বলার ধরন নিয়ে উপহাস, বুলিং, সামাজিক লজ্জা এসব অদৃশ্য নির্যাতন মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। ফলে আত্মহত্যা প্রতিরোধ মানে কেবল কাউন্সেলিং নয়; মানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিকে মানবিক ও সহনশীল করা। এ জন্য দরকার মানসিক চিকিৎসাসেবাকে শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ করা। তাই প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মনোচিকিৎসকের পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগ বা অনুষদে অন্তত একজন মনোবিজ্ঞানী থাকা প্রয়োজন; বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে এই পদই নেই। তাই আইন বা নীতিমালার মাধ্যমে পদ সৃষ্টি করে দ্রুত নিয়োগ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

এসব জরুরি এ কারণে যে প্রাথমিক পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণ শনাক্ত করা যায়, গোপনীয় ও বিজ্ঞানভিত্তিক কাউন্সেলিং করা গেলে কিছুটা হলেও সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে। এ ছাড়া আত্মহত্যা প্রতিরোধে গবেষণা ও পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘সেফটি নেট’ সেবা চালু বাধ্যতামূলক করা দরকার, যাতে বুলিং বা র‍্যাগিং কমানো যায়। র‍্যাগিং ও বুলিংকে ক্যাম্পাস কালচার হিসেবে ছাড় দিলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে। এ জন্য কঠোর নীতি, অভিযোগ গ্রহণের নিরাপদ ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

জীবনদক্ষতা শিক্ষা দিতে হবে শিক্ষার্থীদের যাতে আবেগ নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক চাপ মোকাবিলা, ক্যারিয়ার সহায়তার কাজে আসে। কমিউনিটি লেভেলে দ্রুত হস্তক্ষেপ ও জরুরি সহায়তা সেবা চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবার-সমাজের স্তরে দ্রুত হস্তক্ষেপ, কমিউনিটি পুলিশিং, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং জরুরি মুহূর্তে দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা এসেছে। আত্মহত্যার ঝুঁকির তথ্য পেলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর ভূমিকার কথাও উল্লেখ আছে।

শেষ কথা হলো, সময়মতো পাশে দাঁড়ানো এটাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। আত্মহত্যা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর নীতি হলো মানুষকে একা না হতে দেওয়া। পরিবারে খোলামেলা কথা বলার পরিবেশ সৃষ্টি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সহায়তা পাওয়া এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব হলে আত্মহত্যাকে প্রতিরোধ করা অসম্ভব ব্যাপার নয়।

আইজিপি ও মব সংস্কৃতি

নতুন পর্বের সূচনা এবং সরকারের চ্যালেঞ্জ

শিক্ষাক্ষেত্রে গফরগাঁওয়ের করুণ দশা

আমাদের ভাষার সংগ্রাম ও বর্তমান সময়-২

মন্ত্রীদের সতর্কতার সঙ্গে কথা বলা দরকার

ভারত-ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতার মূল ভিত্তি কী

ইরানে মার্কিন হস্তক্ষেপের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী

গ্লোবাল সাউথের উত্থান কী বার্তা দিচ্ছে

সড়কের নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজি

মাটির স্বাস্থ্য ও কৃষির ভবিষ্যৎ